লালমনিরহাট

‘এ্যাদোন করি জিনিসপাতির দাম বাইড়লে কি হামরাগুলা বাঁচমো’

এস দিলীপ রায়
এস দিলীপ রায়

'এ্যাদোন করি জিনিসপাতির দাম বাইড়লে কি হামরাগুলা বাঁচমো। বাজারত ৫ শ টাকার নোট নিয়া গ্যাইলে অল্প এ্যাকনা খরচা কইরলে শ্যাষ'—বলছিলেন, লালমনিরহাট সদর উপজেলার উত্তরসাপ্টানা গ্রামের বাসিন্দা বিধবা কান্দ্রি বালা (৬৪)।

তার সংসারে রয়েছে ছেলে, ছেলের বউ ও ৩ জন নাতি-নাতনি। সম্বল বলতে দুই শতাংশ জমি। ছেলে সুধান চন্দ্র রায় রিকশা চালান। সুধানের আয়ে চালাতে হয় ৬ জনের সংসার। লাগামহীনভাবে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে কান্দ্রি বালার পরিবার।

সংসারের অভাব মেটাতে প্রায়ই রিকশার হ্যান্ডেল ধরতে হচ্ছে কান্দ্রি বালার নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া নাতি জীবন চন্দ্র রায়কেও। টানাপোড়েনের মধ্যে চলে তার সংসার। ভবিষ্যতের সঞ্চয় বলতেও নেই কোনো কিছু।

lalmonirhat_poverty-02.jpg
পরিবারের জন্য রান্না করছেন সুখি বেগম। ছবি: এস দিলীপ রায়

কান্দ্রি বালা দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, কয়েক মাস আগেও সংসার খরচের জন্য প্রতিদিন ৩০০-৩৫০ টাকা লাগতো। এখন সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০০-৪৫০ টাকায়। কিন্তু তার ছেলের আয় বাড়েনি বরং আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। তার একার আয়ে সংসার খরচ মেটাতে পারছে না। এখন একবেলা না খেয়ে কাটাতে হচ্ছে। সকালে আটার রুটি খেয়ে সারাদিন কাটাতে হচ্ছে। আটার দামও দিন দিন বাড়ছে। 

কান্দ্রি বালা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'হামারগুলার কষ্টের শ্যাষ নাই। হামারগুলার কামাই বাড়ে না কিন্তু খরচা আগের মতোন আছে।'

কান্দ্রি বালার ছেলে সুধান চন্দ্র রায় (৪৪) দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, আয় রোজগার আগের মতোই রয়েছে। দিনে ৩০০-৪০০ টাকা আয় করতে পারেন। সপ্তাহে ৪-৫ দিন রোজগার হয়। জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বেড়েছে তাতে প্রতিদিন ৫০০ টাকার নিচে আয় করলে তার পক্ষে সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে যায়। কিন্তু আয় তো বাড়ছে না। 

তিনি বলেন, 'সংসার চালবার য্যায়া মুই দিশেহারা হয়া পইরবার নাগছোং। মোর মতোন সবার অবস্থাও হইছে।' 

'উপবাস থাকি তো কাম করা যায় না। হামাকগুলাক খাওয়ায় নাগে'— বলেন সুধান চন্দ্র।

আদিতমারী উপজেলার তিস্তাপাড়ের কুটিরপাড় গ্রামের সুখী বেগম (৪৫)-এর সংসারে স্বামী ও ৩ সন্তান রয়েছে। স্বামী মজিদুল ইসলামের (৫০) আয় দিয়ে সংসার চলে। তিনি দিনমজুরি করে দিনে দুইশ থেকে আড়াইশ টাকা রোজগার করেন। সুখী বেগম নিজেও গ্রামে দিনমজুরি করে ১০০-১২০ টাকা আয় করেন। দুজনের আয়ে কোনো রকমে সংসার চললেও দ্রব্যমূল্যে বেড়ে যাওয়ায় হিমশিম খেতে হচ্ছে।

সুখি বেগম দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, এখন তার আগের মতো কাজ জোটে না। কোনো কোনো দিন কর্মহীন থাকতে হয়। কিন্তু পেটের ক্ষুধা মেটাতে খাবার যোগাড় করতেই হয়। সব পণ্যের দাম বেড়েছে। কোনো কোনো জিনিসের দাম আবার দ্বিগুণ হয়েছে। 

তিনি বলেন, 'হামারগুলার যে কি হইবে, আল্লাহ ছাড়া কাই জানে না। ছওয়া পোয়াক নিয়া আটা পেটা থাকা নাইকবার নাইকছে। কোনটে কোনা যামো হামরা।'

জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংসার চালাতে জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে সুখি বেগমের স্বামী মজিদুল ইসলামের। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'হামারগুলার মরণ ছাড়া আর কোন উপায় নাই।'