ট্রেনের নিচে পড়ে ৩ স্কুল শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে শোকের মাতম

নিজস্ব সংবাদদাতা, কুমিল্লা

রেললাইনের পাশে মাটিতে পড়ে আছে স্কুলব্যাগ। পড়ে আছে ভাঙা টিফিন বক্স, পাথরের ওপর ছড়িয়ে আছে খাবার, বই। পাশে পড়ে আছে স্কুলের পোশাক পরা স্কুল শিক্ষার্থীর মরদেহ।

গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর বাজারের কাছে ট্রেন কাটা পড়ে নিহত হয় ৩ শিশু। ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা সেখানে ছুটে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখতে পান।

বিজয়পুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম ডাবল লাইন ট্র্যাকের লেভেল ক্রসিং থেকে প্রায় ১৫০ মিটার দূরে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলে নিহত হয় মিম আক্তার, রিমা আক্তার ও তাসফিয়া আক্তার আয়েশা। তারা ৩ জনই বিজয়পুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তো।

বিজয়পুর বাজারের কাছে দুর্গাপুর মানিক্যা পুকুরপাড় এলাকায় থাকতো তারা। ঘটনার কয়েক মিনিট আগে প্রতিদিনের মতো গতকালও স্কুলের উদ্দেশে তারা বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল।

হাজী সেলিম নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, 'তারা একটি রেললাইন পার হওয়ার সময় ট্রেন আসতে দেখে। তাই তারা দ্রুত অন্য একটি রেললাইনের ওপর চলে যায়। কিন্তু সেই লাইনেও আরেকটি ট্রেন আসছিল। সম্ভবত তারা সেটি দেখেনি। একেবারে শেষ মুহূর্তে ট্রেনটি দেখার পরে তারা আর সরতে পারেনি।'

চট্টগ্রামগামী ট্রেন মহানগর প্রভাতী তাসফিয়াকে ধাক্কা দিয়ে প্রায় ৩০০ মিটার টেনে নিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মিম ও রিমা রেললাইন থেকে পাশে ছিটকে পড়েন।

ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী রেললাইনে আগুন ধরিয়ে দেয়। লেভেল ক্রসিং এলাকায় ওভারপাসের দাবিতে তারা কুমিল্লা-নোয়াখালী মহাসড়ক অবরোধ করে।

প্রায় আধা ঘণ্টা পর জেলা প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা সেখান থেকে সরে যান।

জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে দিয়েছেন। বিষয়টি তদন্তের জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব) জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, 'এটি খুবই দুঃখজনক ঘটনা। সম্ভবত শিশু ৩টি আসন্ন বিপদ বুঝতে পারেনি।'

নিহত ৩ শিক্ষার্থীদের গ্রাম দুর্গাপুর মানিক্যার পুকুর পাড়ের এলাকায় নিহত পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোক বিরাজ করছে। নিহত তাসফিয়াকে তাদের পৈত্রিক বাড়ি কুমিল্লার বরুড়া এলাকার অর্জুনতলা গ্রামে রাতেই দাফন করা হয়েছে। রিমা ও মিমকে বিজয়পুর বাজারের পাশের কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

এদিকে, ট্রেনে কাটা পড়ে ৩ শিক্ষার্থী নিহত হওয়ায় শোক পালনে বিজয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আজ বৃহস্পতিবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাদেকুর রহমান ভুইয়া বলেন, 'বুধবার ট্রেন দুর্ঘটনায় ৩ শিক্ষার্থী নিহত হওয়ায় স্কুলের অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। দুর্ঘটনার পর স্কুলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাসহ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কর্মকর্তারা স্কুল পরিদর্শনে আসেন। শোকপালনে বৃহস্পতিবার স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে।'

এ প্রসঙ্গে সদর দক্ষিণ উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাবলু বলেন, 'এখানে কয়েক হাজার লোক প্রতিদিন এই সড়ক ও রেলপথ পাড়ি দিয়ে স্কুলসহ বিজয়পুর বাজারে যাতায়াত করেন। এলাকাবাসীদের সচেতনতার পাশাপাশি রেল কর্তৃপক্ষরও এখানে দায় রয়েছে।'

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা শুভাশিষ ঘোষ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'জেলা প্রশাসনের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী বিজয়পুর স্কুল সংলগ্ন রেললাইন ও সড়কপথটিকে স্কুল শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীদের চলাচলে ঝুঁকি হ্রাস করতে যথাপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের উচ্চমহলে আবেদন করা হবে।'