তিস্তার ভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে ৫০ বছরের চিলমারীপাড়া গ্রাম

এস দিলীপ রায়
এস দিলীপ রায়

লালমনিরহাটে হাতীবান্ধা উপজেলার সিন্দুর্না ইউনিয়নে চিলমারীপাড়া গ্রাম। ৫০ বছর আগে মাত্র সাতটি পরিবার নিয়ে গ্রামটি গড়ে উঠেছিল তিস্তা নদীর বুকে। ধীরে ধীরে গ্রামটিতে বসবাস শুরু করে ২৫০টি পরিবার।

তবে, সবুজ-শ্যামলে ভরা গ্রামটি এখন তিস্তা নদীর গর্ভে। বসতভিটা ও আবাদি জমি হারিয়ে এই গ্রামের সহস্রাধিক মানুষ এখন আশ্রয় নিয়েছেন খোলা আকাশের নিচে। আর গ্রামটি হারিয়ে যাচ্ছে মানচিত্র থেকে।

ভাঙনকবলিত সাদেকুল ইসলাম (৪৭) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'দুই সপ্তাহ আগেও এখানে বসতভিটা ছিল। ফসলে ভরা আবাদি জমি ছিল। এখন শুধু পানি আর পানি। তিস্তার উদরে হারিয়ে গেছে চিলমারীপাড়া গ্রামটি। এখন আর গ্রামটির কোনো অস্তিত্ব নেই। শুধু জমা হয়ে থাকল কিছু স্মৃতি।'

tista2.jpg
তিস্তার ভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে চিলমারীপাড়া গ্রাম। ছবি: দিলীপ রায়/স্টার

তিনি আরও বলেন, 'চিলমারীপাড়া গ্রামে ২৫০টি পরিবারের মধ্যে শুধু ৩০-৩৫টি পরিবার আছে। তারপরও এসব পরিবারের বসতভিটা ভাঙন ঝুঁকিতে আছে। যে কোনো সময় তিস্তার গর্ভে চলে যেতে পারে।'

ভাঙনকবলিত সুর্য্য বেওয়া (৬৫) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বসতভিটা তিস্তার গর্ভে হারিয়ে গেছে। ঘর-বাড়ি ও আসবাবপত্র নৌকায় নিয়ে তিস্তার বুকে ভাসছেন ভাঙনকবলিতরা। ছুটছেন এক টুকরো নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। আশ্রয় মিলবে কিনা সেটাও অনিশ্চিত। আবার কেউ কেউ নৌকা ভাড়ার টাকা যোগাড় করতে না পারায় ফেলে রেখেছেন ঘর-বাড়ি।'

ভাঙনকবলিত বাদশা আলম (৫৬) বলেন, 'বসতভিটা আবাদি জমি হারিয়ে স্বজন হারানোর চেয়ে বেশি শোকাহত হয়ে কাঁদছেন চিলমারীপাড়ার মানুষ। এক গ্রামে পাশাপাশি থেকে বসবাস করার মমত্ববোধ ও প্রেমকে ছিনিয়ে নিয়েছে তিস্তা। বসতভিটা হারিয়ে বিভিন্নজন বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিতে শুরু করেছেন। আর কবে একে অপরের সঙ্গে দেখা হবে কেউ বলতে পারছেন না।'

tista1.jpg
কেউ কেউ নৌকা ভাড়ার টাকা যোগাড় করতে না পারায় ফেলে রেখেছেন ঘর-বাড়ি। ছবি: দিলীপ রায়/স্টার

খোদেজা বেগম (৪৫) বলেন, 'কেউ খোঁজ রাখেনি এই গ্রামের মানুষগুলোর। তাই কষ্টভরা অশ্রুতে মিশে একাকার সবাই। অসহায় হয়ে ছেড়ে যাচ্ছে জন্মস্থান চিলমারীপাড়া গ্রামটি। হয়তো একদিন চর জাগলে দেখতে আসবেন আজকের চলে যাওয়া ভাঙনকবলিতরা।'

লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'অর্থ না থাকায় ভাঙনকবলিত গ্রামটিতে কাজ করা সম্ভব হয়নি।'

উল্লেখ্য, প্রায় ৫০ বছর আগে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার চিলমারী ইউনিয়ন থেকে মৃত তফু মণ্ডলের নেতৃত্বে ৭টি পরিবার এসে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তাপাড় সিন্দুর্না ইউনিয়নে বসবাস শুরু করে। তারা গ্রামটির নাম দেয় চিলমারীপাড়া। ফসল ফলানো আর গরু পালন হয়ে উঠে এই গ্রামের মানুষের জীবিকার উৎস। তবে, গ্রামটি এখন শূন্য, হারিয়ে যাচ্ছে নদীর গর্ভে।