রংপুর অঞ্চলের আলুচাষিদের মুখে হাসি
উৎপাদন খরচ ছিল বাড়তি। তবে ফলন হয়েছে ভালো। পাশাপাশি বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বেশি বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে সন্তোষজনক দামও পাওয়া যাচ্ছে। ফলে প্রত্যাশিত মুনাফা পেয়ে উজ্জ্বল হয়েছে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের আলুচাষিদের মুখ।
এ অঞ্চলের কৃষকরা বলছেন, বর্তমান বাজারে অন্যান্য সবজির দাম চড়া হওয়ায় আলুর চাহিদা বেড়েছে। আলু ব্যবসায়ীরা জমি থেকেই তাদের কাছ থেকে ১২-১৩ টাকা দরে প্রতিকেজি আলু কিনে নিচ্ছেন। গত মৌসুমে যা বিক্রি হয়েছিল ১০-১১ টাকায়। তারপরেও অনেক আলু অবিক্রিত ছিল। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন।
আলুচাষিদের ভাষ্য, গত মৌসুমে প্রতি বিঘা জমিতে আলু চাষে খরচ হয়েছিল ২৩-২৪ হাজার টাকা। এই মৌসুমে যা অন্তত ৩ হাজার টাকা বেড়েছে।
কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুসারে, দেশে প্রতিবছর ৬০-৭০ লাখ মেট্রিক টন আলুর চাহিদা আছে। চলতি বছর রংপুর অঞ্চলের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও রংপুরে ৯৮ হাজার ৪৫৮ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। এ বছর এই অঞ্চলে আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৩ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার চিনিপাড়া গ্রামের কৃষক রিয়াজুল ইসলাম (৬০) ডেইলি স্টারকে জানান, তিনি এ বছর ১১ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। তাতে প্রতি শতক জমি থেকে তিনি গড়ে ৯০ কেজি করে পেয়েছেন। এতে তার ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।
রিয়াজুল ইসলাম আরও জানান, উৎপাদিত আলুর মধ্যে ৩০ হাজার কেজি আলু তিনি ১৩ টাকা কেজি দরে জমি থেকেই বিক্রি করেছেন। পেয়েছেন ৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ২ হাজার কেজি আলু হিমাগারে রাখার পাশাপাশি ৬৭০ কেজি আলু রেখেছেন নিজেদের খাওয়ার জন্য।
রিয়াজুল বলেন, 'এ বছর আলুর যে দাম পেয়েছি, তাতে আমরা খুশি।'
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিমখাঁ গ্রামের আরেক আলুচাষী সুরেশ চন্দ্র বর্মণ (৬৭) জানান, এ বছর আলু চাষে তার বিঘাপ্রতি ২-৩ হাজার টাকা বেশি খরচ হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন ভালো হওয়ায় ও উৎপাদিত সব আলু বিক্রি হয়ে যাওয়ায় বাড়তি খরচ পুষিয়ে গেছে।
এই আলুচাষি বলেন, 'গত বছর আমার ৩ হাজার কেজি আলু অবিক্রিত ছিলো। পরে কম দামে বিক্রি করতে হয়েছিল।'
লালমনিরহাট সদর উপজেলার মন্ডলেরহাট গ্রামের কৃষক আনোয়ারুল ইসলামের (৫৫) ভাষ্য, এ বছর তিনি মোট ১০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। এরমধ্যে বৃষ্টির পানি জমে যাওয়ায় ৪ বিঘা জমিতে শতকপ্রতি ১০-১২ কেজি কম উৎপাদন এসেছে। বাকি জমি থেকে আশানুরূপ ফলন পেয়েছেন। এ বছর আলুর দাম নিয়েও সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে, কুড়িগ্রাম শহরের আলু ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন জানান, তিনি এ বছর ১ হাজার মেট্রিক টন আলু কেনার প্রস্তুতি নিয়েছেন। এরমধ্যে কেনা হয়েছে ৭০০ মেট্রিক টন। জমি থেকে আলু নিয়ে কোল্ড স্টোরেজে নিয়ে আসার পর্যন্ত তার প্রতি কেজিতে খরচ হচ্ছে ১৬ টাকা। তার ধারণা, 'এ বছর আলুর দাম বাড়তেই থাকবে। কমার সম্ভাবনা নেই।'
লালমনিরহাট সদর উপজেলার মন্ডলেরহাট কোল্ড স্টোরেজের মালিক আশিকুর রহমান সোহাগ জানান, অন্যদের কাছ থেকে সংগ্রহ করার পাশাপাশি তিনি নিজেও সংরক্ষণের জন্য কৃষকের কাছ থেকে আলু কিনছেন। তার স্টোরেজে প্রতি বস্তা (৬০) আলু রাখার জন্য ২৫০ টাকা খরচ করতে হয়।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামীম আশরাফ ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এ বছর অসময়ে বৃষ্টিপাত হওয়ায় আলুর ফলন নিয়ে কৃষকরা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। কিন্তু ফলনে কোন ঘাটতি আসেনি। কৃষকরা দ্রুত খেত থেকে পানি সেচে ফেলায় ক্ষতির মুখে পড়েননি। আর তারা দামও পাচ্ছেন ভালো।'