মামারা মেরে মৃত ভেবে ফেলে যান ভারতীয় সীমান্তে
ওরস মাহফিলে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন শাহাজান মিয়া (২৩)। অনেক খোঁজাখুঁজির পর স্বজনরা তার ফেরার আশা ছেড়ে দেন। ৩ বছর পর এক হাত, এক কান কাটা অবস্থায় ভারত থেকে বাড়িতে ফিরেছেন শাহাজান।
২০১৯ সালের ২৫ জানুয়ারি মৌলভীবাজারের টিলাগাঁও ইউনিয়নের কামালপুরের একটি মাজারে ওরস মাহফিলে যান শাহাজান। সেখান থেকে রাত ২টার দিকে শাহাজানের মামা ইয়াছির মিয়া তাকে গোপনীয় কথা বলার জন্য ডেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করে।
শাহাজানের মামা ফুরকান মিয়া দা দিয়ে শাহাজানের গলা কাটার জন্য কোপ দিলে শাহাজান একটু কাত হয়ে গেলে সেই কোপ তার ডান কাধে পড়ে ডান হাতের গোড়া থেকে হাতটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তার আরেক মামা ওয়াছির মিয়া খাসিয়া দা দিয়ে শাহাজানের মাথা লক্ষ্য করে কোপ দিলে বামপাশের কানসহ শরীরের কিছু অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মবশ্বির মিয়া নামে আরেক মামা ছুরি দিয়ে শাহাজানের বুকে দুটি কোপ দিলে বুকের নিচে মারাত্মক জখম হয়। এ ছাড়া, ইয়াছিন মিয়া নামে তার আরেক মামা ছুরি দিয়ে শাহাজানের বাম হাতে পর পর দুটি কোপ দিলে হাতের বিভিন্ন জায়গায় গুরুত্বর জখম হয়।
মারধরের পর শাহাজানের মামারা তাকে মৃত ভেবে শরীফপুর ইউনিয়নের চাতলাপুর সীমান্তে কাঁটাতারের ভেতরে ভারতীয় অংশে রেখে চলে আসে। পরদিন সকালে বিএসএফ সীমান্তে টহল দিতে গিয়ে তাকে দেখতে পেয়ে উদ্ধার করে কৈলাশহর হাসপাতালে ভর্তি করে। প্রায় বছরখানেক হাসপাতালের আইসিউতে থাকার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ত্রিপুরার আগরতলায় মডার্ন সাইক্রিয়াটিক হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। ২০২১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত সেখানে তার চিকিৎসা চলে।
চিকিৎসার পর জ্ঞান ফিরলে শাহাজান হাসপাতালের এক নার্সের মাধ্যমে দেশের বাড়িতে যোগাযোগ করে। পরে ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে বাংলাদেশের সহকারী হাই কমিশন গত ২২ অক্টোবর শাহাজানকে দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে আখাউড়া-আগরতলা সীমান্ত দিয়ে ত্রিপুরার আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনার ও আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহাজানকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন।
ওইদিন সকাল থেকেই ত্রিপুরা সীমান্তের এপারে আখাউড়া ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের নো-ম্যান্স ল্যান্ডে অপেক্ষা করছিলেন শাহাজানের স্বজনরা।
আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোমানা আক্তারের মাধ্যমে শাহজাহানসহ বাকি ৫ জনকে তাদের স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
এসময় নো-ম্যান্স ল্যান্ডে ভারতের ত্রিপুরায় বাংলাদেশের সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন ছাড়াও সহকারী হাইকমিশনের প্রথম সচিব মো. রেজাউল হক চৌধুরী, কমিশনের এস এম আসাদুজ্জামান (প্রথম সচিব, স্থানীয়), বিএসএফ আগরতলা কোম্পানি কমান্ডার রাজকুমার, বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আক্তারসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
দেশে ফিরলেও শাহাজান বর্তমানে মামাদের ভয়ে ফুফু রূপজান বিবির বাড়িতে বসবাস করছেন।
কুলাউড়া উপজেলার টিলাগাঁও ইউনিয়নের ডরিতাজপুর গ্রামের মানিক মিয়ার ছেলে শাহাজাহান, পেশায় কৃষক।
এ ঘটনায় শাহাজান গত ২২ নভেম্বর বাদী হয়ে মৌলভীবাজার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের ৫ নম্বর আমলী আদালতে তার মামা ওয়াছির মিয়া (৩৮), ফুরকান মিয়া (৩২), মোবাশ্বির মিয়া (৪৫), ইয়াছিন মিয়া (২৫) ও একজন সিএনজি চালককে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করেন। মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
মামলার এজাহার সূত্রে ও সরেজমিনে শাহাজানের ফুফুর বাড়িতে গিয়ে জানা গেছে, টিলাগাঁও ইউনিয়নের ডরিতাজপুর গ্রামের বাসিন্দা মানিক মিয়ার সঙ্গে তার স্ত্রীর পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। বিরোধের কারণে মানিক মিয়ার স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে থাকেন। তখন মানিক মিয়ার ছেলে শাহাজান মিয়া তার বাবার পক্ষ নিয়ে মাকে বোঝানোর চেষ্টা করে। সেই কারণে শাহাজানের মামা ওয়াছির মিয়া, ফুরকান মিয়া, মোবাশ্বির মিয়া ও ইয়াছিন মিয়া তার ওপর ক্ষুব্ধ হন। শাহাজানের মামারা তাকে বিভিন্ন ধরনের ভয়-ভীতি দেখিয়ে হত্যা করে লাশ গুম করার হুমকি দেন। কিন্তু শাহাজান তার বাবার পক্ষ নিয়ে কথা বললে তার মামারা তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে।
শাহাজানের ফুফু রূপজান বিবি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'শাহাজান খুবই শান্ত ও সহজ-সরল প্রকৃতির ছেলে। পরিবারে ৪ ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে দ্বিতীয়। দেড় বছর আমরা তাকে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেছি। পরে জানতে পারি, সে ভারতের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। সরকারের মাধ্যমে তাকে দেশে আনা হয়। এখন সে মামাদের ভয়ে আমার বাড়িতে রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।'
শাহাজানের ফুপাত ভাই এস এম লুৎফুর রহমান বলেন, 'অনেক খোঁজাখুঁজির পর যখন জানতে পারি সে ভারতে রয়েছে তখন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য গত ৬ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করি। এরপর দুই দেশের হাইকমিশনের মাধ্যমে গত ১৮ নভেম্বর শাহাজানকে দেশে আনা হয়। দেশে ফিরলেও এখন সে তার মামাদের আতঙ্কে রয়েছে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।'
শাহাজানের বাবা মানিক মিয়া দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমার ছেলে ওয়াজ মাহফিলে যাওয়ার কথা বলে ৩ বছর আগে বাড়ি থেকে বের হয়। দেড় বছর পর স্থানীয় চেয়ারম্যানের মাধ্যমে জানতে পারি ভারতে আছে। এখন সে সরকারের সহযোগিতায় দেশে ফিরেছে। আমার ছেলে ভয়ে বাড়িতে আসতে চায়নি, তাকে আমার বোনের বাড়িতে রেখেছি।'
এ ব্যাপারে কুলাউড়া থানার অফিসার্স ইনর্চাজ বিনয় ভূষণ রায় দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমার কাছে আসলে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেই। আদালত থেকে নির্দেশনা আসলে আমরা প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করব।'
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ প্রতিবেদককে বলেন, 'এ ঘটনায় আদালত থেকে এখনো মামলার কোন কাগপত্র আসেনি। আসলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করব।'
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ টি এম ফরহাদ চৌধুরী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আপনাদের মাধ্যমে জানলাম। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শাহাজানকে সব ধরনের আইনি সহযোগিতা দেওয়া হবে।'