‘খাঁচা সিনেমা দেখে হাসান আজিজুল হকের চোখে পানি এসেছিল’
বরেণ্য কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের গল্প অবলম্বনে নির্মিত 'খাঁচা' সিনেমাটি অস্কারে গিয়েছিল। সিনেমাটির পরিচালক ছিলেন আকরাম খান। 'পাতালে হাসপাতালে' গল্প নিয়ে টেলিভিশন নাটক নির্মাণ করা হয়েছিল এবং এতে অভিনয় করেছিলেন মামুনুর রশীদ।
বরেণ্য এই কথাসাহিত্যিকের 'গুনিন' গল্প নিয়ে সম্প্রতি গিয়াস উদ্দিন সেলিম ওয়েব ফিল্ম নির্মাণ করেছেন। হাসান আজিজুল হকের 'বিধবাদের কথা' গল্প অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে আরেকটি সিনেমা 'নকশিকাঁথার জমিন' এবং এটি মুক্তির অপেক্ষায় আছে।
আজ শুক্রবার মামুনুর রশীদ, গিয়াস উদ্দিন সেলিম, জয়া আহসান, আজাদ আবুল কালাম, আকরাম খান, পরীমনি দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের গল্প নিয়ে নির্মিত সিনেমা ও নাটকে কাজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
মামুনুর রশীদ বলেন, হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে আমার গভীর বন্ধুত্ব ছিল। যদিও তিনি বয়সে আমার বড় ছিলেন। কিন্তু, বন্ধুত্বের কোনো ঘাটতি ছিল না। রাজশাহী গেলেই
তার বাসায় যেতাম। আড্ডা দিতাম মন খুলে। তিনিও ঢাকায় এলে আমার বাসায় আসতেন। আমাদের বিরতিহীন আড্ডা দিতাম।
আমার নিজের জেলা শহর টাঙ্গাইলে একবার তাকে নিয়ে গিয়েছিলাম। তার লেখা অবলম্বনে নির্মিত খাঁচা সিনেমায় অভিনয় করেছিলাম আমি। খাঁচা দেখার পর ফোন করে খুব প্রশংসা করেছিলেন। অসম্ভব খুশি হয়েছিলেন। ফোন করে যে অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন তা ভুলব না। তার লেখা পাতালে হাসপাতালে গল্প অবলম্বনে একটি নাটক হয়েছিল টেলিভিশনে। সেই নাটকে আমি চিকিৎসকের চরিত্রে
অভিনয় করেছিলাম। ব্যক্তিগতভাবে আমি তার লেখার ভীষণ ভক্ত। দুই বাংলা মিলিয়ে হাসান আজিজুল হকের মতো বড় মাপের লেখক কজন আছেন? খুব বড় মাপের লেখক ছিলেন। মৃত্যু তাকে নিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু তার সৃষ্টি থেকে যাবে যুগ যুগ ধরে।
গিয়াস উদ্দিন সেলিম বলেন, হাসান আজিজুল হক আমার প্রিয় লেখকদের একজন। অনেকদিনের স্বপ্ন ছিল তার গল্প থেকে সিনেমা নির্মাণ করব। সেভাবেই 'গুনিন' গল্পটি ভালো
লেগে যায়। 'গুনিন' নিয়ে সিনেমা করার পরিকল্পনা করি। সম্প্রতি সিনেমার শুটিং করেছি। ছোটগল্পকে সিনেমায় রূপ দেওয়া খুব চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু, সাহস নিয়ে কাজটি করেছি। তার লেখা মানেই তো জীবনভিত্তিকি। গুনিনের গল্পটিও তাই।
গুনিন গল্প থকে সিনেমা বানাতে গিয়ে কঠিন মনে হয়নি। কিন্তু, চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছে। শিল্পের পথটা তো সরল নয়-চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু, এই কাজটি করতে গিয়ে ভীষণ উপভোগ করেছি। কঠিন মনে হলে তা সম্ভব হতো না।
গুনিন নিয়ে সিনেমা বানাচ্ছি বলে হাসান আজিজুল হক স্যার খুব উচ্ছ্বসিত ছিলেন। তার কাছের মানুষদের বলতেন এ কথা। আমার আফসোস গুনিন সিনেমাটি তিনি দেখে যেতে পারলেন না। এটা আমাকে কষ্ট দেয়।
আজাদ আবুল কালাম বলেন, খাঁচা সিনেমার চিত্রনাট্য আমার করা ছিল। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলাম। খাঁচা গল্পটি হাসান আজিজুল হক স্যারের শক্তিশালী একটি গল্প। সিনেমা করার আগেই পড়েছিলাম। খাঁচা দেশভাগের গল্প। এই সিনেমাটি অস্কারেও গিয়েছিল।
সম্প্রতি স্যারের লেখা অবলম্বনে গুনিন সিনেমায় অভিনয় করেছি। তার লেখা অন্য সবার থেকে ভিন্ন। এখানেই তিনি আলাদা। কেউ কেউ বলেন-স্যারের লেখা কঠিন। আসলে কিছু মানুষ হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলীর লেখাকে বলে বলে কঠিন বানিয়ে ফেলেছেন। এটা সত্যি নয়। তার লেখা বাস্তবতার আলোকে। গল্প বলি আর উপন্যাস বলি- দুটিরই উচ্চতা আছে।
তার সঙ্গে ফোনে অনেকবার কথা হয়েছে। দেখাও হয়েছে কয়েকবার। স্যারের মেয়ের বাসায় একবার দেখে হয়েছে। স্যার প্রায়ই বলতেন-রাজশাহীতে এসো- সারারাত আড্ডা দেব। রাজশাহীতে গিয়ে সারারাত আড্ডা দেওয়া হলো না।
তিনি অত্যন্ত সরল মানুষ ছিলেন। শিশুর মতো সরল ছিল তার ভেতরটা। সহজ জীবনযাপন করতেন। কিন্তু, ভীষণ জ্ঞানী ছিলেন। ঘটনাক্রমে স্যারের মৃত্যুর দিন আমি রাজশাহীতে ছিলাম। আমি ভাগ্যবান তার মতো মানুষের সান্নিধ্য ও সাহচর্য পেয়েছি।
জয়া আহসান বলেন, হাসান আজিজুল হকের খাঁচা গল্প নিয়ে সিনেমা বানিয়েছিলেন পরিচালক আকরাম খান। খাঁচা সিনেমায় সরোজিনী চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। আমার জন্য একটি ভালো কাজ ছিল। সরোজিনী হয়ে উঠতে শতভাগ প্রস্তুতি নিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। খাঁচা মুক্তির পর তিনি আমার অভিনয়ের প্রশংসা করেছিলেন।
নকশিকাঁথার জমিন সিনেমার কাজ শেষ করেছি। এই কাজটিও ব্যতিক্রমী। হাসান আজিজুল হক কত বড়মাপের কথাশিল্পী ছিলেন তা ছোট্ট পরিসরে বলে শেষ করা যাবে
না। শারীরিকভাবে তিনি চলে গেছেন। কিন্তু, তার মতো লেখকের মৃত্যু হয় না। বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন চিরদিন।
আকরাম খান বলেন, হাসান আজিজুল হক আমার প্রিয় লেখক। তার গল্প নিয়ে খাঁচা সিনেমাটি প্রথমে পরিচালনা করি। সিনেমাটি মুক্তির আগেই রাজশাহীতে গিয়ে তাকে দেখিয়েছিলাম। দেখার পর তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। খাঁচা দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন। খাঁচা সিনেমা দেখে হাসান আজিজুল হকের চোখে পানি এসেছিল।
তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, দেশভাগের সময়টায় ফিরে গিয়েছিলাম। এরকম অসংখ্য স্মৃতি আছে স্যারের সঙ্গে। নকশিকাঁথার জমিন সিনেমার শুটিংয়ের সময় একদিন আমাকে বলেছিলেন, কবে শেষ হবে কাজটি? কবে দেখতে পাব? দেখে যেতে পরব তো?
নকশিকাঁথার জমিন মুক্তির অপেক্ষায় আছে। মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা এটি। আমার দুর্ভাগ্য এই সিনেমাটি স্যারকে দেখাতে পারলাম না।
পরীমনি বলেন, আমার সৌভাগ্য হাসান আজিজুল হক স্যারের গুনিনে অভিনয় করতে পেরেছি। গুনিন সিনেমায় রাবেয়া চরিত্রটি বোঝার জন্য বেশ কয়েকবার গল্পটি পড়েছি। গল্পটা কয়েকবার পড়ার কারণে- পর্দায় রাবেয়া হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। গিয়াস উদ্দিন সেলিমকে আমি গুরুজি ডাকি। আমার গুরুজিকে বিশেষ ধন্যবাদ গুনিন সিনেমায় রাবেয়া চরিত্রে আমাকে নেওয়ার জন্যে।