আমাদের প্রধানমন্ত্রী কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের থেকেও ক্ষমতাধর?

By শাখাওয়াত লিটন

নিজেদের সংবিধানে বর্ণিত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্যের বিধান নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যারপর নাই হতাশ। এইতো কয়েক দিন আগে তিনি সংবিধানকে দুষলেন। তাঁর ভাষায় অমন অযৌক্তিক সাংবিধানিক বিধানের কারণেই তিনি তাঁর প্রেসিডেন্সির প্রথম ১০০ দিনে অনেক কিছুই করতে পারেননি। সংবিধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আহা ট্রাম্প বেচারা কি অসহায়! ট্রাম্প কি সত্যি অমন অসহায়?

পার্লামেন্ট এবং বিচারবিভাগের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা দেখলে মনে হবে যে তিনি বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাবান প্রেসিডেন্ট। পার্লামেন্ট তথা কংগ্রেসের ক্ষমতা ও কার্যাবলীর দিকে তাকালে মনে হবে প্রেসিডেন্ট আসলে অসহায়। কেননা তাঁর প্রতিটা কাজ পর্যালোচনা করছে কংগ্রেস। কংগ্রেসের উচ্চ কক্ষ সিনেটের অনুমোদন ব্যতীত প্রেসিডেন্ট কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে কাউকে নিয়োগ পর্যন্ত দিতে পারেন না।

আবার অন্য দিকে যেন কুঠার হস্তে দাঁড়িয়ে আছেন বিচারকরা। প্রেসিডেন্ট মহাশয় আইন অনুযায়ী সকল কাজ করছেন কিনা তার চুলচেরা বিশ্লেষণ তাঁরা করবেন। পান থেকে চুন খসলেই কোন কাজকে অবৈধ ঘোষণা করবেন তাঁরা। ট্রাম্প কয়েকটা মুসলিম প্রধান দেশের নাগরিকদের উপর যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। কিন্তু ওই যে বিচারক মহোদয়রা বলে উঠলেন ট্রাম্প এমন আদেশ জারি করতে পারেন না, এমন আদেশ জারি করার ক্ষমতা তাঁর নেই। বিচারকরা অবৈধ ঘোষণা করলেন ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশকে। হানিমুন পিরিয়ডে এ যেন এক চপেটাঘাত। এমন চপেটাঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোনও প্রেসিডেন্টকে সহ্য করতে হয়নি। ট্রাম্প নাখোশ হয়েছেন বিচারকদের উপর। বকাঝকাও করেছেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। বিচারকদের বিরুদ্ধে আর কোনও কিছু করার মুরোদ নেই তাঁর। কারণ বিচারকরা যা করেছেন তা সম্পূর্ণ আইনগত।

এটাই হলো চেক্‌ এন্ড ব্যাল্যান্স বা ক্ষমতার ভারসাম্য। ট্রাম্পের মতো সরকার প্রধানরা যেন যা ইচ্ছা তাই করতে না পারে এবং স্বৈরাচারী না হয়ে উঠে সেই জন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণেতারা এভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য বিধান করেছেন। ক্ষমতার পৃথকীকরণ বা সেপারেশন অব পাওয়ারস এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মডেল অনন্য। আর এমন একটা দেশের প্রেসিডেন্ট যদি হন ট্রাম্পের মতো লোকেরা তবে তাঁদের নিজেদেরকে অসহায় মনে হতেই পারে। কেননা এই ধনকুবেররা যেভাবে তাঁদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন সেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগকে পরিচালনা করা যায় না।

তবে ট্রাম্পের মতো অসহায় নন আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী। আমাদের সংবিধানে নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর উপর ন্যস্ত। তিনি সকল নির্বাহী ক্ষমতার মালিক। তিনি ঠিক করবেন কে কে মন্ত্রিসভায় জায়গা পাবেন। কে কত দিন মন্ত্রিসভায় থাকবেন সেটা নির্ভর করছে তাঁর সন্তুষ্টির উপর। বিগত প্রায় তিন দশক ধরে যিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তিনি আবার ক্ষমতাসীন দলের সুপ্রিম লিডার। দলেও তাঁর নেতৃত্ব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। তিনি ঠিক করে দেন কে দলের কোন পদ পাবেন এবং কত দিন ওই পদে থাকবেন। যিনি প্রধানমন্ত্রী তিনি আবার সংসদ নেতা। সংসদে তাঁর প্রভাব অপরিসীম। কে স্পিকার হবেন, কে চিফ হুইপ হবেন তাও তিনি ঠিক করে দেন। শুধু তাই নয় যতগুলো সংসদীয় কমিটি আছে সেগুলোর চিফ কে হবেন সদস্য কে হবেন- সেগুলো ঠিক করে দেবেন প্রধানমন্ত্রী তথা সংসদ নেতা। তাঁর পছন্দের সংসদ সদ্যদের নিয়ে গঠিত কমিটিগুলোকে দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁর সরকারের কর্মকাণ্ড দেখভাল করতে, কোথাও কোনও অনিয়ম হয়েছে কিনা। তাঁর নিজের লোকেরা কি কখনো তাঁকে বিব্রত করতে পারে!

দলের কোনও এমপি চাইলেও সংসদে ‘ভোকাল’ হতে পারবেন না। দলের বিপক্ষে ভোট দিতে পারবেন না। দল যা করতে বলবে তাঁকে তাই করতে হবে। এদিক সেদিক করলেই সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বলি হতে হবে- সংসদ সদস্য পদ হারাতে হবে। তাই সংসদ বা সংসদীয় কমিটি কখনো প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বা কর্মকাণ্ডের চুলচেরা বিশ্লেষণ তো দূরের কথা কোনও প্রশ্ন তোলার সাহস রাখে না।

সংবিধানে আমাদের দেশের রাষ্ট্রপতিকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই সংবিধানেই আমরা রাষ্ট্রপতির হাত বেঁধে দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া বাকি সব কাজ রাষ্ট্রপতি করবেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করার সময় রাষ্ট্রপতির কোনও কিছু করার নাই। সংসদে মেজরিটি পার্টি লিডারকে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসাবে এবং আপীল বিভাগের সবচেয়ে সিনিয়র জাজকে প্রধান বিচারপতি হিসাবে নিয়োগ দিবেন। রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দেওয়ার ক্ষমতাও প্রধানমন্ত্রীর একার। তাঁর মন্ত্রিসভার কোনও অধিকার নাই। তাহলে দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাও প্রধানমন্ত্রী প্রয়োগ করেন। যেমন কাদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে সেটা নির্ধারণ করেন প্রধানমন্ত্রী। আর রাষ্ট্রপতি শুধু তাদের নিয়োগ পত্রে স্বাক্ষর করেন। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বিচারবিভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত। বিচারক নিয়োগ থেকে শুরু করে বিচারকদের জন্য আইন বিধিমালা তৈরিতে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে দেখা যাচ্ছে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মতো এমন ক্ষমতাধর সরকারপ্রধান অন্য কোথাও কোনও গণতন্ত্রে আছে কি না তা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এবং আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মতো অসহায় নন। ডোনাল্ড ট্রাম্প কি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মতো ক্ষমতাধর হতে চান?

অথচ কি আশ্চর্য! খালেদা জিয়া এখন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্ব করতে চাইছেন। তাঁর দল আগামী নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় গেলে এর জন্য সংবিধান সংশোধন করা হবে। বুধবার তিনি এই মর্মে ভিশন ২০৩০ উপস্থাপন করবেন বলে পত্রপত্রিকার রিপোর্ট বলছে। ১৯৯১ সাল থেকে তিনি তিন তিন বার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এত ক্ষমতা তাঁর আর ভালো লাগছে না? তাঁর দলের নেতারা বলছেন প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীকে নাকি স্বৈরাচার করে তোলে! ক্ষমতার অনেক ভারসাম্য থাকা সত্ত্বেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে বলা হয় নির্বাচিত স্বৈরশাসক। কারণ সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী নানা ভাবে সংসদ এবং মন্ত্রিসভার উপর প্রভাব বিস্তার করেন। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা যা আমরা অনুসরণ করছি সেই ওয়েস্টমিনিস্টার মডেল অব পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির জন্মস্থান হলো ব্রিটেন। আর সেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে যদি নির্বাচিত স্বৈরশাসক বলা হয় তাহলে আমাদের অবস্থান কোথায় তা  সহজেই অনুমেয়।

বুধবার খালেদা জিয়া যদি সত্যি এমন প্রস্তাব দেন যে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমাতে হবে তাহলে সেটা নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত করবে। তিনি তিন বার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। একটা বড় রাজনৈতিক দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিন দশকের বেশি সময় ধরে। তাঁর অনুধাবন, পর্যবেক্ষণকে আমরা গুরুত্ব সহকারে নিতে চাই। তবে আমরা আশা করবো তিনি রাজনৈতিক দলের ভিতর কিভাবে গণতন্ত্রের চর্চা বাড়ানো যায় সে সম্পর্কেও কিছু প্রস্তাব দিবেন। কেননা দলের ভিতর গণতন্ত্রের চর্চা না থাকলে শুধু প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা যাবে না। রাজনৈতিক দল হলো গণতন্ত্র চর্চা শেখার স্কুল। সেখানে যদি কিছু শেখানো না হয় তাহলে হাতে ক্ষমতা পেয়ে কেউ হঠাৎ গণতন্ত্রী হয়ে উঠবে না।