দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল উদ্বোধন: সম্ভাবনার দ্বার খুলল, কিন্তু কতোটা?
দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল আজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্যে। বাংলাদেশ যে বিকল্প আরেকটি সাবমেরিন কেবলের সঙ্গে যুক্ত হতে পারলো সেটি নিশ্চয়ই বড় খবর এবং এর জন্যে সংশ্লিষ্টদেরকে কৃতিত্ব দিতেই হবে। আমরাও অভিনন্দন জানাচ্ছি।
বলা হচ্ছে, কানেকটিভিটি তথা ডিজিটাইজেশানের আরেকটি সম্ভাবনার দ্বার আমাদের জন্যে উন্মোচিত হয়ে গেল এই কেবলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে। সেটা নিশ্চয়ই হয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনার দরজার কতোটা আমরা খুলতে পারলাম সেই আলোচনাও দরকার।
সাউথ ইস্ট এশিয়া-মিডিল ইস্ট-ওয়েস্টার্ন ইউরোপ-৫ বা সি-মি-উই-৫ নামে কেবলটির যে বিস্তৃতি তার মাধ্যমে বিশাল এই এলাকায় আমাদের কানেকটিভিটিও চলে যাবে। সেই সঙ্গে চলে যাবে এ সংশ্লিষ্ট ব্যবসাও। এর আগে যে কেবলটির মাধ্যমে আমরা প্রথম সাবমেরিন কেবলের সঙ্গে যুক্ত হই সেটার নাম ছিল সি-মি-উই-৪। অর্থাৎ এটি হচ্ছে একই কেবলের পঞ্চম প্রজন্ম। যার প্রথম তিনটির সঙ্গে আমারা যুক্ত হতে পারিনি। সে ক্ষেত্রে আগের সরকারগুলোর ব্যর্থতা আমাদের সবার জানা।
সি-মি-উই-৫ এর মাধ্যমে আমরা এক হাজার ৫০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথেরও মালিক হতে যাচ্ছি। যেখানে সি-মি-উই-৪ এর মাধ্যমে কয়েক দফায় বাড়িয়েও আমাদের মালিকানায় আছে তিনশ জিবিপিএস-এর মতো ব্যান্ডউইথ। যার একটি মাত্র অংশই দেশে ব্যবহার হয়। যদিও সব মিলে দেশের ব্যন্ডউথের চাহিদা সাড়ে চারশ জিবিপিএস-এর ওপরে।
সত্যিই কোনো সন্দেহ নেই যে সি-মি-উই-৫ আমাদের তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বড় একটি ধাপ। কিন্তু প্রশ্নটা হল যে ধাপ পেরুতে যে সময় লাগার কথা তার চেয়ে কেন অনেক বেশী সময় লাগছে?
এই যে সি-মি-উই-৫ এ আজ আমরা যুক্ত হলাম সেই কনসোর্টিয়ামে আমাদের সরকারি কোম্পানি বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি ছাড়াও ১৫টি দেশের আরও ১৮টি সদস্য আছে।
কনসোর্টিয়ামে সকল সদস্য যখন চলতি বছরের মধ্য জানুয়ারিতেই কেবলটির সুবিধা প্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে, কেউ কেউ বা আরও আগে থেকেই যুক্ত হয়ে গেছে কেবলটির সঙ্গে, সেখানে বাংলাদেশকে একই সুবিধা পেতে কেন আরও আট মাস অপেক্ষা করতে হল?
এই যে বিলম্ব এর দায় কে নেবে? আমাদের ট্যাক্সের পয়সাতেই তো তৈরি হয়েছে ৬৬০ কোটি টাকার এই সম্ভাবনার দুয়ার। তবে কেন সেটা খুলতে আট মাস বেশী সময় লাগল? ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা-সব দেশ পারল শুধু আমরাই পারলাম না।
ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখানো এই সরকারের কাছে আমাদের, বিশেষ করে তথ্য প্রযুক্তি খাতের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তারা আমাদেরকে থ্রিজি সেবা দিয়েছেন। সরকারের প্রতি সে জন্যেও কৃতজ্ঞতা। আমরা এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি ডেটা খরচ করছি। কিন্তু ২০১৩ সালে যে থ্রিজি পেয়েছি সেটাও আশপাশের দেশ আমাদের চেয়ে কতদিন আগে দিয়েছে তার হিসেবও তো দরকার।
এখন আমরা ফোরজি নিয়ে কাজ করছি। কবে সেটা আসবে নিশ্চিত না। কিন্তু পাশের দেশগুলো সেটা কতো আগে পেয়েছে সেটও নীতি নির্ধারকদের একবার ভাবতে হবে।
নিজের এগারো ডিজিটের নম্বর ঠিক রেখে অপারেটর বদলের যে প্রযুক্তি যেটাকে মোবাইল নাম্বার পোর্টাবিলিটি বলা হয় সেটা ভারত-পাকিস্তানের গ্রাহকরা এক দশক আগে থেকে ব্যবহার করছে। আমাদের দেশেও সেই সময় থেকে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু গ্রাহকদের জন্যে আজো আমরা সেটা দিতে পারিনি।
নিশ্চিত করে বলতে পারি এই সুবিধাটা চালু হলে মোবাইল ফোনের গুণগত সেবা আরেকটু ভালো হতো। যাক সুখের কথা যে, শেষ পর্যন্ত সেটি আসতে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। তবে তার জন্যেও অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছু সময়।
বলছিলাম, সি-মি-উই-৫ এর কথা। কুয়াকাটায় ল্যান্ডিং ষ্টেশনে কেবলটি যুক্ত হয়েছে বলে সরকার ঘোষণা দিয়েছিল ফেব্রুয়ারি মাসে। তারপর থেকে যে কারণে সেবাটি ঢাকা পর্যন্ত আনা সম্ভব হয়নি তার হল স্থলভাগের কানেকটিভিটির সংযোগ তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
নানা কেলেঙ্কারি এবং বিতর্ক-কুতর্কের পরে শেষ পর্যন্ত যে কানেকটিভিটি স্থাপিত হয়েছে সেটির যে অবস্থা নিয়েও কথা বলা দরকার কয়েক লাইন।
এর আগে দুইবার সি-মি-উই-৫ উদ্বোধনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে উদ্বোধনের একবার সময় ঘোষণা করেছিলেন টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম। কিন্তু স্থলভাগের কানেকটিভিটি তখনো তৈরি হয়নি। যদিও সরকারের দিক থেকে সব সময় বলা হয়েছে কানেকটিভিটির তৈরি। এরপরে একবার তারিখ ঠিক করা হয়েছিল ৩১ জুলাই। কিন্তু এর ঠিক পাঁচ দিন আগে বারো ঘণ্টার জন্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল স্থলভাগের সংযোগ।
সব পেরিয়ে আজ উদ্বোধন হল কেবলটির। কেবলটির ক্ষমতা বলা হয়েছে এক হাজার ৫০০ জিবিপিএস। কিন্তু এখন এই কেবলের মাত্র ২০০ জিবিপিএস ব্যন্ডউইথ স্থলভাগে আনা যাবে। সেটিও আরেক প্রশ্ন। কেন মাত্র এই পরিমাণ ব্যান্ডউইথ আনা হচ্ছে? যেখানে ভারত থেকে কয়েকটি কোম্পানি মিলে প্রায় ৩০০ জিবিপিএস ব্যন্ডউইথ আমদানি করছে তাহলে তো দ্বিতীয় কেবল উদ্বোধনের পরেও ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা থেকেই যাবে।
অন্যদিকে আবার স্থলভাগের কানেকটিভিটি যেহেতু মাঝেমাঝেই ডাউন হয়ে যাচ্ছে, সে কারণে এই কেবলের ওপর ঠিক কতোটা নির্ভর করা যাবে সেটা নিয়েও রয়েছে সংশয়। কারণ শুরুর দিকে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদেরকে দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের ব্যন্ডউইথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যতোটা আগ্রহী মনে হয়েছিল এখন আর তাদেরকে ততোটা আগ্রহী দেখাচ্ছে না। তাদের ভয়, যেখানে এক মিনিটের কেবল ডাউনও মেনে নেওয়া যায় না সেখানে যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেবল ডাউন থাকে সেটা শুধু ‘দেশের কেবল’ এই দায়িত্ব দিয়ে কাভার করা যাবে কি?
তারপরেও চাই সি-মি-উই-৫ সফল হোক এবং দেশের তথ্য প্রযুক্তির নিরাপদ ও অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত হোক এর মাধ্যমে।