পুলিশি ধাওয়ায় পুকুরে ডুবে মৃত্যুর অভিযোগ, মামলার প্রধান আসামি বিএনপি নেতা
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় পুলিশের ধাওয়ায় পুকুরে ডুবে নিলয় আহমেদ বাবু নিহতের অভিযোগে পুলিশের এসআইকে ক্লোজড করা হয়। কিন্তু সেই ক্লোজড হওয়া পুলিশকে বাদ দিয়ে বিএনপির মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ও স্থানীয় কাউন্সিলর আবুল কাউসার আশাকে মামলায় আসামি করা হয়েছে।
গত ৪ মে বিকেলে উপজেলার বাগবাড়ি এলাকায় নিখোঁজের ৪ দিন পর পুকুর থেকে নিলয় আহমেদ বাবুর (৩০) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত নিলয় একই এলাকার শোভা মিয়ার ছেলে। নিলয় গেঞ্জি ব্যবসায়ী। বাগবাড়িতে নানীর বাড়িতে স্ত্রী ও মাকে নিয়ে বসবাস করতেন।
মরদেহ উদ্ধারের দিনে নিলয়ের স্বজনেরা অভিযোগ করেছিলেন, বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির এসআই রওশন ফেরদৌসসহ সাদা পোশাকে কয়েকজন ধাওয়া দিলে বাড়ির পাশে পুকুরে নিলয় লাফ দেয়। পরে তাকে লক্ষ্য করে ইট দিয়ে ঢিল দেয় তারা। সেই ইটের আঘাতে আহত হয়ে পানিতে ডুবে মারা যায় নিলয়।
এ অভিযোগের পর ওই রাতেই পুলিশ সুপারের নির্দেশে এসআই রওশন ফেরদৌসকে ক্লোজড করে পুলিশ লাইন্সে পাঠানো হয়।
সেদিন রাতে নিহত নিলয়ের মা লিলি বেগম বাদি হয়ে মামলা করেন। কিন্তু এতে সিটি করপোরেশনের ২৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল কাউসার আশাসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়। আর বিকেলে হাসিনা বেগম ও সোহান নামে আটক দুই জনকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। বর্তমানে দুই জনই কারাগারে আছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় এক যুবক বলেন, 'সেদিন রাতে সাদা পোশাকে রওশন ফেরদৌসসহ তিন জন পুলিশ এসে নিলয়কে গ্রেপ্তারে জন্য ধাওয়া দিলে সে পুকুরে লাফ দেয়। পরে তাকে লক্ষ্য করে ইট ছোঁড়ে তারা। এসময় তাদের সাথে নিলয়ের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ আনা হাসিনা বেগমসহ স্থানীয় আরও কয়েকজন ছিল। নিলয় পুকুরে লাফ দিয়ে পালিয়ে গেছে বলেও তারা সবাইকে বলে যায়। হুমকি ধমকিও দেয়। যদি কেউ কিছু করে তাকে দেখে নেবে। কিন্তু এখন নিহতের পরিবারই উল্টো কথা বলছে তাহলে আমাদের কী করার আছে।'
মামলায় উল্লেখ করা হয়, নিহত নিলয়ের বিরুদ্ধে স্থানীয় হাসিনা বেগম থানায় টাকা ও স্বর্ণ চুরির অভিযোগ দায়ের করেন। ওই অভিযোগ তদন্তের জন্য বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির এসআই রওশন ফেরদৌস ঘটনাস্থলে আসেন। ঘটনা তদন্তের পর স্থানীয় কাউন্সিলর আবুল কাউসার আশা বিষয়টি মীমাংসা করে দেওয়ার দায়িত্ব নেন। নিলয়কে স্থানীয় কাউন্সিলর আশা তার অফিসে যাওয়ার জন্য ডাকেন। কিন্তু নিলয় কাউন্সিলরের অফিসে না যাওয়ায় আমিনুল, হাসিনা বেগম ও শিপলুর মাধ্যমে নিলয়কে ধরে কাউন্সিলর অফিসে নেওয়ার নির্দেশ দেন আশা। পরে কাউন্সিলরের নির্দেশে স্থানীয় আমিনুল, হাসিনা, শিপলু, আফজাল, জিপু, শহিদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম, হাসান ও সোবহান ৩০ এপ্রিল রাত সাড়ে ১০টায় নিলয়ের বাড়িতে যায়। নিলয় তাদের দেখে বাসা থেকে বের হয়ে পালানোর সময় পুকুরে পড়ে যায়। তখন সবাই মিলে নিলয়কে পুকুরে পড়া অবস্থায় ইট পাটকেল মারলে মাথায় ইটের আঘাতে নিলয় পুকুরে পড়ে থাকে। গত ৪ মে সকাল পুকুরে খুঁজতে গেলে কচুরি পানার নিচ থেকে নিলয়ের লাশ উদ্ধার করা হয়।'
হাসিনার অভিযোগের বিষয়ে লিলি বেগম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'গত মাসের শেষে ঘর থেকে নিলয় ও অন্য দুই জন টাকা ও স্বর্ণ চুরি করেছে বলে অভিযোগ করে হাসিনা বেগম। অভিযোগের পর ৩ থেকে ৪ বার এসআই রওশন ফেরদৌস বাসায় আসে। নিলয়কে খোঁজ করে। আর কাউন্সিলর অফিসে যাওয়ার জন্য বলে যায়। কাউন্সিলর অফিসে গেলে মারধর করা হবে এ ভয়ে নিলয় কাউন্সিলর অফিসে যায়নি।'
পুলিশের ধাওয়ায় লাফ দিয়ে পানিতে পড়ে নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ তুলেও কেন মামলায় আসামি করা হয়নি?
তিনি বলেন, 'পুলিশ ছিল কিনা আমরা দেখিনি। তাছাড়া পুলিশ সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দিয়েছে।'
তবে এ বিষয়ে লিলি বেগম আর কিছু বলতে রাজি হননি।
কাউন্সিলর আবুল কাউসার আশা কেন প্রধান আসামি?
জবাবে তিনি বলেন, 'গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমার ছেলে কাউন্সিলর দুলাল প্রধানের পক্ষে কাজ করেছে। আমার ছেলের জন্য বর্তমান কাউন্সিলর আশা এ এলাকায় কোনো সুবিধা করতে পারেনি। এজন্য প্রতিশোধ নিতে কাউন্সিলর অফিসে নিয়ে বিচারের নামে মারধর করতে চেয়েছিল। সেই ভয়ে কাউন্সিলর অফিসে যায়নি আমার ছেলে। তার অনুগামী লোকদের ধাওয়ায় আমার ছেলে পুকুরে পড়ে যায়। আর তারা তাকে লক্ষ্য করে ইট দিয়ে ঢিল দিয়ে হত্যা করে।'
আপনাদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশের এসআইকে ক্লোজড করা হয়েছে।
জবাবে তিনি বলেন, 'কাউন্সিলর আশার নির্দেশে কাউন্সিলর অফিসে নিতে ৩ থেকে ৪ বার অভিযান করেছে এসআই রওশন ফেরদৌস। সে নিলে থানায় নেবে কিন্তু কাউন্সিলর অফিসের জন্য কেন আসবে। এজন্য তাকে ক্লোজড করেছে।'
মামলার পর থেকেই পলাতক রয়েছে নিলয়ের দুই সহযোগী রাজ্জাক ও সাইফুল। সেই সঙ্গে নিলয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলার আসামিরাও পলাতক।
অন্যদিকে বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) রওশন ফেরদৌসের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও বন্ধ পাওয়া যায়।
বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দীপক চন্দ্র সাহা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, সোমবার দুইজনকে গ্রেপ্তারের পর আর কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। সবাই পলাতক রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার অভিযান চলছে।'
তিনি বলেন, 'মঙ্গলবার বিকেলে নিলয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত সোহানকে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আর হাসিনা বেগম অসুস্থ থাকায় তার রিমান্ড চাওয়া হয়নি।'
অভিযুক্ত পুলিশকে বাদ দিয়ে মামলা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, 'বাদী যেই অভিযোগ দিয়েছেন সেই অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা হয়েছে। এখানে কাউকে বাদ দেওয়া বা যুক্ত করার বিষয়ে আমরা কিছু বলিনি। যে কোনো মামলায় আমরা তো চাই ভুক্তভোগী সবাই সুষ্ঠু বিচার যেন পায়। পুলিশের ধাওয়ায় নিলয় পানিতে লাফ দিয়েছে প্রাথমিকভাবে কেউ কেউ পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। তাই এসপি স্যার ক্লোজড করেছে। এ বিষয়ে তদন্ত হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'
নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক আসাদুজ্জামান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আদালত আগামী রোববার রিমান্ড শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছেন। আর হাসিনা বেগম ও সোবহানকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।'
মামলার প্রধান আসামি বর্তমান কাউন্সিলর আবুল কাউসার আশা নিজের ফেসবুকে ভিডিও বার্তায় বলেছেন, এর সঙ্গে তিনি জড়িত না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এমনটা করছে।
ক্লোজড পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।