সিনেমা হল বাঁচাতে হিন্দি ছবি প্রদর্শনের প্রস্তাব কতটা যৌক্তিক
অব্যাহত লোকসানের কারণে একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দেশের সিনেমা হলগুলো। গত ২০ বছরে সারা দেশে এক হাজার ২৬১টি হল বন্ধ হয়েছে। ৯০-এর দশকের শুরুতেও দেশে সিনেমা হল ছিল এক হাজার ৪৩৫টি। বর্তমানে নিয়মিতভাবে সিনেমা প্রদর্শনের জন্য চালু আছে মাত্র ১৭৪টি হল।
অবশিষ্ট হলগুলো সচল রাখতে গত বছরের অক্টোবর মাসে দেশের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট তিন সংগঠন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক, প্রযোজক ও পরিচালক সমিতির নেতারা ভারতীয় হিন্দি সিনেমা প্রদর্শনের বিষয়ে একমত হন। সে সময় তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে করে হল মালিকরা বছরে ১০টি করে ভারতীয় হিন্দি ছবি আমদানি ও প্রদর্শনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এরপর ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ের আর কোনো অগ্রগতি নেই।
দেশের হলগুলোতে হিন্দি সিনেমা প্রদর্শনের বিষয়ে দ্য ডেইলি স্টারকে তাদের মতামত জানিয়েছেন, খ্যাতিমান চলচ্চিত্র অভিনেতা সোহেল রানা, চলচ্চিত্র অভিনেতা ফেরদৌস, সিনেমা হল মালিক ও প্রদর্শক সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি মিয়া আলাউদ্দিন, হল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি ও মধুমিতা হলের কর্ণধার ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি সোহানুর রহমান সোহান, চলচ্চিত্র প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরু ও পরিচালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহীন সুমন।
সোহেল রানা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এর আগেও এদেশে বিভিন্ন সময়ে হিন্দি সিনেমা এসেছে। সেই সিনেমাগুলো কেমন ব্যবসা করেছিল? এই তথ্য সংগ্রহ করলেই পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যাবে। আমাকে তখন কিছুই বলতে হবে না। এখানে আসা সব হিন্দি সিনেমা মুখ থুবড়ে পড়েছিল। কারণ, ঢাকা শহরের কিছু মানুষ বলিউডের নায়ক-নায়িকাদের চেনেন। এখানে হয়তো কিছুটা চলতে পারে। কিন্তু, ঢাকার বাইরে সাভার, দিনাজপুর, ময়মনসিংহের সিনেমা হলে কি সিনেমাগুলো চলবে? তারা কি চেনে তাদের? এই তথ্যগুলো ঠিক থাকার পর যদি মনে হয় হিন্দি সিনেমা চলুক, তাহলে আমার কোনো সমস্যা নেই। তাহলে শুধু হিন্দি কেন তুর্কি, ইরানি, জাপানি ও তামিল সিনেমাও আসুক। তবে, ইতিহাস খুঁজে দেখতে হবে, হুট করে কিছু করলে তার ফল খুব একটা ভালো হয় না বলে মনে করি।'
অভিনেতা ফেরদৌস দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'সিনেমা হল মালিকরা যদি মনে করেন হিন্দি সিনেমা আসলে তাদের হলগুলো গুলো বাঁচবে, তাহলে হিন্দি সিনেমা প্রদর্শন করুক। সিনেমা হলের বিষয়গুলো আমাদের চেয়ে তারা ভালো বোঝেন। হিন্দি সিনেমা আসার ফলে যদি হল বাঁচে, তাহলে হিন্দি সিনেমা আসতে সমস্যা দেখছি না।'
সিনেমা হল মালিক ও প্রদর্শক সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি মিয়া আলাউদ্দিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'সিনেমা হল বাঁচাতে হিন্দি ছবি আসুক। সরকার আমাদের হিন্দি ছবি আমদানির বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছিল। সেটা নিয়ে আশায় বুক বেঁধেছিলাম। বছরে ১০টির মতো হিন্দি সিনেমা আমদানির কথা বলেছিলাম আমরা। বিষয়টি এখন পর্যন্ত 'দেখছি, দেখব'র মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। আগামীতে আমরা আরেকটি মিটিং করার চেষ্টা করব। যদি কিছু না হয়, তাহলে সিনেমা হল বন্ধ করে দেবো। এত খারাপ অবস্থার মধ্যে সিনেমা হল চলতে পারে না।'
হল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি ও মধুমিতা হলের কর্ণধার ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমার সিনেমা হল ১৭ মাস ধরে বন্ধ হয়ে আছে, কেউ কোনো খবর নিতে আসেনি। হল মালিকরা খুব খারাপ সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। প্রদর্শনের মতো ভালো বাংলা সিনেমা নেই যা দিয়ে হল খুলব। এখন যে সিনেমা চলবে সেখানে যদি একশ দর্শক থাকে, হিন্দি সিনেমা চললে সেখানে দুইশ দর্শক আসবে বলে বিশ্বাস করি। এই অবস্থা চলতে থাকলে সিনেমা হল বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া পথ থাকবে না।'
চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি সোহানুর রহমান সোহান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে কথা বলছি। এর আগে বেশ কয়েকবার মিটিং করেছি। হিন্দি সিনেমার বিষয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত দেবে, সেটা মেনে নেব। কারণ সিনেমা হল বাঁচাতে যা কিছু ভালো হবে সেটা গ্রহণ করতে সমস্যা দেখছি না।'
প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরু দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'হিন্দি সিনেমা আমদানির বিষয়ে গত বছরের পর আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। সেই সময়ে হিন্দি সিনেমা প্রদর্শনের বিষয়ে আমরা একমত হয়েছিলাম। আমি আবারও বলছি, হিন্দি সিনেমা আসুক, কিন্তু আমাদের বিভিন্ন উৎসবে বাংলা সিনেমার প্রাধান্যই থাকবে। এই করোনার সময়ে সিনেমা হল বাঁচাতে হলে হিন্দি সিনেমা চললে কোনো সমস্যা নেই। তার কারণ হলো দেশে বড় বাজেটের বাংলা সিনেমা এখন কেউ মুক্তি দিতে সাহস পাচ্ছে না।'
পরিচালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহীন সুমন বলেন, 'গত বছর পরিচালক সমিতির যারা হিন্দি সিনেমার বিষয়ে কথা বলেছিলেন, তারা এখন নতুন কমিটিতে নেই। কী করা যায়, সে বিষয়ে আমরা এখন মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেব। কোনটা করলে সিনেমা হল ও বাংলা সিনেমার জন্য ভালো হবে। তার আগে কোনো কিছু বলতে পারছি না।'