ভারতীয় চলচ্চিত্রে বাংলাদেশকে ভুলভাবে উপস্থাপনের প্রবণতা

By রাখশান্দা রহমান মিশা

সম্প্রতি, ভারতের বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক বিশাল ভরদ্বাজের একটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের দুই জনপ্রিয় অভিনেত্রী বিদ্যা সিনহা মীম ও মেহজাবিন চৌধুরী। 'মকবুল', 'ওমকারা' ও 'হায়দার'র মতো দর্শক-নন্দিত চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন এই পরিচালক।

মীম ও মেহজাবিন দুজনেই জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত 'খুফিয়া' চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের রাজনীতি ও বাংলাদেশকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার আশঙ্কা আছে।

মীম দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, চিত্রনাট্য পড়ার পর তিনি ওই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন।

তিনি বলেন, 'একজন নামকরা পরিচালককে না বলা কঠিন। আমি অনেক আগে থেকেই তাকে পছন্দ করি। বলিউডে অভিনয়ের প্রস্তাব এই প্রথম পেয়েছিলাম। তবে, দুর্ভাগ্য যে আমাকে তা ফিরিয়ে দিতে হয়েছে।'

চলচ্চিত্রের কাহিনীতে বাংলাদেশের পটভূমি ও রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক তথ্যের অভাব রয়েছে বলে মনে হওয়ায় তিনি বিনয়ের সঙ্গে প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দিয়েছেন।

এ ছাড়া, গত জুলাইয়ে একই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন মেহজাবিনও। তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এ বিষয়ে পরিচালকের সঙ্গে আমার দীর্ঘ সময় কথা হয়েছে। মনে হয়েছিল চিত্রনাট্যে আমার দেশকে ছোট করা হয়েছে, আমি তা মেনে নিতে পারিনি।'

কিন্তু, এটাই কি ভারতীয় চলচ্চিত্রে বাংলাদেশকে খাটো করে দেখানোর প্রথম ঘটনা? একটু ফিরে দেখা যাক:

২০১৪ সালে মুক্তি পায় রণবীর সিং, অর্জুন কাপুর ও প্রিয়াঙ্কা চোপড়া অভিনীত ভারতীয় চলচ্চিত্র 'গুন্ডে'। মুক্তির পরপরই এর সমালোচনা শুরু হয়। ছবির প্রথম দৃশ্যে দেখানো হয়, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শেষে পাকিস্তান আত্মসমর্পণ করলে বাংলাদেশের জন্ম হয়।

চলচ্চিত্রটি দেখার পর বাংলাদেশের মানুষ ক্ষুব্ধ হন। কারণ, সেখানে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সশস্ত্র প্রতিরোধকে খাটো করা হয়েছে। তাছাড়া, চলচ্চিত্রটিতে বাংলাদেশে ৩০ লাখ শহীদের বাস্তবতাও উপেক্ষা করা হয়েছে।

সেসময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে 'গুন্ডে'র প্রদর্শনী বন্ধ করার অনুরোধ জানায়।

চলচ্চিত্রটির অন্যতম প্রযোজক টি-সিরিজ তাদের অনলাইন চ্যানেল থেকে দ্রুত সেই বিতর্কিত দৃশ্যটি সরিয়ে ফেলে এবং বাংলাদেশি দর্শকদের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে।

এক বিবৃতিতে তারা বলে, 'গল্পটি যেভাবে চিত্রিত হয়েছে তা নিয়ে আমাদের বাংলাদেশি বন্ধুরা উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের প্রতি কোনো অসম্মান দেখানো হলে বা তাদের আঘাত দিয়ে থাকলে আমরা ক্ষমা চাই। যাহোক, এটি একটি কাল্পনিক কাহিনী। সমাজের কোনো বিশেষ অংশ, ব্যক্তি বা কোনো জাতিকে অসম্মান করার উদ্দেশ এতে ছিল না।'

এর পরেই রয়েছে শাহরুখ খান অভিনীত 'জব হ্যারি মেট সেজাল'। এখানে বাংলাদেশি অভিবাসীদের অসম্মানজনকভাবে চিত্রিত করা হয়েছে।

চলচ্চিত্রটির অন্যতম চরিত্র, গাস (চন্দন রায় সান্যাল অভিনীত) বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। তাকে একটি নকল জুয়েলারি চক্রের মূল হোতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি হ্যারির (শাহরুখ খান অভিনীত) সামনে আত্মরক্ষার্থে বলেন যে বারবার বন্যায় কৃষি জমি নষ্ট হওয়ায় তিনি জীবিকার সন্ধানে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে পর্তুগালে এসেছেন।

চলচ্চিত্রটি দেখার পর অনেক বাংলাদেশি অভিবাসী আশঙ্কা করেন, এর মাধ্যমে তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে।

বাংলাদেশের অভিনেত্রী সোহানা সাবা সেসময় টাইমস অব ইন্ডিয়া'কে বলেছিলেন, 'আমি কোনো পূর্বনির্ধারিত চিন্তাভাবনার পক্ষে নই। এমন কিছু সিনেমা আছে, যেখানে বাঙালিদের নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে চিত্রিত করা হয়। সমস্যা হলো, এই ধরনের ছাঁচের মধ্য দিয়ে একটি সম্প্রদায় বা জাতিকে দেখানো হয়ে থাকে।'

তিনি আরও বলেন, 'এটি একটি স্পর্শকাতর বিষয় এবং বিষয়টি সতর্কভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।'

বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা শিহাব শাহীন বলিউডের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রভাবের ওপর জোর দিয়েছেন।

তিনি বলেন, 'বলিউড আমাদের ছোট করে নিজেরা বড় হয়। আমরা তাদের তা করতে দিই। বাংলাদেশিদের ছোট করে উপস্থাপনের মাধ্যমে তারা ভারতীয় দর্শকদের কাছে বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব নিয়ে ব্যবসা করার চেষ্টা করে।'

২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া সুপারহিট তেলেগু চলচ্চিত্র, 'গুডাচারি'-তেও বাংলাদেশকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অভাব রয়েছে এবং সন্ত্রাসবাদের লালন করা হয়।

চলচ্চিত্রটিতে চট্টগ্রামকে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখানো হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে যে নিষ্পাপ শিশুদের শেখানো হয় ভারত তাদের শত্রু দেশ। একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী শিশুদের হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে এমন দৃশ্যও এতে দেখানো হয়েছে।

এমন হতাশাজনক প্রবণতার মধ্যে মৃত্যুঞ্জয় দেবব্রতের মতো পরিচালক 'চিলড্রেন অফ ওয়ার'-এ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। চলচ্চিত্রটি ২০১৪ সালে মুক্তি পায়। এর জন্য তিনি প্রশংসার দাবিদার।

দেবব্রত তার সিনেমার জন্য সাংবাদিক, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তি ও অনেক শরণার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সত্যিকারের জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্র হওয়ায় 'চিলড্রেন অফ ওয়ার' বাংলাদেশ টেলিভিশনেও প্রচারিত হয়েছিল।

ভারতীয় চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের অপ্রত্যাশিত উপস্থাপনার বিষয়টি সম্ভবত দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের মন্তব্যের মাধ্যমেও ব্যাখ্যা করা যায়। তিনি বলেছিলেন, 'বাংলাদেশের গরিব মানুষ খেতে পায় না বলে তারা ভারতে আসে।'

এ বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের প্রতিক্রিয়া ছিল, অমিত শাহের বাংলাদেশ সম্পর্কে জ্ঞান 'সীমিত'। তিনি আরও বলেন, 'বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যখন এত গভীর সম্পর্ক রয়েছে তখন এমন মন্তব্য অগ্রহণযোগ্য।'