অসময়ের বন্যায় ডুবেছে ধান, ঋণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় তিস্তাপাড়ের কৃষক

এস দিলীপ রায়
এস দিলীপ রায়

'এ বছর আমরা কী খাব, কেমন করে বাঁচবো তারই ঠিক নাই, কীভাবে ঋণের টাকা শোধ করবো,' চোখের পানিতে বলছিলেন তিস্তাপাড়ের আনু বেগম (৪৮)।

অসময়ের বন্যায় পানিতে ডুবে গেছে ধান। জানান, ৫ বিঘা জমিতে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বোরো আবাদ করেছিলেন। সব ডুবেছে। যে আধাপাকা ধান কেটে এনেছেন তাতে ধান পেয়েছেন মাত্র ২১ কেজি।

এ ধান খাবেন না বেচে ঋণ শোধ করবেন তাই ভেবে পান না তিস্তাপাড়ের কৃষক আব্দুল জলিলের (৫৫) স্ত্রী আনু বেগম।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের চর গোবর্ধানে কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল তাদের ৭ জনের সংসার।

আনু বেগম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, এনজিও আর স্থানীয় মহাজনের কাছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছি। গেল বছর ৫ বিঘা জমি থেকে ৭৭ মণ ধান পেয়েছিলাম। এ বছর অসময়ের বন্যায় সব ডুবল।

আনু বেগমের স্বামী কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, 'এবছর না পারবো ঋণ শোধ করতে, না পারবো সংসার চালাতে। অসহায় হয়ে পড়েছি।'

একই চরের নুরবানু বেগম (৫২) জানান, তারা এনজিও এবং মহাজনের কাছ থেকে প্রায় এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিস্তার বুকে ৮ বিঘা জমিতে বোরো ধান লাগিয়েছিলেন। ধান পেয়েছেন ৩৫ কেজি।

'আধাপাকা ধান কেটে এনেছি। ধানের গাছগুলো পঁচে নষ্ট হয়ে গেছে।'

'আমরা সারা বছর বোরো ধানের উপর নির্ভরশীল। ৬ জনের সংসার এ বছর কীভাবে বাঁচবে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না,' তিনি বলেন।

'ঋণের টাকা পরিশোধ করার জন্য চাপ আসছে কিন্তু আমরা তো নিরুপায়।'

এটা শুধু চর গোবর্ধানের চিত্র নয়। এ চিত্র লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলায় তিস্তা নদীর বুকে ৯৫টি চরের। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদীর বুকে ধানসহ নানা ফসল উৎপন্ন করে চরের কৃষকরা জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। এবছর চৈত্র মাসে অসময়ে তিস্তা নদীতে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় তাদের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

'আমার জীবনে চৈত্র মাসে কখনো বন্যা দেখিনি। অসময়ের বন্যা চরের কৃষকদের স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। এবছর আমাদের অনাহারে-অর্ধাহারে কাটাতে হবে,' জানান চর গোর্বধানের কৃষক মেছের আলী (৭০)।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার তিস্তাপাড়ের চর বগুড়াপাড়ার কৃষক সেকেন্দার আলী (৬৭) কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, তিনি দশ বিঘা জমিতে বোরো ধান লাগিয়েছিলেন কিন্তু বন্যায় তার সব ধান নষ্ট হয়েছে।

'আমি এনজিও এবং স্থানীয় মহাজনের কাছে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়েছি। আশা ছিল বোরো ধান বিক্রি করে এসব ঋণ পরিশোধ করব। কিন্তু সে আশা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। এখন ঋণ পরিশোধের জন্য চাপ সহ্য করতে হচ্ছে,' তিনি বলেন।

'একদিকে সংসার চালানোর জ্বালা অন্যদিকে ঋণের জ্বালা আমাদের অতিষ্ঠ করে তুলেছে,' তিনি বলেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামীম আশরাফ বলেন, চরে যে চাষাবাদ হয় তার কোনো হিসাব আমাদের কাছে নেই। তবে অসময়ে আকস্মিক বন্যায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের তালিকা করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর সেই নির্দেশ মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে।