রোহিঙ্গা ইস্যু: কেন চীন-রাশিয়ার উচিত জাতিসংঘকে সমর্থন করা?
রাজনৈতিক স্মৃতি স্বল্পস্থায়ী! মাত্র তিন বছর আগে রুয়ান্ডার গণহত্যার ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অনুষ্ঠিত অলোচনায় চীন ও রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদের অন্য সদস্যদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গণহত্যার বিপক্ষে জোরালো বক্তব্য দিয়েছিল। গণহত্যা বন্ধে নিরাপত্তা পরিষদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তাদের সমর্থনে সর্বসম্মতভাবে একটি প্রস্তাবও পাশ হয়।
কিন্তু মাত্র তিন বছর পর নিরাপত্তা পরিষদ গণহত্যা বন্ধে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে দেখে চীন এবং রাশিয়া তাদের অবস্থান থেকে সরে গেছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যায় অভিযুক্ত মিয়ানমার সরকারকে তাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। যে কারণে বিশ্ব জনমত, নিন্দা এবং সমালোচনা উপেক্ষা করে মিয়ানমার রোহিঙ্গা জাতিগত নিধন চালিয়ে যাচ্ছে। গত মার্চে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সরকারের নির্যাতন বন্ধে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আনা প্রস্তাবে ভেটো দেয়।
নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের কারো কারো রাজনৈতিক স্বদিচ্ছার অভাবে অনেক দেশে গণহত্যা বন্ধে জাতিসংঘ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। রুয়ান্ডায় গণহত্যা বন্ধে জাতিসংঘের ব্যর্থতায় বিশ্বজুড়ে নিন্দা এবং সমালোচনার ঝড় উঠে। ১৯৯৪ সালে মাত্র ১০০ দিনে গণহত্যার শিকার হয় আট লাখ মানুষ। জাতিসংঘ ও অনেক বিশ্বনেতা এ গণহত্যা বন্ধে ব্যর্থতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা পর্যন্ত করেছেন।
রুয়ান্ডা গণহত্যার ২০ বছর পর ২০১৪ সালে নিরাপত্তা পরিষদে গণহত্যা বিরোধী প্রস্তাব পাশের প্রাক্বালে পরিষদের অন্যান্য সদস্যদের মতো চীন ও রাশিয়াও গণহত্যার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছিল।
চীনা কূটনীতিক ওয়াং মিন বলেছিলেন, সরকারের উচিত বেসামরিক লোকদের নিরাপত্তা দেওয়া এবং মানবাধিকার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। একটি দেশের বেসামরিক লোকদের রক্ষা করার জন্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়বদ্ধতার কথাও সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
সেদিন রুয়ান্ডার গণহত্যায় দুঃখ প্রকাশ করে রাশিয়ার কূটনীতিক ভিটালি চুরকিন বলেছিলেন, জাতিসংঘের নিষ্ক্রিয়তা ও বিশ্বাসঘাতকতার জন্যেই রুয়ান্ডায় এতো লোক প্রাণ হারিয়েছিলেন।
চীন ও রাশিয়ার কূটনীতিকদের বক্তব্যে গণহত্যার বিরুদ্ধে তাদের উদ্বেগ সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। সে দিনের বক্তব্যে তাদের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু, মিয়ানমার প্রসঙ্গে তাদের বর্তমান অবস্থান তাদের আগের অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আজ (২৮ সেপ্টেম্বর) নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনায় বসবে। একটি ইতিবাচক বিষয় হলো যে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে বিশ্বমতের কাছে একটু হলেও সুর নরম করেছে চীন ও রাশিয়া। এর ফলে, নিরাপত্তা পরিষদ মধ্য সেপ্টেম্বরে মিয়ানমারকে সংঘাত বন্ধের একটি আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিতে সক্ষম হয়। কিন্তু, সেই আহ্বানকে কানে তুলেনি মিয়ানমার। এতে বুঝা যায়, শুধু আহ্বানে কাজ হবে না। মিয়ানমারকে বাধ্য করার জন্য নিরাপত্তা পরিষদকে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। আর এ জন্য চীন ও রাশিয়ার সমর্থন অপরিহার্য। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী অন্য তিন সদস্য দেশ – যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স – গণহত্যা বন্ধে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে তাদের অবস্থান আগেই পরিষ্কার করেছে।
মিয়ানমারে গণহত্যা বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে জাতিসংঘ যদি ব্যর্থ হয় তবে এ জন্য চীন ও রাশিয়াকে অভিযুক্ত করা হবে যেমনটি রুয়ান্ডা গণহত্যা বন্ধে জাতিসংঘের ব্যর্থতার জন্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সকে অভিযুক্ত করা হয়।