নারায়ণগঞ্জে স্কুল বন্ধে হামলা: ভয়ে বাড়ি ফিরতে পারছে না প্রধান শিক্ষকের পরিবার

নিজস্ব সংবাদদাতা, নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলায় সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের স্কুল 'মায়াদ্বীপ শিশু পাঠশালা' বন্ধে প্রধান শিক্ষিকার বাড়িতে হামলার ঘটনায় মামলা করায় প্রধান শিক্ষিকা মরিয়ম আক্তার পাখিকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন হামলাকারীরা।

হামলাকারীদের হুমকির কারণে ভয়ে বাড়ি ফিরতে পারছেন না প্রধান শিক্ষিকার পরিবার। নিরাপদে বাড়ি ফেরার জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন তারা।

আজ রোববার দুপুরে সরেজমিনে উপজেলার উদ্ধবগঞ্জ এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বাড়ি যেতে না পেরে দুই রুমের একটি টিনের ঘরে ভাড়া বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন ভুক্তভোগী স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মরিয়ম আক্তার পাখি। তার সঙ্গে সেখানে থাকছেন তার মা-বাবা ও ভাই। বাসাটিতে কোনো আসবাবপত্র ও বিছানা নেই। মেজেতে হুগলা বিছিয়ে রাত্রিযাপন করছেন সবাই। সেখানেই শুয়ে আছে প্রধান শিক্ষিকার একমাত্র মেয়ে দেড় মাসের শিশু পারিশা আক্তার।

প্রধান শিক্ষিকা মরিয়ম আক্তার পাখি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, '২২ জানুয়ারি হামলায় আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ২৮ জানুয়ারি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাই। তারপর বাড়িতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় আত্মীয় স্বজন ও এলাকাবাসীর মাধ্যমে জানতে পারি হামলাকারীরা গ্রামে হুমকি ধমকি দিচ্ছে, আমরা বাড়ি গেলে প্রাণে মেরে ফেলবে। আমাদের ঘরবাড়ি ও দোকানে আগুন দিবে। আমাদের গরু জবাই করে খেয়ে ফেলবে। তাই এখানে ভাড়া বাসায় আশ্রয় নিয়েছি।'

তিনি আরও বলেন, 'এখানে কোনো আসবাবপত্র আনতে পারিনি। আমাদের খাবারের সমস্যা হচ্ছে। বিছানা নেই তাই ঠান্ডায় মেঝেতেই ঘুমাতে হচ্ছে। আমরা সারাক্ষণ ভয়ে থাকি। বাইরে যেতেও ভয় হয়।'

হামলার কথা স্মরণ করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন পাখির বাবা মোহাম্মদ মহিউদ্দিন।

কান্নারত তিনি বলেন, 'পড়ালেখা করে কী হবে? পড়ালেখা করলে যদি এভাবে নির্যাতিত হতে হয়। কেন ছেলে মেয়েকে পড়ালেখা করিয়েছি? আজকে আমরা ঘর ছাড়া।'

চোখের জল মুছে তিনি বলেন, 'বাড়িতে ফিরতে পারছি না। আমাদের মুদির দোকান বন্ধ। নদীতে মাছ ধরতে পারছি না। কোনো আয় রোজগার নাই। না খেয়ে কষ্ট করতে হচ্ছে।'

পাখির ছোট ভাই সোনারগাঁও সরকারি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রাশেদ বলেন, 'পড়ালেখা বন্ধ হয়ে আছে। শিশুদের স্কুলের আমিও একজন শিক্ষক। সেটাও বন্ধ।'

মা নাসিমা বেগম বলেন, 'আমাদের একটা গাভী ও বাছুর আছে। সেটাও এখন প্রতিবেশির বাড়িতে। বাড়িতে সবজি, ফল গাছ সবই আছে। এগুলো সবই নষ্ট হচ্ছে। আমরা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে চাই।'

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকাবাসী জানান, হামলাকারী হাশেম কয়েকদিন আগে বলে গেছে, "পাখি পরিবার নিয়ে কত দিন হাসপাতালে থাকবে? বাড়ি ফিরবে না? তখন ঘরবাড়িসহ আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলবো। দেখবো কী করে বাড়ি ফেরে। বাঁচতে চাইলে ঘর বাড়ি আর এ স্কুল ভেঙে নিয়ে যেতে বলে দিও। ওরা গ্রামে থাকতে পারবে না।"

ওই স্কুলের সহকারী শিক্ষিকা সুবেদা আক্তার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'হামলাকারী হাশেম ও তার লোকজন রাস্তার পাশে দোকানে সারাক্ষণ বসে থাকে। আমরা যাওয়া আসার পথেই আমাকেও হুমকি ধমকি দেয় স্কুলে যেন পড়াতে না যাই।'

তিনি বলেন, 'হামলার পর পাখিদের আমি হাসপাতালে নিয়ে যাই। ওরা কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর হাসপাতাল থেকে ৪ দিন পর আমি বাড়িতে ফিরে গেলে হাশেমের নেতৃত্বে কয়েকজন আমাকে ঘেরাও করে ফেলে। ওইসময় গ্রামে পুলিশ থাকায় আমাকে পুলিশ সেখান থেকে উদ্ধার করে। তখনও প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয় এবং জানায় আমি যেন পাখিকে বলে দেই যাতে ওরা গ্রামে না আসে।'

২০০৭ সালে কবি ও মানবাধিকার কর্মী শাহেদ কায়েস 'মায়াদ্বীপ শিশু পাঠশালা' নামে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। এ প্রসঙ্গে কবি শাহেদ কায়েস দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'হামলার ঘটনায় মামলা করার পর পুলিশ ১ আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তবে এখনও মূল আসামিরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারাই বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে হুমকি ধামকি দিচ্ছে। বলছে, গ্রামে ফিরে গেলে পাখিদের মেরে ফেলবে। আমরা চাই বাকি আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হোক। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এ ধরনের হামলা বা স্কুল বন্ধের পাঁয়তারা করতে সাহস না পায়, কোনো শিক্ষকের উপর হামলা করার সাহস না পায়।'

তিনি আরও বলেন, 'একইসঙ্গে প্রধান শিক্ষিকার পরিবার যেন দ্রুত নিরাপদে গ্রামে ফিরে স্কুল চালু করতে পারে সে জন্য পুলিশ প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সকলের হস্তক্ষেপ কামনা করছি। এ সুবিধা বঞ্চিত শিশুরা যেন পড়ালেখা থেকে বঞ্চিত না হয়।'

জানতে চাইলে সোনারগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্র্তা (ওসি) মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'মামলাটি দ্রুত তদন্ত করে ইতোমধ্যে চার্জশীট আদালতে দাখিল করা হয়েছে। এতে ১১জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিরা পলাতক আছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।'

তিনি আরও বলেন, 'হুমকি ধামকির বিষয়টি জানতে পেরেছি। আমরা তাদের নিরাপদে বাড়িতে পাঠানোর সকল ব্যবস্থা নিচ্ছি। আশা করছি খুব শীঘ্রই তারা বাড়ি ফিরে স্কুল চালু করতে পারবে।'

প্রসঙ্গত, গত ২২ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৯টায় নুনেরটেক গ্রামের মায়াদ্বীপ চরে 'মায়াদ্বীপ শিশু পাঠশালা' নামে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার বাড়িতে হামলা চালিয়ে শিশুসহ ৫জনকে পিটিয়ে আহত করে দুর্বৃত্তরা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, স্কুল বন্ধের জন্যই বারদী ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. হাশেমের নেতৃত্বে এ হামলা হয়েছে। একদিন পর এ ঘটনায় ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষিকার ভাই মো. শরীফ বাদী হয়ে হাশেম সহ ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে সোনারগাঁও থানায় মামলা করেছেন।