২০২১: আলোচিত রাজনীতি

মামুনুর রশীদ
মামুনুর রশীদ

বিদায় নিচ্ছে রাজনীতিতে অনেক ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী হয়ে থাকা ২০২১ সাল। বছরজুড়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঝড় তুলেছে বেফাঁস মন্তব্যের জেরে গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বরখাস্ত হওয়া ও তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের পদত্যাগের বিষয়টি।

আলোচনায় ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতা করে হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডব, দুর্গাপূজার সময় কুমিল্লা, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সাম্প্রদায়িক হামলা ও নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জার নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড। আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপকমিটির সাবেক সদস্য ও ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীরের গ্রেপ্তার এবং রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার মেয়র আব্বাস আলীর বরখাস্তের বিষয়টিও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে।

এ ছাড়া, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো নিয়ে বিএনপি-আওয়ামী লীগের পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ছাত্রলীগের ২ গ্রুপের সংঘর্ষে মাথায় মারাত্মক জখম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া তরুণ মাহাদি জে আকিবও ছিলেন আলোচনায়। আর বছর শেষের আলোচনার বিষয় এখন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপ এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও নৌকার ভরাডুবির মতো বিষয়গুলো।

hefazat.jpg
বায়তুল মোকাররমে হেফাজতের তাণ্ডব। ছবি: স্টার

হেফাজতের তাণ্ডবের পর বিজিবি মোতায়েন

২৬ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায় হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীরা।

এদিন দুপুরে জুমার নামাজের পর চট্টগ্রামের হাটহাজারিতে থানা ও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হেফাজত কর্মীদের হামলার পর সংঘর্ষে ৪ জন নিহত হন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাণ্ডব চালিয়ে রেলওয়ে স্টেশনে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা হয়। আর রাজধানীতে মোদিবিরোধীরা সংঘাতে জড়ায় পুলিশ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীদের সঙ্গে। তাতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের বেশ কয়েকজন কর্মীসহ অন্তত ৬০ জন আহত হন।

এরপর সন্ধ্যায় ঢাকার পল্টনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের অফিসে এক সংবাদ সম্মেলন থেকে পরদিন শনিবার সারাদেশে বিক্ষোভ এবং রোববার সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ঘোষণা দেওয়া হয় হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে।

এই পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়।

abdul-kader-mirza_collected_0_3.jpg
আবদুল কাদের মির্জা। ছবি: সংগৃহীত

বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড

গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পৌর নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণাকালে জাতীয় নির্বাচন, দলের জ্যেষ্ঠ নেতা, মন্ত্রী, সাংসদ ও বৃহত্তর নোয়াখালীর ২ সাংসদের অপরাজনীতির বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় আসেন আবদুল কাদের মির্জা। তিনি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই।

চলতি বছর কাদের মির্জার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলামসহ একাধিক ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে পৌরসভা কার্যালয়ে আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া যায়।

এ ছাড়া, কাদের মির্জা তার ভাবি ইশরাতুন্নেসা কাদেরের বিরুদ্ধে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগসহ বড় ভাই ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধেও নানা অপমানসূচক কথা বলেন ও বিষোদগার করেন। এতে দলের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়, যা পরবর্তী সময়ে সংঘাতে রূপ নেয়।

বছরভর ধারাবাহিকভাবে চলে আসা ওই সংঘাতে স্থানীয় এক সাংবাদিকসহ ২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হন অনেক নেতা-কর্মী।

helena-jahangir_0_1.jpg
হেলেনা জাহাঙ্গীর। ছবি: সংগৃহীত

আলোচনায় হেলেনা জাহাঙ্গীর

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই'র পরিচালক হেলেনা জাহাঙ্গীর আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপকমিটিতে সদস্য ছিলেন। কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগেরও উপদেষ্টা পরিষদেও ছিলেন তিনি।

জয়যাত্রা গ্রুপের কর্ণধার ও জয়যাত্রা টেলিভিশনের চেয়ারপারসন হেলেনা নিজেকে আইপিটিভি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি হিসেবেও পরিচয় দিতেন।

সম্প্রতি 'বাংলাদেশ আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ' নামের একটি ভুঁইফোঁড় সংগঠনে হেলেনা জাহাঙ্গীরের সভাপতি হওয়ার খবর চাউর হলে তাকে দুই কমিটি থেকেই বাদ দেয় আওয়ামী লীগ। যিনি এর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন।

জুলাইয়ের শেষ দিকে হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ডিজিটাল মাধ্যমে 'অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর' অভিযোগ আনে র‌্যাব।

৩০ জুলাই রাতে রাজধানীর গুলশানে হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে র‌্যাব। পরে মিরপুরে হেলেনার মালিকানাধীন জয়যাত্রা আইপিটিভির কার্যালয় ও জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন ভবনেও অভিযান চালানো হয়।

অভিযান শেষে হেলেনাকে আটকের কারণ জানতে চাইলে তার বাসায় 'মদ, হরিণের চামড়া, ক্যাসিনো বোর্ড, ওয়াকিটকিসহ বেশ কিছু অবৈধ সরঞ্জাম' পাওয়ার কথা জানায় র‌্যাব।

আর মিরপুরে জয়যাত্রা আইপিটিভি ও জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন ভবনে অভিযানের পর র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাদির শাহ জানান, জয়যাত্রা টিভির কোনো বৈধ কাগজপত্র ছিল না।

270248122_253498910218343_5194971725363715273_n.jpg
আগুনে জ্বলছে রংপুরের মাঝিপাড়া। ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লা, রংপুরে সাম্প্রদায়িক হামলা

দেশজুড়ে দুর্গাপূজা চলাকালে গত ১৩ অক্টোবর কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে কোরআন অবমাননার কথিত অভিযোগ তুলে মন্দিরে হামলা-ভাঙচুরের পর তা আরও কয়েকটি জেলায় ছড়ায় এবং এসব ঘটনায় অন্তত ৬ জন নিহত হন।

কুমিল্লার পর চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নোয়াখালী, ফেনীতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা আক্রান্ত হন।

সবশেষে ১৭ অক্টোবর রাতে রংপুরের পীরগঞ্জের মাঝিপাড়ায় হিন্দুদের বাড়িতে আগুন দেওয়া হয় ফেসবুকে এক তরুণের ধর্ম অবমাননার পোস্টকে কেন্দ্র করে। মাঝিপাড়া জেলেপল্লির ২৯টি বাড়ি ও গোয়াল ঘর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, ভাঙচুর করা হয় মন্দির।

পরে মাঝিপাড়ায় হিন্দু বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গ্রেপ্তার 'বহিষ্কৃত' ছাত্রলীগ নেতা সৈকত মণ্ডল ও সহযোগী রবিউল ইসলাম আদালতে স্বীকারোক্তি দেন।

এসব হামলা ও সহিংসতার মধ্যে ফেনী ও রংপুরের পুলিশ সুপার এবং চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপকমিশনারসহ এসপি মর্যাদার ৭ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়।

akib.jpg
মাহাদি জে আকিব। ছবি: সংগৃহীত

ছাত্রলীগের কোন্দলে আহত আকিবের ছবি ভাইরাল: 'হাড় নেই, চাপ দেবেন না'

চলতি বছরের অক্টোবরের শেষ দিকে ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি ছবিতে দেখা যায়, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) শোয়া এক তরুণের মাথা ব্যান্ডেজে মোড়ানো। সাদা ব্যান্ডেজের ওপর লেখা, 'হাড় নেই, চাপ দেবেন না'। এর নিচে একটা বিপজ্জনক চিহ্ন আঁকা। তরুণের দুই চোখ সাদা ব্যান্ডেজে ঢেকে দেওয়া।

আইসিইউতে সংজ্ঞাহীন ওই তরুণের নাম মাহাদি জে আকিব। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

২৯ অক্টোবর রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্রধান ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগের ২ পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। ওই ঘটনার জের ধরে পরদিন আকিবের ওপর হামলা হয়। এতে মাথায় মারাত্মক জখম নিয়ে তিনি ভর্তি হন চমেক হাসপাতালে।

অস্ত্রোপচারের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক জানান, আকিবের মস্তিষ্ক ও মাথার হাড়ে মারাত্মক আঘাত ছিল। অস্ত্রোপচারের পর তার মাথার হাড়ের একটা অংশ খুলে পেটের চামড়ার নিচে রাখা হয়েছিল। তাই মাথার ব্যান্ডেজ করা ফাঁকা অংশে সতর্কতামূলক বার্তা হিসেবে লেখা হয়েছিল 'হাড় নেই, চাপ দেবেন না'।

fakhrul_2.jpg
নয়াপল্টনে বিএনপির সমাবেশ। ছবি: স্টার

চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর দাবি

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় সাজা হলে কারাজীবন শুরু হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার। পরে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায়ও তার সাজার রায় হয়।

দেশে করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর পর খালেদা জিয়ার পরিবারের আবেদনে তাকে গত বছরের ২৫ মার্চ নির্বাহী আদেশে সাময়িক মুক্তি দেয় সরকার। তবে তাতে শর্ত ছিল, তাকে দেশেই থাকতে হবে।

কারাগার থেকে বেরিয়ে খালেদা জিয়া ওঠেন গুলশানের বাসা ফিরোজায়। এরপর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে এ বছরের মাঝামাঝি তিনি প্রায় ২ মাস হাসপাতালে থাকেন। এরপর আরও ২ দফা তাকে হাসপাতালে যেতে হয়।

৭৬ বছর বয়সী এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বহু বছর ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। সর্বশেষ গত ১৩ নভেম্বর ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তার 'পরিপাকতন্ত্রে' রক্তক্ষরণ এবং লিভার সিরোসিসের কথা জানান চিকিৎসকরা।

এর আগে, বাংলাদেশে খালেদা জিয়ার 'সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নেই' দাবি করে তাকে বিদেশে পাঠানোর জন্য কয়েক দফা আবেদন করেছিলেন তার ভাই। সাময়িক মুক্তির শর্তের বিষয়টি উল্লেখ করে প্রতিবারই তা নাকচ করা হয়।

এবার লিভার সিরোসিস ধরা পড়ায় খালেদাকে বিদেশে নেওয়ার অনুমতি চেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে আবারো সরকারের কাছে আবেদন করা হয়। আইন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মতামত দিয়ে ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। সেখানে আগের মতোই বলা হয়েছে, খালেদা জিয়াকে অনুমতি দেওয়ার 'আইনি সুযোগ নেই'।

বিষয়টি নিয়ে সর্বশেষ ২৯ ডিসেম্বর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, 'খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে হলে তাকে জেলে ফিরে নতুন করে আবেদন করতে হবে।'

তার আগে, গত ৮ ডিসেম্বর যুবলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার সুযোগ করে দেওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, 'আমরা যতটুকু দিয়েছি, তাকে যে বাসায় থাকতে দিয়েছি, তাকে যে ইচ্ছামতো হাসপাতালে নিচ্ছে, চিকিৎসা করছে, এটাই কি যথেষ্ট না?'

jahangir.jpg
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম। ছবি: সংগৃহীত

মেয়র জাহাঙ্গীরের পতন

গত সেপ্টেম্বরে গোপনে ধারণকৃত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জেলার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য করা হয়েছে বলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অভিযোগ তুলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ নভেম্বর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে জাহাঙ্গীর আলমকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

এর রেশ ধরে জাহাঙ্গীরের মেয়র পদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুঞ্জনের মধ্যেই ২৫ নভেম্বর সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তাকে বরখাস্তের কথা জানান স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। পরে স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি করপোরেশন-২ শাখা তাকে সাময়িক বরখাস্তের বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

বয়স চল্লিশের কোঠা পেরুনোর আগেই জাহাঙ্গীর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান, গাজীপুর নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশনের মেয়র বনে যান।

দলের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর অভিমত, ঘনিষ্ঠ সহচরদের পাশাপাশি প্রশ্নবিদ্ধ উৎস থেকে নগদ অর্থের যোগান ও ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদদের সঙ্গে যোগাযোগ জাহাঙ্গীর আলমকে খুব দ্রুত গাজীপুর আওয়ামী লীগের শীর্ষে পৌঁছে দেয়।

তবে তার পতন ঘটে আরও দ্রুততার সঙ্গে।

murad_hasan_1_1.jpg
সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান। স্টার ফাইল ছবি

প্রতিমন্ত্রী মুরাদের পদত্যাগ

গাজীপুর সিটি মেয়রের বরখাস্তের রেশ মিলিয়ে যেতে না যেতেই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নাতনিকে নিয়ে 'বর্ণ ও নারীবিদ্বেষী' বক্তব্যের পর অডিও কেলেঙ্কারির জের ধরে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের ঘটনাটি ছিল রাজনীতির অঙ্গনে বিদায়ী বছরের আরেকটি আলোচিত অধ্যায়।

মুরাদ প্রতিমন্ত্রীর শপথ নেন ২০১৯ সালে শেখ হাসিনার তৃতীয় মেয়াদের সরকারে। প্রথমে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। ৫ মাস পরে তাকে সরিয়ে নেওয়া হয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে।

তথ্য প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর বেশ কয়েকটি বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য সোশাল মিডিয়ায় আলোচনায় ছিলেন মুরাদ। তবে ডিসেম্বরের শুরুতে খালেদা জিয়ার নাতনি জাইমা রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে এক টকশোতে বর্ণ ও নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের জন্য কড়া সমালোচনায় পড়েন।

এরমধ্যেই মুরাদের ফোনালাপের একটি অডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যেখানে তাকে এক চিত্রনায়িকাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে ধর্ষণের হুমকি দিতে শোনা যায়।

এসব ঘটনার ভেতরেই আরেকটি পুরনো ভিডিও আসে ফেসবুকে। তাতে মুরাদকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেত্রীদের নিয়ে অশালীন কথা বলতে শোনা যায়। এ বিষয়টি নিয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুরাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়।

তুমুল সমালোচনার মধ্যে মুরাদকে পদত্যাগ করতে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্দেশ মেনে ৭ ডিসেম্বর প্রথমে ই-মেইলে নিজের দপ্তরে পদত্যাগপত্র পাঠান মুরাদ। পরে হার্ডকপিও পাঠান তিনি।

এর পরপরই প্রতিমন্ত্রীর পদ হারানো মুরাদ হাসান দেশ ছেড়ে কানাডায় পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেন। সেখানে ঢুকতে না পেরে দুবাইয়ে ঢোকার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। শেষে ১২ ডিসেম্বর আবার দেশে ফিরে আসেন তিনি।

abbas.jpg
কাটাখালী পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. আব্বাস আলী। ছবি: সংগৃহীত

কাটাখালীর মেয়র আব্বাস বরখাস্ত

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে 'কটূক্তি' ও দুর্নীতির অভিযোগে গত ১০ ডিসেম্বর রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার মেয়র মো. আব্বাস আলীকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

নৌকা প্রতীক নিয়ে টানা ২বার রাজশাহীর পবা উপজেলার কাটাখালী পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত আব্বাস আলী পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও টেপে তাকে বলতে শোনা যায়, রাজশাহী সিটি গেটে বঙ্গবন্ধুর যে ম্যুরাল করার নকশা দেওয়া হয়েছে, সেটা 'ইসলামি শরিয়ত মতে সঠিক নয়'। এটা করতে দিলে 'পাপ হবে'।

ওই অডিও টেপ ফাঁস হওয়ার পর তাকে পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক পদের পাশাপাশি রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়।

পরে ওই অডিও ভাইরাল হলে রাজশাহীতে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়। তার অপসারণের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ। রাজশাহীর নগরের রাজপাড়া, বোয়ালিয়া ও চন্দ্রিমা থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৩টি মামলা হয় আব্বাসের বিরুদ্ধে।

মেয়র আব্বাস প্রথমে দাবি করেছিলেন, ওই অডিও 'এডিট করা'। তবে পরে ফেসবুক লাইভে এসে তিনি স্বীকার করেন, ওই অডিও তিন-চার মাস আগের, ওই বক্তব্যও তার।

মেয়র সেখানে বলেন, স্থানীয় একটি মাদ্রাসার বড় হুজুরের কথায় প্রভাবিত হয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল না রাখার বিষয়টি বলেছিলেন 'কথাচ্ছলে'।

আব্বাস এখন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।

270191878_903553246966361_7720382441135138965_n.jpg
দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র শাহনেওয়াজ শাহানশাহ। ছবি: সংগৃহীত

দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার মেয়র শাহানশাহ গ্রেপ্তার

১৬ ডিসেম্বর দেওয়ানগঞ্জ সরকারি হাইস্কুল মাঠে বিজয় দিবসের পুষ্পস্তবক অর্পণের সিরিয়াল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার মেয়র শাহনেওয়াজ শাহানশাহ ওই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে গালিগালাজ করেন ও চড়-থাপ্পড় মারেন।

এ ঘটনার পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ জানান ওই শিক্ষা কর্মকর্তা। একইসঙ্গে তিনি থানায় একটি মামলা করেন।

১৯ ডিসেম্বর দুপুরে পৌর মেয়রের অপসারণ ও গ্রেপ্তারের দাবিতে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা মানববন্ধন করেন।

সমালোচনার মুখে ২০ ডিসেম্বর 'অসাংগঠনিক কার্যকলাপে লিপ্ত থাকায় এবং দলের শৃঙ্খলা ফেরাতে' শাহনেওয়াজ শাহানশাহকে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

এর ২ দিন পর ২৩ ডিসেম্বর শাহানশাহকে রাজধানীর উত্তরার একটি হোটেল থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

270302320_1313414165753328_3127294994388864634_n.jpg
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনায় জাপা প্রতিনিধিরা। ছবি: সংগৃহীত

নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সংলাপ

আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব দিতে সার্চ কমিটির মাধ্যমে নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের লক্ষ্যে ২০ ডিসেম্বর থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় শুরু করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। শুরুর দিনে বঙ্গভবনে সংসদের প্রধান বিরোধীদল জাতীয় পার্টির (জাপা) সঙ্গে প্রথম বৈঠক হয়।

তবে এই সংলাপকে 'অর্থহীন' আখ্যায়িত করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তাদের দলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি এই সংলাপে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নির্দলীয় সরকারের অধীনে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলেও দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। অংশ নিয়েছিল ইসি গঠনে রাষ্ট্রপতির সংলাপেও।

এবারের রাষ্ট্রপতির সংলাপে বিএনপির যোগ না দেওয়ার ঘোষণাকে গণতন্ত্রের জন্য 'খারাপ খবর' হিসেবে বর্ণনা করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

pabna-sirajganj_black_cloth_men_photo-3.jpg
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলায় মুখে কালো কাপড় বেঁধে কৈজুরি ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা। ছবি: সংগৃহীত

ইউপি নির্বাচনে বিনা ভোটে জয়ের রেকর্ড, সহিংসতা

চলমান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে এখন পর্যন্ত ৩৪৮ জন বিনা ভোটে চেয়ারম্যান হয়েছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় এসব ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে ভোটের দরকার হয়নি। এরমধ্যে বেশ কিছু ইউনিয়নে চেয়ারম্যানসহ কোনো পদেই ভোট নিতে হয়নি। সব মিলিয়ে এবার ইউপি নির্বাচনে বিনা ভোটে জনপ্রতিনিধি হওয়ার ক্ষেত্রে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

এর আগে, ২০১৬ সালে ইউপি নির্বাচনে বিনা ভোটে ২০৭ জন চেয়ারম্যান হন।

এবার ৬ ধাপে দেশে প্রায় ৪ হাজার ইউনিয়নে ভোট হচ্ছে। এরমধ্যে প্রথম ৫ ধাপে ৩ হাজার ৭৫৫টি ইউনিয়নের ৩৪৮টিতে চেয়ারম্যান পদে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি মানুষ। ষষ্ঠ ধাপে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় এখনো শেষ হয়নি। এই ধাপের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় শেষ হওয়ার পর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী চেয়ারম্যানের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

এদিকে, জুন থেকে শুরু হওয়া এই নির্বাচনের ৪ ধাপে এখন পর্যন্ত সারাদেশে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় অন্তত ৭০ জন নিহত হয়েছেন।

বেশিরভাগ সহিংসতার ঘটনায় আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর সমর্থক ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকরা সংঘর্ষে জড়িয়েছেন।

এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অধিকাংশ দল অংশ না নেওয়ায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে লড়াই চলছে স্বতন্ত্রদের, যাদের বেশিরভাগই আবার আওয়ামী লীগেরই নেতা।

সর্বশেষ গত ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত চতুর্থ ধাপের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ৩৯৬ প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জেতেন ৩৯০ জন।

প্রথম ৩ ধাপে ধারাবাহিকভাবে ভোটে জয়ী নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর ব্যবধান কমে আসছিল। এবার ব্যবধান আরও কমে ৬টিতে নেমে এসেছে।