লুবলিয়ানা: নিভৃতে থাকা এক মধ্য ইউরোপীয় নগরী

By রাকিব হাসান রাফি

ইউরোপে লন্ডন,প্যারিস, আমস্টারডাম, বার্লিন, লিসবন, বার্সেলোনা, মাদ্রিদ, কোপেনহেগেন, স্টোকহোম, রোম, মিলান, মিউনিখ কিংবা ভিয়েনার মতো শহরের ভীড়ে লুবলিয়ানা নামটি উপেক্ষিত থেকে যায়। এমনকি যে ভ্রমণপিপাসুরা ইউরোপে বেড়াতে আসেন, তাদের কাছেও লুবলিয়ানা তেমন গুরুত্ব পায় না।

তবে স্লোভেনিয়ার কোনো নাগরিককে লুবলিয়ানা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে এক বাক্যে তারা বলবেন, 'লুবলিয়ানার মতো পরিপাটি ও গোছালো শহর ইউরোপে দ্বিতীয়টি নেই।'

 স্লোভেনিয়ানরা তাদের রাজধানী শহরকে ভীষণ ভালোবাসেন।

একদিন ক্লাস শেষে আড্ডার ফাঁকে আমার ক্লাসমেট পিটার ব্রুম্যাট বলছিলেন, 'শহরটির প্রতি সহজাত ভালোবাসা থেকেই আমরা এর নাম দিয়েছি লুবলিয়ানা। আপনি বিশ্বাস করুন আর না করুন, আমি হলফ করে বলতে পারি বিশ্বে লুবলিয়ানার মতো স্বর্গীয় শহর একটিও নেই।'

বাংলাদেশে স্লোভেনিয়ার কোনো দূতাবাস না থাকায় স্লোভেনিয়ার ভিসা সংগ্রহ করতে আমাকে দিল্লি যেতে হয়েছিল। ভিসা ইন্টারভিউয়ের সময় ভিসা অফিসার আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, 'হোয়াট ডু ইউ নো অ্যাবাউট দ্য ক্যাপিটাল অব স্লোভেনিয়া?'

আমি বললাম, `অ্যাজ ফার অ্যাজ আই হ্যাভ লার্ন্ট দ্যাট লুবজানা ইজ দ্য ক্যাপিটাল অফ স্লোভেনিয়া।' ভিসা অফিসার আমাকে থামিয়ে উচ্চঃস্বরে হাসতে থাকলেন। পরে তিনি আমাকে জানালেন, ল্যাটিন হরফে 'Ljubljana' লেখা হলেও সঠিক উচ্চারণ লুবলিয়ানা। তাই প্রথম দিকে বিদেশিরা ভুল করে বসেন। 

ঠিক কবে লুবলিয়ানাতে মানুষের বসতি স্থাপন হয়েছিল সে সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে কোনো ধারণা পাওয়া যায় না। তবে প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, যীশুখ্রিস্টের জন্মের অনেক আগে থেকেই এ অঞ্চলে জনবসতি ছিল। সে সময় লুবলিয়ানাসহ আশেপাশের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় জলাভূমির অস্তিত্ব ছিল। এসব জলাভূমিকে সমন্বিতভাবে 'লুবলিয়ানা মার্শেজ' নামে ডাকা হয়। প্রাগৈতিহাসিক যুগে লুবলিয়ানাসহ আশেপাশের অঞ্চলগুলোর মানুষের জীবনধারা ছিল জলাভূমিকেন্দ্রিক। তাদের তৈরি নিদর্শনগুলো আজও প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণার বিষয়।

এখন পর্যন্ত মানবসভ্যতার ইতিহাসে আবিষ্কৃত সবচেয়ে পুরনো চাকার নাম 'লুবলিয়ানা মার্শেজ হুইল'। ৫ হাজার বছরের পুরনো এ চাকাটি বর্তমানে লুবলিয়ানার সিটি মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।

আনুমানিক ৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে লুবলিয়ানাতে রোমানদের পা পড়ে। রোমানরা লুবলিয়ানাতে সেনা ছাউনি তৈরি করে। ৪৫২ খ্রিস্টাব্দে আটিলার নেতৃত্বে একদল হান সেনা লুবলিয়ানাসহ আশেপাশের অঞ্চলগুলোর ওপর তাণ্ডব চালায়। অস্ট্রোগথ ও লোম্বার্ডরাও এ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে।

এখন আমরা যাদের স্লোভেনিয়ান হিসেবে জানি, লুবলিয়ানাতে তাদের প্রথম আগমন ষষ্ঠ শতাব্দীতে ঘটে বলে ধারণা করা হয়। জাতিগতভাবে স্লোভেনিয়ানরা স্লাভিক হিসেবে পরিচিত।

picture_03_1.jpg
প্রেশেরেন স্কয়ারের অন্যতম আকর্ষণ বারোক স্থাপত্যশৈলীর আদলে সপ্তদশ শতাব্দীতে নির্মিত ফ্রান্সিসকান চার্চ।

আধুনিক লুবলিয়ানার গোড়াপত্তন ঘটে মধ্যযুগে। বিশেষত পঞ্চদশ শতাব্দীতে লুবলিয়ানা চিত্রকলা ও ভাস্কর্যশিল্পে মধ্য ইউরোপে আলাদাভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১২৫৬ খ্রিস্টাব্দে ক্যারিন্থিয়ার রাজা তৃতীয় উলরিখ কামনিক থেকে কার্নিওলার প্রাদেশিক রাজধানী লুবলিয়ানাতে স্থানান্তরিত করলে এ শহরটি স্থানীয় রাজনীতিতে আলাদাভাবে গুরুত্ব পেতে থাকে। ১২৭০ সালে বোহেমিয়ার শাসক দ্বিতীয় অটোকার লুবলিয়ানা দখল করেন। কিন্তু ১২৭৮ সালে তার পতনের পর লুবলিয়ানা রুডলফ অফ হাবসবুর্গের অধীনে চলে আসে।

অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান শাসনামলে অস্ট্রিয়া ও বর্তমান ইতালির বিভিন্ন অংশের বাণিজ্য পরিচালনায় প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে লুবলিয়ানা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। সার্বিয়ার নেতৃত্বে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ক্রোয়েশিয়া, স্লোভেনিয়া, মেসিডোনিয়া, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা ও মন্টিনিগ্রো সম্মিলিতভাবে যুগোস্লাভিয়া ফেডারেশন গঠন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মুসোলিনির সেনাবাহিনী লুবলিয়ানা দখল করে। লুবলিয়ানাকে ইতালির অংশ হিসেবে দাবি করে তারা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি ও ইতালির নেতৃত্বাধীন অক্ষশক্তির পরাজয় ঘটে। বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলে স্লোভেনিয়া আবারও যুগোস্লাভিয়া জোটে ফিরে যায়। যুগোস্লাভিয়া শাসনামলে স্লোভেনিয়া ছিল সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক অব স্লোভেনিয়া। এর রাজধানী ছিল লুবলিয়ানা।

 ১৯৯১ সালের ২৫ জুন যুগোস্লাভিয়া ফেডারেশনের প্রথম কোনো দেশ হিসেবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে স্লোভেনিয়া। তবে সার্বিয়াসহ যুগোস্লাভিয়া ফেডারেশনের অন্যান্য দেশ স্বাধীনতার এ ঘোষণা মানতে অস্বীকৃতি জানায়। শুরু হয় যুদ্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি ইউরোপ মহাদেশের প্রথম যুদ্ধ, যেখানে ৭৬ জন মানুষ প্রাণ হারান। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে লুবলিয়ানকে মধ্য ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহরে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সে প্রচেষ্টা আজও চলমান।

২০০৪ সালে স্লোভেনিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ লাভ করে। সেই থেকে লুবলিয়ানা ধীরে ধীরে মধ্য ইউরোপের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। লুবলিয়ানার ইতিহাসে একজন মানুষকে বিশেষভাবে স্মরণ না করলেই নয়। তিনি হচ্ছেন ইয়োজে প্লেচনিক। লুবলিয়ানা শহরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নকশা করেছিলেন তিনি।

আগেই বলেছি, ইউরোপের অন্যান্য রাজধানী শহরের তুলনায় লুবলিয়ানা আয়তনে তেমন একটা বড় নয়। শহরটিতে আজও কমিউনিজমের ছাপ পাওয়া যায়। সেন্টার থেকে যত বাইরে যাওয়া যায়, ততই কমিউনিস্ট শাসনামলে নির্মিত হালকা হলুদ বর্ণের আবাসিক ভবন চোখে পড়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব আবাসিক ভবন অনেকটা জৌলুস হারিয়ে বিবর্ণ রূপ ধারণ করেছে। এমনকি দেশটির গণপরিবহন সেবাও ইউরোপের অন্যান্য শহরের মত নয়। স্লোভেনিয়ার বেশিরভাগ মানুষ যাতায়াতের জন্য নিজস্ব গাড়ির ওপর নির্ভরশীল। এজন্য দেশটির সরকার সেভাবে গণপরিবহনের ওপর গুরত্ব দেয় না। তবে এটা ঠিক যে, ইউরোপের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ শহরের সঙ্গে লুবলিয়ানার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বাস সংযোগ আছে।

ইউরোপের বেশিরভাগ শহরে যাতায়াতের জন্য ট্রাম বা মেট্রো থাকলেও, লুবলিয়ানাতে এখনও এ ২টি পরিসেবা নেই। তাই এখানকার গণপরিবহন মূলত বাস। শহরের ভেতর বাস ব্যবহার করত হলে বিশেষ কিছু নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। আপনাকে আলাদাভাবে বাস কার্ড কিনতে হবে এবং নিয়মিত বাস কার্ড রিচার্জ করতে হবে। লুবলিয়ানার ভেতর বাসে ভ্রমণ করতে চাইলে প্রত্যেক রাইডে আপনাকে ১ দশমিক ৩০ ইউরো গুনতে হবে।

'মাল্টিকালচারাল' শব্দটি লুবলিয়ানার ক্ষেত্রে তেমন খাটে না। বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, সার্বিয়া, মেসিডোনিয়া, কসোভো, ক্রোয়েশিয়া ও মন্টিনিগ্রো ছাড়া স্লোভেনিয়াতে অন্যান্য দেশের ইমিগ্র্যান্টদের খুব একটা আনাগোনা নেই। আর নাইট লাইফের প্রতি যাদের আসক্তি আছে, লুবলিয়ানাকে তাদের কাছে মৃত শহর মনে হবে। বার্সেলোনা, আমস্টারডাম, লিসবন বা মাদ্রিদের মতো লুবলিয়ানার রাত প্রাণবন্ত নয়। মাঝেমধ্যে পানশালা বা নাইট ক্লাবের দেখা মেলে, তবে সেখানে শুধু তরুণ প্রজন্মের উপস্থিতি চোখে পড়ে।

ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় স্লোভেনিয়াতে বিয়ে বিচ্ছেদের হার অনেক কম। এমনকি স্লোভেনিয়াতে আজও যৌথ পরিবারের দেখা মেলে। বেশিরভাগ স্লোভেনিয়ান পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে উপভোগ করতে ভালোবাসেন। ঢাকার মতো লুবলিয়ানার রাস্তাঘাট বেশ অপ্রশস্ত। তবে সেখানে যানজট নেই। পশ্চিম ইউরোপের শহরগুলোর তুলনায় লুবলিয়ানাতে জীবনযাত্রার মান এখনও তত উন্নত নয়।

লুবলিয়ানা শহরের প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে প্রেশেরেন স্কয়ার। এর নামকরণ করা হয়েছে স্লোভেনিয়ার জাতীয় কবি ফ্রান্স প্রেশেরেনের নাম অনুসারে। লুবলিয়ানার সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশন থেকে পশ্চিম দিক বরাবর ১০ মিনিট হাঁটলে এ প্রেশেরেন স্কয়ারের দেখা মিলবে। জাতীয় উৎসব থেকে শুরু করে আন্দোলন বা কর্মসূচিতে স্থানীয়রা এখানে জড়ো হন। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে এর আশেপাশে ছোটখাটো অস্থায়ী  দোকান বসে। বেশিরভাগ দোকানি অত্যন্ত বয়োবৃদ্ধ। যুগোস্লাভিয়া শাসনামলে ব্যবহৃত মুদ্রা ও স্ট্যাম্প থেকে শুরু করে বিভিন্ন অ্যান্টিকের খোঁজে এখানে দূর-দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ জড়ো হন।

picture_04_1.jpg
স্লোভেনিয়ার জাতীয় কবি ফ্রান্স প্রেশেরেন এবং গ্রিক পুরানের সাহিত্য, বিজ্ঞান ও চিত্রকলার দেবী মুজেসের প্রতিকৃতি।

লুবলিয়ানার অন্যান্য অংশের তুলনায় প্রেশেরেন স্কয়ার অপেক্ষাকৃত পুরনো। লুবলিয়ানার বেশিরভাগ দর্শনীয় স্থান এর আশেপাশে। প্রেশেরেন স্কয়ারে প্রবেশকালে সবার আগে চোখে পড়ে পূর্ব দিকে থাকা ব্রোঞ্জ নির্মিত ২টি ভাস্কর্য। এগুলোর একটি স্লোভেনিয়ার জাতীয় কবি ফ্রান্স প্রেশেরেনকে উৎসর্গ করে নির্মিত হয়েছে। অপর ভাস্কর্যটি গ্রিক দেবী মুজেসের। বিখ্যাত স্লোভেনিয়ান ভাস্কর ইভান জাইচ ভাস্কর্য ২টির মূল স্থপতি।

প্রেশেরেন স্কয়ারের অন্যতম আকর্ষণ বারোক স্থাপত্যশৈলীর আদলে সপ্তদশ শতাব্দীতে নির্মিত ফ্রান্সিসকান চার্চ। লুবলিয়ানাতে বেড়াতে যাওয়া বেশিরভাগ দর্শনার্থী লাল রংয়ের এ চার্চের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে ভালোবাসেন। মধ্যযুগে ক্যাথলিক খ্রিস্টানিটি বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে প্রেশেরেন স্কয়ার জ্ঞান চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে উঠে।

সন্ধ্যায় প্রেশেরেন স্কয়ারের অন্য রূপ চোখে পড়ে। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে প্রশান্তির খোঁজে অনেকে এর আশেপাশের কফি শপ ও পেস্ট্রির দোকানগুলোতে হাজির হন। পথচারীদের বিনোদনের জন্য থাকে স্ট্রিট মিউজিক। গান ও বাদ্যযন্ত্রের সুরে সন্ধ্যায় পুরো প্রেশেরেন স্কয়ার মুখরিত হয়ে উঠে।

ফ্রান্সিসকান চার্চের ঠিক উল্টো দিকে সামান্য দক্ষিণ-পশ্চিম বরাবর রয়েছে ট্রিপল ব্রিজ অব লুবলিয়ানা। এটি ৩টি সেতুর সমন্বয়ে তৈরি। ‍ঐতিহাসিকভাবে ট্রিপল ব্রিজ অব লুবলিয়ানার আলাদা গুরুত্ব আছে। রাতের বেলায় বর্ণিল আলোতে ছেয়ে যায় এ ব্রিজ। ব্রিজের অপর পাশকে লুবলিয়ানার ওল্ড টাউন আখ্যা দিলেও ভুল হবে না। অবশ্য লুবলিয়ানার ওল্ড টাউন যে আয়তনে খুব বেশি বড় সেটা বলা যাবে না। মধ্যযুগীয় স্থাপত্যশৈলীর অনন্য এক নিদর্শন এ ওল্ড টাউন। আঙুরসহ বিভিন্ন ফল থেকে তৈরি ওয়াইন তৈরিতে স্লোভেনিয়ার সুনাম আছে। তাই স্লোভেনিয়ার ওয়াইনের স্বাদ নিতে ওল্ড টাউনের পানশালাগুলোতে বছরের বেশিরভাগ সময় দর্শনার্থীদের ভীড় লেগে থাকে। ভালো মানের সুভেনিয়র কিনতে ওল্ড টাউনের সুভেনিয়র শপগুলোর জুড়ি মেলা ভার। দাম অবশ্য খানিকটা চড়া।

ওল্ড টাউনের আরেকটি আকর্ষণ হচ্ছে লুবলিয়ানা ক্যাথেড্রাল। অফিসিয়ালি অবশ্য একে সেইন্ট নিকোলাস ক্যাথেড্রাল হিসেবে ডাকা হয়। অনুমানিক ১২৬২ সালের দিকে নির্মাণ করা হয় এটি। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ক্যাথিড্রালটিকে বারোক স্থাপত্যশৈলীর আদলে পুনঃনির্মাণ করা হয়।

'ড্রাগন' শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখে চীনের ছবি ভেসে উঠে। চীনের মতো লুবলিয়ানার স্থানীয় জনসাধারণও মনে করেন, ড্রাগন তাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ড্রাগনকে লুবলিয়ানা শহরের প্রতীক বললেও ভুল হবে না।

খ্রিস্টান ধর্মের প্রসারের আগে স্লোভেনিয়ার বেশিরভাগ মানুষ প্যাগান ধর্মের অনুসারী ছিলেন। লুবলিয়ানিসা, সাভা, গ্রাদাশচিচা, ইশকা ও ইশচিসার মতো ৬টি নদী শহরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও, লুবলিয়ানিসা নদীটিকে স্থানীয়রা আলাদাভাবে দেখেন। প্যাগানরা বিশ্বাস করতেন, লুবলিয়ানিসা নদীতে ড্রাগনের বিচরণ রয়েছে। তাই এ নদীর উপরে বিখ্যাত ড্রাগন ব্রিজের দেখা মেলে। ব্রিজের ৪ কোণায় ৪টি পিলারের উপর ড্রাগনের ভাস্কর্য রয়েছে। গ্রীষ্মকালে লুবলিয়ানিসা নদীতে বোট রাইডিং খুব জনপ্রিয়।

ফ্রান্সিসকান চার্চের মতো পর্যটকদের কাছে লুবলিয়ানার আরেকটি আকর্ষণীয় স্থানের নাম লুবলিয়ানা ক্যাসেল। লুবলিয়ানার ডাউনটাউনে ক্যাসেল হিল নামক পাহাড়ের উপরিভাগে এর অবস্থান। লুবলিয়ানা ক্যাসেল লুবলিয়ানার উচ্চতম পয়েন্টগুলোর একটি। তাই ক্যাসেল থেকে দাঁড়িয়ে লুবলিয়ানা শহরের অসাধারণ সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়। ধারণা করা হয়, দ্বাদশ শতাব্দীতে ক্যাসেলটি নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে রোমান সেনারা এ ক্যাসেলটিকে প্রতিরক্ষার কাজে ব্যবহার করতেন। তবে ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ক্যাসেলের ভেতর জনবসতি ছিল। অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের অধীনে ক্যাসেলটিকে কারাগার হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

স্লোভেনিয়ার মূল সৌন্দর্য ছোট-বড় বিভিন্ন উচ্চতার আল্পস ও ডিনারাইডস পর্বতমালা। হাঙ্গেরির সীমানা পেরিয়ে যখন স্লোভেনিয়াতে প্রবেশ করা হয়, তখন রাস্তার ২ ধারে সারি সারি পর্বতমালার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। নদী, পাহাড় ও মনুষ্য নির্মিত ইট-পাথরের সৌন্দর্য— কী নেই লুবলিয়ানাতে?

লুবলিয়ানা ক্যাসেলের ভেতরে প্রবেশ করতে ১৩ ইউরো দিয়ে টিকিট কিনতে হয়।  অবশ্য শিক্ষার্থীদের জন্য এ টিকিটের মূল্য মাত্র ৯ ইউরো।

picture_13_1_1.jpg
লুবলিয়ানা ক্যাথেড্রালের ভেতরের দৃশ্য।

কারো যদি শপিংয়ের আগ্রহ থাকে, তাহলে তাকে লুবলিয়ানার সেন্ট্রাল বাস স্টেশন থেকে বাস ধরে এগোতে হবে রুডিনিকের দিকে। লুবলিয়ানার মূল সিটি থেকে রুডনিকের অবস্থান কিছুটা বাইরের দিকে। লেকলার্ক, স্পার, টেসকো, হোফার কিংবা অ্যালডির মতো বিশ্বের নামকরা শপিংমলের দেখা মিলবে রুডিনিকে। স্লোভেনিয়ার জনসাধারণের কাছে শপিংয়ের ক্ষেত্রে ভরসার নাম তাই রুডিনিক। অবশ্য যারা অর্গানিক ফুড লাভার রয়েছেন, তাদের কাছে লুবলিয়ানা সেন্ট্রাল মার্কেটের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। অনেকটা খোলা আকাশের নিচে এ মার্কেট বসে। রোববার ছাড়া সপ্তাহের প্রায় সব দিনই এ মার্কেট খোলা থাকে। ড্রাগন ব্রিজ থেকে একটু সামনে হাঁটলে দেখা মিলে লুবলিয়ানা সেন্ট্রাল মার্কেটের।

ট্রিপল ব্রিজ ও ড্রাগন ব্রিজের পাশাপাশি লুবলিয়ানিসা নদীর ওপর আরও একটি বিখ্যাত ব্রিজ রয়েছে। এর নাম মেসারস্কি মস্ট। ইংরেজিতে একে বাচার'স ব্রিজ বলা হয়। প্রেমিক-প্রেমিকারা ভালবাসার স্মৃতি রাখতে এ ব্রিজের ওপর তালা ঝুলিয়ে রাখেন।

picture_06_1.jpg
মেসারস্কি মস্ট। ইংরেজিতে একে বাচার’স ব্রিজ বলা হয়।

যদি লুবলিয়ানা ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তাহলে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য ছুটে যেতে পারেন টিভোলি পার্কের দিকে। পার্কের সবুজ গাছপালা যান্ত্রিকতায় পূর্ণ শহরবাসীর মনে আলাদা প্রশান্তি দান করে। পার্কের ভেতর প্রায়ই কাঠবিড়ালির ঝাঁক দেখা যায়। আদর করে অনেকে কাঠবিড়ালিকে খাওয়াতে ভালোবাসেন। রোজেনিক পাহাড়ের ঢাল থেকে শুরু করে আশেপাশের ৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত এ পার্ক বিস্তৃত। ১৮১৩ সালে ফ্রেঞ্চ স্থপতি জিন ব্লানচার্ড পার্কটির নকশা প্রণয়ন করেন। পরে বিভিন্ন সময়ে এটি সম্প্রসারণ করা হয়। ১৮৮০ সালে পার্কটির দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি পুকুর খনন করা হয়। বর্তমানে বারিয়ে নামের একটি সংঘ পুকুরটির দেখভাল করে থাকে। ইউরোপের অন্যান্য পার্কের মতো টিভোলি পার্কের ভেতরেও বিভিন্ন ভাস্কর্যের উপস্থিতি দেখা যায়।

টিভোলি পার্কের ভেতরে ছোট একটি ক্যাসেল আছে। সপ্তদশ শতকে নির্মিত এ ক্যাসেলকে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে সংস্কার করা হয়। স্থানীয়রা একে 'টিভোলি ক্যাসেল' নামে সম্বোধন করেন। বর্তমানে টিভোলি ক্যাসেল বিভিন্ন কালচারাল ইভেন্টের কাজে ব্যবহৃত হয়। কাস্ট আয়রনে তৈরি ৪টি কুকুরের ভাস্কর্য যেন ক্যাসেলটির প্রহরীর ভূমিকা পালন করে। এ ৪ ভাস্কর্যের কোনোটিতে জিহ্বা রাখা হয়নি। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, বিষয়টি যখন ভাস্কর অ্যান্থোন ডমিনিক ফার্নকর্নের নজরে আসে, তিনি তখন রাগে ও ক্ষোভে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করেন। অবশ্য অনেকে এ ঘটনাকে স্রেফ গুজব হিসেবে উড়িয়ে দেন।

টিভোলি ক্যাসেলের ঠিক সামনে রয়েছে একটি ফোয়ারা। টিভোলি পার্কের ঠিক উত্তর পাশে রয়েছে চেকিন ম্যানশন। বর্তমানে এটিকে মিউজিয়াম অফ কনটেম্পোরারি হিস্ট্রি অফ স্লোভেনিয়ায় রূপান্তর করা হয়েছে।

লুবলিয়ানাতে কী কী খাবার চেখে দেখা যেতে পারে, ভোজনরসিকদের মনে হয়তো সে প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। সত্যিকার অর্থে স্লোভেনিয়ার খাদ্য সংস্কৃতি তেমন একটা সমৃদ্ধ নয়। ম্যাকডোলান্ডস ছাড়া আন্তর্জাতিক ফাস্টফুড চেইন শপগুলোর উপস্থিতি সেখানে খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। স্লোভেনিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে পছন্দের ফাস্টফুড আইটেম হচ্ছে বুরেক বা ইয়ুকফা কাবাব। বুরেক হচ্ছে বিশেষ এক ধরনের পাই। বিভিন্ন ধরনের বুরেক রয়েছে—মিট বুরেক, চিজ বুরেক, আলু, পালংশাকের বুরেক ইত্যাদি। আমাদের দেশে প্রচলিত শর্মার আদলে তৈরি হয় ইয়ুকফা কাবাব। বুরেক ও ইয়ুকফা কাবারের উৎপত্তি তুরস্কে। তবে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান দেশগুলোর খাদ্য সংস্কৃতিতে এ ২টি খাবারের ব্যাপক জনপ্রিয়তা আছে।

picture_08_1.jpg
যারা অর্গানিক ফুড ভালোবাসেন, তাদের কাছে লুবলিয়ানা সেন্ট্রাল মার্কেটের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে লুবলিয়ানার বেজিগ্রাডে মসজিদের উদ্বোধন করেছে দেশটির সরকার। এ মসজিদের নাম রাখা হয়েছে লুবলিয়ানা মস্ক। স্লোভেনিয়ান ভাষায় জামিয়া বললে যে কেউ এ মসজিদ দেখিয়ে দিবেন। এ মসজিদ দেখতেও অনেক দর্শনার্থী আসেন। লুবলিয়ানার সেন্ট্রাল বাস স্টেশন থেকে এ মসজিদের দূরত্ব দেড় কিলোমিটারের কাছাকাছি।

আসলে বিশ্বে এমন কিছু শহর আছে, যেগুলো সে অর্থে বিশেষ না হলেও ঐতিহাসিক কারণে দেশটির সাধারণ মানুষের কাছে আলাদাভাবে সমাদৃত হয়। লুবলিয়ানাও ঠিক তেমন। সাধারণ দর্শনার্থীরা লুবলিয়ানার মাঝে বিশেষ কিছু খুঁজে পাবেন না। লুবলিয়ানাকে উপভোগ করতে হলে স্লোভেনিয়ানদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে হবে।

সেজন্য একটু অতীতে ফিরে তাকানো প্রয়োজন। ১৯৯১ সালে স্লোভেনিয়া স্বাধীনতা অর্জন করলেও একটি পৃথক জাতিসত্ত্বার ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠন করার ধারণাটি স্লোভেনিয়ানদের কাছে নতুন কোনো বিষয় ছিল না। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের শাসকগোষ্ঠী দেশটিকে ভিন্ন ভিন্ন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে তাদের জাতিসত্ত্বা ও ভাষার ওপর বড় আঘাত এনেছিল। লুবলিয়ানা এখন স্লোভেনিয়ার রাজধানী হলেও, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত ত্রিয়েস্তে শহরে সবচেয়ে বেশি স্লোভেনিয়ানের বসবাস ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ত্রিয়েস্তে ইতালির সঙ্গে সংযুক্ত হয়। স্লোভেনিয়ানরা আজও এ ঘটনাটিকে তাদের ইতিহাসের বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখেন। বিশ্বমানচিত্রে স্লোভেনিয়া রাষ্ট্র সৃষ্টির জন্য লুবলিয়ানাকে বিশেষভাবে কৃতিত্ব দেওয়া হয়।

আমার ক্লাসমেট পিটারের ভাষায়, 'এ শহরটি আমাদের সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করেছে।নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে নতুন রাষ্ট্র গঠনের যে স্বপ্ন আমাদের পূর্বপুরুষদের ছিল, সেটি বাস্তবায়িত হয়েছে এ লুবলিয়ানার কারণে। তাই যে কোনো কিছুর চেয়ে এ শহরকে আমরা অনেক বেশি ভালোবাসি।'

লেখক: রাকিব হাসান রাফি, শিক্ষার্থী, ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিক্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।