উদীচী হত্যাযজ্ঞ: বিচারের বাণী আজো নিভৃতে কাঁদে
যশোরে উদীচী হত্যাযজ্ঞের সেই ভয়াবহ দিন আজ। দীর্ঘ ২৩ বছরেও নৃশংস সেই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার হয়নি।
ঘাতকদের হত্যার বিচার চেয়ে হতাশ নিহতের স্বজন, আহত ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা। তবে সরকারি কৌঁসুলি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছেন দ্রুত উচ্চ আদালতে মামলাটির কার্যক্রম শুরু হবে।
১৯৯৯ সালের ৪-৬ মার্চ ঐতিহাসিক যশোর টাউন হল মাঠে আয়োজন করা হয়েছিল বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলন। প্রথমদিনের অনুষ্ঠান সফলভাবে শেষ হলেও সমাপনী অনুষ্ঠানে বাউল গানের আসরে ২ দফা বোমা হামলা হয়।
বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়েছিলেন ১০ জন। তারা হচ্ছেন: সন্ধ্যারাণী ঘোষ, যশোর জেলা উদীচীর কর্মী শেখ নাজমুল হুদা তপন, স্বর্ণশিল্পী বাবুল সূত্রধর, উদীচী কুষ্টিয়া জেলা সংসদের কর্মী রামকৃষ্ণ রায়, পাম্প মিস্ত্রি ইলিয়াস মোল্লা, শ্রমিক নুরুল ইসলাম, কুষ্টিয়া লালন একাডেমির শিল্পী শাহ আলম, কুষ্টিয়া উদীচীর কর্মী রতন কুমার বিশ্বাস, শাহ আলম মিলন ও সৈয়দ বুলু। আহত হন প্রায় ২০০ নিরীহ মানুষ।
প্রতিবছর এই দিনে শহীদদের স্মরণে আলোচনা, স্মরণসভা, শহীদ স্মারকে আলোক প্রজ্বালন আর বিচারের দাবি করেন স্বজন বন্ধু ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা।
উদীচী ট্র্যাজেডিতে নিহত পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘশ্বাস আজও হতাশা বাড়িয়ে দেয়। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এতবড় বর্বর ঘটনার বিচার না হওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন বোমা হামলায় আহতরা।
উদীচী ও আদালত সূত্র জানায়, সিআইডির ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিটের কারণে ২০০৬ সালের ৩০ মে আদালত থেকে খালাস পেয়ে যায় মামলার সব আসামি। পরে সরকার ওই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করলে পুনরুজ্জীবিত হয় মামলাটি। এরপর মামলাটির আপিল শুনানি আর হয়নি। আটকে আছে আইনের বেড়াজালে।
বিচারের এই দীর্ঘসূত্রিতায় ক্ষুব্ধ যশোরের মানুষ। দ্রুত এ মামলার কার্যক্রম চালুর দাবি করেছেন তারা।
উদীচী ট্র্যাজেডিতে ২ পা হারানো নাহিদ হোসেন ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বর্তমান সরকারের আমলে অনেক মামলার বিচার হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও বিচার হচ্ছে না উদীচী ট্র্যাজেডির। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি দ্রুত উদীচী হত্যা মামলার বিচার করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করুন।'
বোমা হামলায় এক পা হারানো সুকান্ত দাস ডেইলি স্টারকে বলেন, '১৯৯৯ সালে উদীচী ট্র্যাজেডির সময় ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। বতর্মানেও তারা ক্ষমতায় আছে। এই সরকারের আমলেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে। উদীচী হত্যাকাণ্ডেরও বিচার দাবি করছি সরকারের কাছে।'
উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী যশোর জেলা সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহবুবুর রহমান মজনু ডেইলি স্টারকে বলেন, 'দীর্ঘ ২৩ বছরেও নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার হয়নি। এ অবস্থা চলতে থাকলে সাংস্কৃতিক কর্মীরা আর ঘরে বসে থাকবে না। তারা বিচারের দাবিতে রাজপথে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।'
২০০৯ সালে সরকার নিম্ন আদালতের রায়ের (২০০৬ সালের রায়) বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে। ২০১১ সালের ৪ মে সরকারের দায়ের করা আপিলটি বিচারপতি সিদ্দিকুর রহমান মিয়া ও কৃষ্ণা দেবনাথের বেঞ্চ গ্রহণ করেন ও খালাসপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পুনরায় আত্মসমর্পণের জন্য সমন জারির নির্দেশ দেন।
২০১১ সালের ২০ জুন এ সংক্রান্ত আদেশ যশোর বিচারিক হাকিম আদালতে পৌঁছলে, ২১ জুন মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালত খালাসপ্রাপ্ত ২৩ আসামির বিরুদ্ধে সমন জারি করেন।
তাদের মধ্যে মহিউদ্দিন আলমগীর, আহসান কবীর হাসান ও মিজানুর রহমান মিজান মারা গেছেন। বর্তমানে সব আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনে আছেন।