তিস্তাপাড়ের কান্না
তিস্তাপাড়ের কৃষক বিমল চন্দ্র রায়ের (৫০) চোখে শুধু অশ্রু। স্ত্রী, দুই সন্তান আর বৃদ্ধা মাসহ পাঁচ জনের সংসার কীভাবে চলবে তাই নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি। তিস্তার বুকে দুই একর জমিতে আবাদ করেছিলেন বোরো ধান, বাদাম, পেঁয়াজ আর কাউন। অসময়ে নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ায় তার ফসল ডুবে গেছে।
'তিন বিঘা জমিতে বোরো ধান লাগিয়েছিলাম। ধানের শিস বের হয়েছিল। আশা ছিল বৈশাখ মাসের মাঝামাঝিতে ঘরে ধান তুলব। তিস্তার পানিতে ধানের খেত নষ্ট হয়ে গেছে,' বলেন বিমল চন্দ্র রায়।
'তিস্তার বুকে চাষ করা বোরো ধান দিয়ে সারা বছরের খাবার যোগান দেই। এ বছর ধান নষ্ট হয়ে গেছে। কীভাবে সংসার বাঁচবে ঈশ্বর ছাড়া কেউ জানেন না,' তিনি বলেন।
তিস্তাপাড়ের কৃষকরা জানান, গেল ২ এপ্রিল থেকে নদীতে পানি বাড়তে থাকে। উজান থেকে আসা পানিতে ফসলের খেত ডুবে যায়। ৯ এপ্রিল থেকে পানি কমতে থাকে। এর মধ্যে প্রচুর বৃষ্টিও হয়।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার রাজপুর ইউনিয়নের তিস্তাপাড়ের এই কৃষক ডুবে যাওয়া কিছু পেঁয়াজ ঘরে তুলতে পারলেও অধিকাংশই নষ্ট হয়েছে। তার দুই বিঘা জমির অর্ধেক কাউনও নষ্ট হয়েছে। সারা বছরের খোরাকি চলবে কীভাবে তাই নিয়ে এখন দুশ্চিন্তা। তার ভাষায়, 'কীভাবে পরিবার বাঁচবে ঈশ্বর ছাড়া কেউ জানেন না।'
একই চরের কৃষক মকবুল হোসেন (৬০) ডেইলি স্টারকে জানান, তার দুই বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়েছে। ধান গাছ কেটে এনেছেন গবাদি পশুদের খাওয়ানোর জন্য। এক বিঘা জমির কাউন নষ্ট হয়েছে। এক বিঘা জমি থেকে ৩০-৩৫ মণ পেঁয়াজ পাওয়ার আশা ছিল। পানিতে অধিকাংশ পেঁয়াজ পচে গেছে। মাত্র তিন মণ পেঁয়াজ ঘরে তুলতে পেরেছেন।
'চরের কৃষকরা শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার বুকে নানা ফসল ফলান। বৈশাখ মাসের মধ্যেই সব ফসল ঘরে চলে আসে। কিন্তু এ বছর অসময়ে নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ায় চরের কৃষকদের স্বপ্ন আর আশা দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে,' যোগ করে তিনি বলেন, 'আমার জীবনে চৈত্র মাসে তিস্তা নদীতে এরকম পানি বাড়তে দেখিনি। এখন শুধুই কাঁদছি।'
একই চরের কৃষক নিপেন চন্দ্র রায় (৬৭) ডেইলি স্টারকে বলেন, চৈত্র মাসে গরমে শরীর থেকে ঘাম ঝরে। প্রচণ্ড রোদের তাপে চরের জমিতে কাজ করতে হয়। এত কষ্টের ফসল ঘরে তোলা গেল না।
'তিস্তার বুকে বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল হারিয়ে আমরা নিঃস্ব। আগামী দিনগুলোতে বেঁচে থাকতে হবে কষ্টের সাথে।'
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার তিস্তাপাড়ের চর বগুড়াপাড়ার কৃষক মজির উদ্দিন (৬৭) ডেইলি স্টারকে বলেন, তিস্তা নদীতে অসময়ে পানি বেড়ে যাওয়ার কারণে তার পাঁচ বিঘা জমির বোরো ধান, মরিচ ও পেঁয়াজের অর্ধেক খেতে ক্ষতি হয়েছে। চৈত্র মাসে এভাবে ফসলের ক্ষতি হবে এটা ধারনার বাইরে ছিল। আমাদের চরে প্রায় ২০০ কৃষকের সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
কোন কৃষকের অর্ধেক জমির ক্ষতি হয়েছে, কারো কারো চার ভাগের তিন ভাগ ক্ষতি হয়েছে আবার অনেক কৃষকের পুরো ফসলই নষ্ট হয়েছে বলে তিনি জানান। সাত-আট দিন পর তার জমি থেকে পানি নেমে গেলেও ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে।
'এ বছর কীভাবে সংসার চালাব আর ঋণের কিস্তি কীভাবে শোধ করব এটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি,' তিনি বলেন।
কৃষি বিভাগের সূত্রগুলো জানায়, লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলা, কুড়িগ্রামের তিন উপজেলা, নীলফামারীর দুই উপজেলা, রংপুরের দুই উপজেলা ও গাইবান্ধার একটি উপজেলা দিয়ে প্রায় ১১৫ কিলোমিটার তিস্তা নদী বিস্তৃত। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার বুকে ৬৫-৭০ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ করেন ৫০ হাজারের বেশি কৃষক। এর মধ্যে কিছু ফসল ফাল্গুন মাসে ঘরে উঠলেও অধিকাংশ ফসল পাকে বৈশাখ মাসে। তিস্তার বুকে মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, গম, কাউন, ধানসহ বিভিন্ন সবজি চাষ হয়। বড় আকারে চাষ হয় বোরো ধান।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক শামীম আশরাফ ডেইলি স্টারকে বলেন, তিস্তার বুকে কি পরিমাণ জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছে তার তথ্য নেই। তবে অসময়ে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধিতে কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
কৃষকদের ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে বলে তিনি জানান।