ভেনামি চিংড়ির বাণিজ্যিক উৎপাদন আর কত দূর
বিশ্ব বাজারে চিংড়ি রপ্তানিতে পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। এক সময় হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানি আয় এলেও এখন এই খাতটির অবস্থান সপ্তম।
এশিয়ার চিংড়ি রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ভেনামি চিংড়ি চাষ শুরু হয়নি। এখন বিশ্বের ৬২টি দেশে ভেনামি চিংড়ি বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে এশিয়ার দেশে রয়েছে ১৫টি। বিশ্বে চিংড়ি বাণিজ্যের ৭৭ শতাংশ দখল করে আছে ভেনামি চিংড়ি। বাগদা চিংড়ির তুলনায় দাম কম হওয়ায় বিশ্ববাজারে এর চাহিদা বেশি।
ভেনামি চিংড়ির জাতটি যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ের। প্রতিবেশী দেশ ভারতে ভেনামি চিংড়ির বাণিজ্যিক চাষ ২০০৮ সালে শুরু হয়। এ ছাড়াও এশিয়ার অন্যান্য প্রতিযোগী দেশ যেমন: থাইল্যান্ড ও চীনে ভেনামি চিংড়ির বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয় ১৯৮৮ সালে। ফিলিপাইনে এর চাষ শুরু হয়েছে ১৯৮৭ সালে। ভিয়েতনাম ও মিয়ানমারে শুরু হয় ২০০০ সালে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং গ্লোবাল অ্যাকুয়াকালচার অ্যালায়েন্স-এর তথ্য মতে, বিশ্বে ২০১৮ সালে ভেনামি চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে ৩৫ দশমিক ৫ লাখ মেট্রিক টন, বাগদা উৎপাদন হয়েছে ৫ দশমিক ৫ লাখ মেট্রিক টন, গলদা উৎপাদন হয়েছে ২ দশমিক ৪ লাখ মেট্রিক টন। এ ছাড়া অন্যান্য চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে ৩ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে এশিয়ার চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াতে ২০১৮ সালে ভেনামি চিংড়ি উৎপাদন হয় ২৩ দশমিক ৯১ লাখ মেট্রিক টন। ২০১৯ সালে এই দেশগুলোতে উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ৩১ দশমিক ১২ লাখ মেট্রিক টন। সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান শূন্য।
মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে পরীক্ষামূলকভাবে ভেনামি চিংড়ি চাষের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ৩টি পাইলট প্রকল্প অনুমোদন দিলেও বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১টি।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা জানান, খুলনার পাইকগাছায় পাইলট প্রকল্পে সম্প্রতি প্রতি হেক্টরে ৮ দশমিক ৬২ মেট্রিক টন ভেনামি চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে। ওই এলাকার চাষিরা প্রতি হেক্টরে মাত্র দেড় থেকে ২ মেট্রিক টন বাগদা চিংড়ি উৎপাদন করতে পারছেন।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) নেতৃবৃন্দ জানান, কাঁচামালের অভাবে এই খাতের আয় ধাপে ধাপে নিচের দিকে নেমে আসছে। রপ্তানি আয়ে চিংড়ির অবদান কমেছে। দেশের ১০৫টি হিমায়িত চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার মধ্যে এখন চালু আছে ৩৫টি। কাঁচামালের অভাবে অন্য কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ১১টি প্রতিষ্ঠান ভেনামি চিংড়ির বাণিজ্যিক চাষ করার জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের কারিগরি কমিটি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো, সক্ষমতা, যাতায়াত ব্যবস্থা ইত্যাদি সরেজমিনে পরিদর্শন করে এসেছে।
২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি আয় ছিল ৬৩৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে এই খাত থেকে আয় হয় ৫৬৮ দশমিক ০৩ মিলিয়ন ডলার, ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে আয় হয়েছিল ৫৩৫ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলার, ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে রপ্তানি আয় হয় ৫২৬ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন ডলার, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে আয় হয় ৫০৮ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন ডলার, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ৫০০ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন ডলার, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ৪৬৫ দশমিক ১৫ মিলিয়ন ডলার। আর ২০২০-২০২১ অর্থবছরে তা ৪৭৭ মিলিয়ন ডলার (৪০৮৬ কোটি টাকা) নেমে এসেছে।
বিএফএফইএ প্রেসিডেন্ট মো. আমিন উল্লাহ ডেইলি স্টারকে বলেন, কাঁচামালের অভাবে হিমায়িত চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কারখানা মালিকরা ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। শ্রমিকরা চাকরি হারাচ্ছে। এমন অবস্থায় সরকারের উচিত হবে অধিক উৎপাদনশীল ভেনামি জাতের চিংড়ির বাণিজ্যিক চাষ শুরু করা।
তিনি আরও বলেন, সরকারি একটি পাইলট প্রকল্পে ভেনামি চিংড়ি উৎপাদনে সফলতা এসেছে। এখন ভেনামি চিংড়ির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করার সময়।
যে সব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা আছে, তাদের ভেনামির বাণিজ্যিক চাষ শুরু করার অনুমতি দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
বিএফএফইএ প্রেসিডেন্ট বলেন, এশিয়ার প্রতিযোগী দেশগুলো আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে। আর আমরা এখনো পাইলট প্রকল্পে আটকে আছি। দেশে দ্রুত ভেনামি চিংড়ির বাণিজ্যিক চাষ শুরু না হলে আমরা বিশ্ব বাণিজ্যে আরও পিছিয়ে পড়ব।