৫ ভাইকে চাপা দেওয়া চালককে আত্মগোপনে থাকার পরামর্শ দেন মালিক

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

কক্সবাজারের চকরিয়ায় মৃত বাবার শ্রাদ্ধ শেষে ফেরার পথে বেপরোয়া গতিতে চলমান পিকআপের চাপায় ৫ সহোদরের নির্মম মৃত্যুর ঘটনায় ঘাতক পিকআপের চালক সহিদুল ইসলাম সাইফুলকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)।

র‍্যাব সদর দপ্তর গোয়েন্দা শাখা ও র‍্যাব-১৫ এর অভিযানে গতরাতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সাইফুলের হেফাজত থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ঘাতক পিকআপের চাবি।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চালক সাইফুল নিহতদের গাড়ি চাপা দেওয়ার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি স্বীকার করে।

চালক সাইফুলের কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলেও দীর্ঘ ২ বছর ধরে তিনি পিকআপ, চাঁদের গাড়ি ও ৩ টনের ট্রাকসহ বিভিন্ন ধরনের গাড়ি চালানোর কাজে নিয়োজিত ছিলেন। গত ৪ বছর ধরে ঘাতক পিকআপের ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেন এবং গত ৩ বছর ধরে রুট পারমিট মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল।

আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, 'চালক সাইফুল প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানান যে, গত ৮ ফেব্রুয়ারি ভোর আনুমানিক ৫টায় তারেক ও রবিউল নামের ২ জনসহ চকরিয়া থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে সবজি বোঝাই পিকআপ নিয়ে তিনি রওনা করেন। রাস্তায় অধিক কুয়াশা থাকা সত্ত্বেও চালক সাইফুল দ্রুত কক্সবাজার পৌঁছে সবজি ডেলিভারি দেওয়ার জন্য বেপরোয়া গতিতে পিকআপটি চালাচ্ছিলেন।'

এই র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, 'অধিক কুয়াশা ও অতিরিক্ত গতির কারণে মালুমঘাট বাজারের নার্সারি গেটের সামনে রাস্তা পাড় হওয়ার জন্য অপেক্ষারতদের চালক সাইফুল দূর থেকে লক্ষ্য করতে পারেননি। গাড়ির অধিক গতি থাকার কারণে কাছাকাছি এসে লক্ষ্য করলেও গাড়িটি তিনি নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে দুর্ঘটনা ঘটান। দুর্ঘটনার সময় তার সঙ্গে পিকআপ মালিকের ছেলে তারেক ও ভাগনে রবিউল ছিলেন। সাইফুল আরও জানান, দুর্ঘটনার সময় গাড়িটি প্রায় ৬৫-৭০ কিলোমিটার গতিতে চলছিল এবং তিনি গাড়ি থামানোর জন্য ব্রেক করলেও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটি প্রায় ১০০ ফুটের মতো সামনে চলে যায়। পরবর্তীতে সাইফুল পিকআপ থেকে নেমে নিহতদের দেখতে আসলেও মালিকের ছেলে তারেকের নির্দেশে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পলায়ন করেন।'

খন্দকার আল মঈন বলেন, 'দুর্ঘটনার পর সাইফুল মালুমঘাট বাজারের একটি স্থানে গাড়িটি থামিয়ে মালিককে ফোন করে দুর্ঘটনার বিষয়টি জানান। গাড়ির মালিক তাকে পিকআপটি পরবর্তী কোনো এক স্টপেজে রেখে লোকাল বাসে করে তার সঙ্গে দেখা করতে বলেনে। মালিকের নির্দেশনা অনুযায়ী, সাইফুল ডুলাহাজরায় এসে পিকআপটি রাখেন এবং লোকাল বাসে করে চকরিয়ায় গিয়ে মালিকের সঙ্গে দেখা করেন। পিকআপের মালিক মাহমুদুল তাকে নূন্যতম ১ বছর আত্মগোপনে থাকার পরামর্শ দিলে তিনি প্রথমে তার পূর্ববর্তী চাকরিস্থল বান্দরবানের লামার রাবার বাগানে আত্মগোপনে যান।'

তিনি বলেন, 'দুর্ঘটনার ১ সপ্তাহ আগে সাইফুল পিকআপটি মালিকের কাছ থেকে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি ভিত্তিতে চালানো শুরু করেন। এর আগে, তিনি বান্দরবানের লামাতে একটি রাবার বাগানে চাকরি করতেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয়ে অন্যত্র আত্মগোপনের উদ্দেশ্যে তিনি ঢাকায় আসেন এবং রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে র‍্যাব কর্তৃক গ্রেপ্তার হন।'

'পিকআপের মালিক মাহামুদুল করিম চকরিয়ার শামছুল আলমের ছেলে। তিনি মূলত সবজি পরিবহণের ব্যবসা করেন। তিনি চকরিয়ার সবজির আড়ত থেকে কক্সবাজার সদর ও মহেশখালী এলাকায় সবজি সরবরাহ করেন। তার ছেলে তারেক সবজি সরবরাহের তদারকি করতেন এবং ভাগনে রবিউল তারেকের সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। তিনি ২০১৬ সালে পিকআপটি কেনেন। মূলত সবজি পরিবহণের উদ্দেশ্যেই পিকআপটি ব্যবহার করা হতো, যোগ করেন তিনি।

খন্দকার আল মঈন বলেন, 'প্রাথমিকভাবে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে চালকের পূর্বপরিচয় ছিল না বলে জানতে পেরেছি। তবে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে যেসব অভিযোগ এসেছে, পূর্ব শত্রুতার যে অভিযোগ, সেটা তদন্তকারী কর্মকর্তা ক্ষতিয়ে দেখবেন।'

দুর্ঘটনার পর পিকআপের মালিক মাহামুদুল করিম, তার ছেলে তারেক ও ভাগনে রবিউল আত্মগোপনে আছেন। গ্রেপ্তারকৃতের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন বলেও জানান এই র‌্যাব কর্মকর্তা।