‘আমরা আগুনে পুড়ে যাচ্ছি, আমাদের বাঁচাও’

মিন্টু দেশোয়ারা
মিন্টু দেশোয়ারা

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কারখানার অগ্নিকাণ্ড থেকে বেঁচে ফেরা শ্রমিক লিমা আক্তার বলেছেন, কারখানায় আগুন লাগলে আমি নিচতলায় থাকায় বেরিয়ে আসতে পেরেছি। কিন্তু আমার বোন তুলি চতুর্থ তলায় ছিল। আজ পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘ভেতরে তালা মারল কেন? তালা দেওয়ার কারণে কেউ বের হতে পারেনি, সবাই আগুনে পুড়ে মারা গেছে। আমার বোনের কাছে কোনো ফোন ছিল না। যাদের কাছে ফোন ছিল তারা ফোন দিয়ে বলেছিল, আমরা কোনোভাবেই বের হতে পারছি না, আমরা আগুনে পুড়ে যাচ্ছি, আমাদের বাঁচাও।’

‘আপনারা কি আমার বোনকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন। আপনারা থাকতে এতো প্রাণ আগুন পুড়ে মরবে কেন? তুলিকে চোখের সামনে রেখে বড় করেছি। বোনকে আশপাশে আর না দেখলে কেমন লাগবে বলেন’, এসব বলতে বলতে বার বার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন লিমা।

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড যদি প্রতিহত না করা যায়, তাহলে দিনে দিনে যে কতো মায়ের বুক খালি হবে, তার হিসেব নেই। হাসপাতালে গিয়েছিলাম বোনকে খুঁজতে, কিন্তু সেখানেও আমাকে প্রবেশ করতে দেয়নি। এ ঘটনায় দোষীদের বিচার না হলে বুঝব সরকার তাদের সঙ্গে আছে।’

‘বিশ্বাস করেন, আমি শুধু লেলিহান আগুন চেয়ে চেয়ে দেখেছি। যে আগুনে আমার বোন পুড়েছে, আরও অনেকেই পুড়েছে, আমারও ইচ্ছে করছিল সেই আগুনে পুড়ে মরতে, আমার আর বেঁচে থেকে কী লাভ’, বলছিলেন লিমা।

লিমা জানান, লকডাউনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ওই কারখানায় তার সঙ্গে কাজ করতে গিয়েছিল ছোট বোন তুলি আক্তার।

তারা দুই বোন কারখানা সংলগ্ন নতুন বাজার এলাকায় থাকতেন বলে জানান লিমা। ঈদুল আযহার আগেই দুজনের বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু তা আর হলো না। কারাখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে বড় বোন রক্ষা পেলেও ছোট বোন এখনো নিখোঁজ।

লিমা ও তুলি হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার ভাদিকারা গ্রামের আব্দুল মান্নানের মেয়ে। তুলি উপজেলার কালাউক উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে আর লিমা লাখাই মুক্তিযোদ্ধা ডিগ্রি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়তো।

তাদের আরেক বড় বোন হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজে অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী জুহি আক্তার বলেন, ‘সংসারে অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা আছে। এজন্য লকডাউনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার সুযোগে দুই বোন মিলে অর্থ উপার্জনের জন্য কাজে গিয়েছিল। তুলি গত ৩০ জুন স্কুলে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিয়ে ওইদিনই কর্মস্থলে যায়। কোরবানি ঈদের আগেই তাদের বাড়ি ফেরার কথা ছিল।’

এ ঘটনার পর থেকে তাদের মা বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন পরিবারের অন্য সদস্যরা।

নিখোঁজ তুলির বাবা আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আমার ছয় মেয়ে ও দুই ছেলে। এদের মধ্যে তুলি পাঁচ নম্বর। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে গিয়ে আমার মেয়ের উচ্চ শিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।’ 

এ কথা বলতে বলতে তিনি নিজেও কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ ঘটনায় সরকারি সহযোগিতা ও কারখানা কর্তৃপক্ষের বিচার কামনা করেছেন তিনি।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় রূপগঞ্জের কর্ণগোপ এলাকার হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কারখানার একটি ছয়তলা ভবনের নিচতলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। অল্প সময়ের মধ্যে আগুন ওপরের ফ্লোরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। আগুন লাগার পর পরই ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে তিন জন মারা যান। আহত হন ১০ জন। পরদিন শুক্রবার বিকেলে আগুন নিভিয়ে ফেলার পর ৪৮ জনের পোড়া মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

এ ঘটনায় অবহেলার অভিযোগ মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় কারখানার মালিক মো. আবুল হাসেমসহ তার চার ছেলে ও ডিজিএম, এজিএম ও প্রকৌশলীসহ আট জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের গতকাল চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।