সীমান্তে দুই পাড়ের বাসিন্দাদের সংঘর্ষ, হয়নি ঈদের নামাজ
এই প্রথম কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গমারী উপজেলার পাথরডুবি ইউনিয়নের বাঁশজানি সীমান্ত মসজিদে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হলো না। প্রত্যেক বছর এই মসজিদে ঈদের নামাজে বাংলাদেশ ও ভারতের মুসল্লিরা যৌথভাবে স্বতঃস্ফুর্তভাবে অংশ নিলেও এ বছর ঈদুল ফিতরের দিন মসজিদটি ছিল জনমানব শূন্য। মসজিদ প্রাঙ্গনে ছিল না কোনো কোলাহল। মসজিদ প্রাঙ্গণটি পরিস্কারও করা হয়নি।
বাঁশজানি সীমান্তে বসবাসকারীরা দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, ঈদের ৬ দিন আগে টাকা ধার করাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের নাগরিকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ভারতীয় লোকজনের আঘাতে আসাদুল ইসলাম নামে এক বাংলাদেশি আহত হন। তিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনার পর থেকে ভারতীয়রা আর বাংলাদেশে আসছেন না আর বাংলাদেশিরাও ভারতে যাচ্ছেন না। এছাড়া ওই সীমান্তে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলেও তারা জানান।
বাঁশজানি সীমান্তের নজর আলী (৮২) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বাঁশজানি- ঝাকুয়াটারী সীমান্তে কোনোদিনই সম্প্রীতির ঘাটতি হয় এমন ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু এবছর ঈদুল ফিতরের ৬দিন আগে সামান্য কিছু টাকা ধার দেওয়াকে কেন্দ্র করে তুমুল সংঘর্ষ বাঁধে বাংলাদেশি ও ভারতীয়দের মধ্যে। এ ঘটনার পর থেকে সীমান্তে বসবাসকারীরা আতঙ্কে আছেন। কবে এ সমস্যার সমাধান হবে তা কেউ জানেন না।'
'এবছর আমাদের সীমান্ত মসজিদে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হলো না। এতে আমরা ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। আমার জীবনে প্রথম এই ঘটনা ঘটলো। ভয় আর আতঙ্কের কারণে ভারতের লোকজন আমাদের বাড়িতে আসছেন না আর আমরাও যেতে পারছি না,' তিনি বলেন।
সীমান্ত মসজিদ কমিটির সদস্য আলম হোসেন (৫০) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'সীমান্তে বসবাসকারীদের মধ্যে নতুন করে যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সেজন্য সীমান্ত মসজিদে এবছর ঈদুল ফিতরের নামাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। আমরা স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে নামাজ পড়েছি আর ভারতীয়রা তাদের ঈদগাহ মাঠে নামাজ পড়েছেন।'
'গেল বছরগুলোতে বাঁশজানি-ঝাকুয়াটারী সীমান্ত ঈদের দিন মানুষের উপস্থিতিতে জাঁকজমক ছিলো। কিন্তু এবছর পুরো সীমান্ত জনমানব শূন্য হয়ে পড়েছে। আমরা নিজেদের মধ্যে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছি। যাতে পুর্বের ন্যায় সম্প্রীতি অটুট থাকে সেজন্য নিজেদের মধ্যে আলোচনাও হচ্ছে,' বলেন তিনি।
মসজিদের ঈমাম বাঁশজানি গ্রামের বাসিন্দা আবু বক্কর সিদ্দিক (৪৮) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'গেল বছরগুলোতে ভারত থেকে মাওলানা এসে ঈদের নামাজ পড়াতেন। এতে সীমান্তের লোকজন খুশি ছিলেন। সীমান্তে অপ্রীতিকর ঘটনার পর থেকে ভারতের লোকজন এই মসজিদে নামাজও পড়তে আসছেন না। ছোট একটি ঘটনা সীমান্তে আমাদের শত বর্ষের সম্প্রীতিকে নষ্ট করে দিয়েছে। আগামীতে ঈদের নামাজ আমরা সবাই একসঙ্গে পড়তে পারবো কিনা সেটা বলা যাচ্ছে না।'
সীমান্ত মসজিদটি ১৮০৮ সালে বাংলাদেশ- ভারত সীমান্তের ৯৭৮ নাম্বার মেইন পিলারের ৯ নাম্বার সাব পিলারের কাছে নির্মিত হয়। মসজিদটির উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ কোচবিহার জেলার সাহেবগঞ্জ থানার ঝাকুয়াটারী গ্রাম। দক্ষিণে বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলার বাঁশজানি গ্রাম। সীমান্ত মসজিদটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩০-ফিট আর প্রস্থে ২০-ফিট। আধা পাকার এই মসজিদটির রয়েছে ১৫ শতাংশ জমি। মসজিদটি জিরো লাইনে রয়েছে। মসজিদটির পুনঃনির্মান কাজ শুরু হলেও তা বন্ধ রয়েছে।
এই সীমান্তে বাংলাদেশ ও ভারতের গ্রামে বসবাসকারীরা একে অপরের আত্মীয়। দেশ বিভাগের সময় তারা হয়ে যান বিভক্ত কিন্তু আত্মীয়তার বন্ধন বিভক্ত হয়নি। শুধু মসজিদে একসঙ্গে নামাজ পড়া নয়, উভয় বাংলার পারিবারিক অনুষ্ঠানেও তারা একে অপরকে দাওয়াত করে থাকেন। কেউ মারা গেলে সবাই জানাজায় অংশ নেন, তাদের সমাজও একটি।