সুগন্ধায় নিখোঁজদের খোঁজে স্বজনেরা

নিজস্ব সংবাদদাতা, বরিশাল ও পিরোজপুর

ভাই খুঁজছেন বোনকে, বাবা খুঁজছেন সন্তানকে। চোখ ভরা পানিতে সুগন্ধা নদীতে আপনজনদের খুঁজে ফিরছেন স্বজনরা। কিছুতেই মনের বাঁধ মানছে না। যদি কোথাও তাদের খোঁজ পাওয়া যায়।  

ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে শুক্রবার ভোররাতে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে আগুনের ঘটনায় এখনো নিখোঁজ অনেকে।

ফায়ার সার্ভিস ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা নদীর বিভিন্ন স্থানে অনেক খোঁজাখুঁজির পরও নতুন করে কোনো মৃতদেহ উদ্ধার হয়নি। তাই নিজ উদ্যোগে নদীতে স্বজনদের খুঁজতে বের হয়েছেন অনেকে।

সুগন্ধা নদীর তীরে ট্রলারঘাটে ভিড় দেখে চিনতে বেগ পেতে হয় না তারা স্বজনদের খুঁজছেন। কেউ কেউ হাতে ছবি নিয়ে এসেছেন। যাদের স্বজনরা দুর্ভাগ্যের লঞ্চের শেষ যাত্রী হয়ে এসেছিলেন।

ঢাকার ডেমরা থেকে এসেছেন জনি। দূরে উদাস দৃষ্টি। তিনি জানান, দুই মেয়ে এক ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে বরগুনার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল তার সুখের সংসার। এক মুহূর্তেই স্বপ্ন পুড়ে ছাই। এখন পর্যন্ত পোড়া দেহ বা জলে ডোবা মৃতদেহ কোনোটাই পাননি তিনি। অন্তত লাশ যদি পান এই আশায় এসেছেন।

এমনিভাবে ফরিদা বেগম তার পরিবারের তিন সদস্যকে খুঁজতে এসেছেন। ঢাকা থেকে মনির হোসেন নামে এক যুবক জানান, বোন ছোট ভাই, ভাইঝিসহ তিন সদস্যকে খুঁজছেন তিনি।

বরগুনার মানিকখালী গ্রামের নজরুল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে তারা বোন পাখি, ভগ্নিপতি হাকিম শরীফ ভাগনে নাসরুল্লাহ লঞ্চে করে রওনা দেয়। এরপর এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকান্ডের পর তাদের কাউকেই আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ট্রলার নিয়ে নদীতে খুঁজতে বের হয়েছেন বলে জানান নজরুল।

pirojpur-_3.jpg
ছবি: স্টার

বরগুনার খাজুরা গ্রামের হেলাল হাওলাদার জানান, তার ভাই মাহিন, বোন রিমু, ছেলে মুতাচ্ছিরকে নিয়ে লঞ্চে করে বাড়ি ফিরছিল। ঝালকাঠিতে অগ্নিকান্ডের পর তাদের ৩ জনের কাউকেই পাওয়া যায়নি। মৃতদেহগুলোর মধ্যে এবং হাসপাতালে কোথাও তাদের না পেয়ে অন্যান্য নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের সঙ্গে নদীতে ভাই, বোন আর ভাইপোকে খুঁজতে বের হয়েছেন তিনি। মাহিন ঢাকায় গ্যাসের লাইনে কাজ করেন। রিমু একটি কলেজে আর মুতাচ্ছির একটি মাদ্রাসায় পড়ে।

বৃহস্পতিবার তাদের ঢাকায় লঞ্চে তুলে দিয়েছিল হেলাল। লঞ্চ দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরই শুক্রবার তিনি ঝালকাঠিতে এসেছেন।

বরগুনার তালতলী উপজেলার বগী ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. জসিম ফকির জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে ভাবী রেখা বেগম, ভাতিজি সোনিয়া এবং সোনিয়ার দুই সন্তান জুবায়ের ও জুনায়েদকে ঢাকা থেকে লঞ্চে তুলে দেন। লঞ্চটির দ্বিতীয় তলায় ডেকে তারা বরগুনায় আসছিলেন। তবে দুর্ঘটনার পর সোনিয়া আর জুবায়েরকে পাওয়া গেলেও অন্য দুই জনের সন্ধান পাননি তারা। তাই দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর জসিম ছুটে এসেছেন ঝালকাঠিতে। সকাল থেকে সুগন্ধা ও বিষখালী নদীর বিভিন্ন স্থানে খুঁজেও কোথাও তাদের খুঁজে পাননি বলে জানান জসিম।

সুগন্ধা নদী তীরের বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির সদস্য রাজু হাওলাদার জানান, এখন পর্যন্ত ৫১ জন নিখোঁজ স্বজনদের নাম নথিভুক্ত আছে। যাদের মধ্যে একই পরিবারের একাধিক সদস্য রয়েছেন বেশ কয়েকজন।

ঝালকাঠি ছাড়াও বরগুনায়ও নিখোঁজকৃতদের তালিকা তৈরী হচ্ছে। বরগুনার জেলা প্রশাসক হাবিুবুর রহমান জানান এ পর্যন্ত ১৭ জন নিখোঁজের নাম নথিভুক্ত করেছেন।

ঝালকাঠির জেলা প্রশাসন স্বজনদের থাকার জন্য ঝালকাঠির টেকনিকালে অস্থায়ী আবাসন সুবিধার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

pirojpur-_4.jpg
ছবি: স্টার

এদিকে পুড়ে যাওয়া লঞ্চটিকে দিয়াকুল গ্রাম থেকে সরিয়ে ঝালকাঠি লঞ্চ টার্মিনালে আনা হয়েছে। তবে এর নিচে কোনো মৃতদেহ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন বরিশাল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর উপসহকারী পরিচালক মো. বেলাল উদ্দিন। তবে এরপরও তারা নদীর বিভিন্ন স্থানে নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজছেন।