আঙ্গুল তিনটা রাইখেন স্যার, দেশ স্বাধীন হইলে ন্যাশনাল টিমের হইয়া ওপেনিংয়ে নামমু
তিনি ছিলেন অদ্ভুত ধরনের। অন্য সবার চেয়ে আলাদা এবং প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। যার রক্তে ছিল ক্রিকেট। ছিলেন ভীষণ একরোখাও। যে কথা একবার বলেছেন হাজার অনুরোধেও তা থেকে সরেননি।
যে কাজ সবাই শুরুর আগে দশ বার ভাবতো। সে কাজ করেই ছাড়তেন আবদুল হালিম জুয়েল। ক্রিকেট ছিল তার ধ্যান জ্ঞান। তবে পাগলামিটা শুধু কল্পনাতে ছিল না। উদ্বোধনী জুটি তার জন্য বরাদ্দ থাকতো সবসময়। ব্যাটিংয়ে যখন নামতেন বিপক্ষ দলের হাঁটু কাঁপতো। চোখ ধাঁধানো খেলায় মানুষ ইনিংসের শেষ নাগাদ জায়গা থেকে নড়ার মতো অবস্থা থাকতো না। বিশেষ করে তার স্লগ সুইপের সৌন্দর্য ছিল দেখার মতো।
ছোটবেলাতেই তার উপর চোখ পড়েছিল আজাদ বয়েজের সংগঠক আরেক কিংবদন্তি মুশতাকের। বাঙালিদের তখন পাকিস্তান জাতীয় দলে ঢোকা ছিল অসম্ভবের মতো।
স্বাধীন বাংলাদেশের ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলার সুপ্ত আশা লালন করতেন তিনি। যেদিন আর থাকবে না হানাদারদের আভিজাত্য। যেদিন হবে না কেউ শোষন আর বঞ্চনার শিকার। তিনি স্বাধীন পতাকা মাথায় নিয়ে নামবেন সবুজ মাঠে। কাঁপিয়ে বেড়াবেন মাঠ, মাথায় থাকবে স্বাধীন দেশের পতাকা। হাওয়ায় ভেসে বেড়াবে জয় বাংলার হর্ষধ্বনি।
১৯৬৬ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় জুয়েলের। বয়স তখন তার মাত্র ১৬। সে বয়সেই ঢাকার ক্রিকেটে মারকুটে এক ব্যাটসম্যান হিসেবে পরিচিত। অভিষেক ম্যাচেই আইয়ূব ট্রফিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে পিডব্লিউডির (গণপূর্ত বিভাগ) বিপক্ষে ৩৮ রান করেছিলেন।
১৯৭০-৭১ মৌসুমে ক্রিকেট লিগে দুর্দান্ত খেলেছিলেন। প্রায় প্রতি ম্যাচেই বড় স্কোর ছিল তার। কারদার সামার ক্রিকেটে করেছিলেন সেঞ্চুরিও। কিন্তু তারপরও তার মূল্যায়ন যথাযথভাবে করা হয়নি। তবে পূর্ব পাকিস্তান ক্রিকেট দলের অপরিহার্য সদস্য হয়ে ওঠেন তিনি। সে সময় পূর্ব পাকিস্তান দলেও ছিল অবাঙালিদের প্রাধান্য। তাদের মধ্যে যে কজন বাঙালি পূর্ব পাকিস্তান দলে স্থান করে নেন, তিনি তাদের মধ্যে ছিলেন অন্যতম। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সফরে আসে নিউজিল্যান্ড জাতীয় ক্রিকেট দল। এ সফরে কিউইরা তিনটি টেস্ট খেলে। এ সিরিজে খেলার জন্য জুয়েল পাকিস্তান ক্যাম্পে ডাক পেয়েছিলেন। তখন দেশে চলছে গনঅভ্যুত্থানের হাওয়া। কিন্তু তখন মানুষ রাস্তায় সংগ্রাম করছে, অথচ তিনি কিনা থাকবেন খেলার মাঠে! ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করলেন সেই প্রস্তাব। সফল হয় অভ্যুত্থান। জুয়েলের জেদ আর দৃঢ় প্রত্যয়ের জয় হয়।
২৫ মার্চ কালরাত্রির পর জুয়েল দেখলেন পৈশাচিক গণহত্যা আর নিপীড়নের চিত্র। সেই চিত্র রীতিমতো মাথায় আগুন ধরিয়ে দিলো জুয়েলের। বিশেষ করে আজাদ বয়েজের সংগঠক মুশতাক থাকতেন একাই, তাও আবার আজাদ বয়েজ ক্লাবেই। ২৬ মার্চে তার খোঁজ না পাওয়ায় সবাই যখন তন্নতন্ন করে খোঁজা শুরু করলো, মুশতাকের লাশ পাওয়া গেল ঢাকা জেলা ক্রীড়া পরিষদের মিলনায়তনের সামনে। তার হাত ধরেই তো যাত্রা শুরু হয়েছিল জুয়েলের। তার মৃতদেহ এভাবে পড়ে থাকতে দেখে আর আবেগ সামলাতে পারেননি জুয়েল। কারণ এই আজাদই সবার জানাজায় সবার আগে যেতেন, যে কোনো বিপদ আপদে সবার আগে ছুটে আসতেন। অথচ তারই কিনা জানাজা হলো না! জুয়েল দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছিলেন এর প্রতিশোধ হবে স্বাধীনতা। স্বাধীন দেশে বিপক্ষ দলের ত্রাস হয়ে আবির্ভূত হওয়া। জুয়েল ঠিক করলেন তিনি যুদ্ধে যাবেন।
তার ভাবনায় তখন কেবল, এখনই সময় দেশকে কিছু দেয়ার। ৩১ মে বাড়ির কাউকে কিছু না বলে তিনি সীমান্ত পার হয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মেলাঘয়ে চলে যান। কারণ একে তো তিনি আগেই বাবা হারিয়েছিলেন সুতরাং তার মা তাকে কখনোই ছাড়তে চাইবে না। এজন্যই একা যাত্রা করেছিলেন তিনি। এর কয়েকদিন আগে মাকে একটি বাঁধাই করা ছবি দিয়ে তিনি বলেছিলেন, 'আমি যখন থাকবো না, এই ছবিটাতে তুমি আমাকে দেখতে পাবে।'
কর্নেল খালেদ মোশাররফের নির্দেশে ১৭ জন তরুণের একটি দলকে মেলাঘরে গেরিলা ট্রেনিং দিয়ে মেজর এটিএম হায়দার ঢাকায় পাঠান। পরবর্তীতে যা জন্ম নেয় ক্র্যাক প্লাটুন নামে একদল কিংবদন্তীর গেরিলা দলে। এই দলের বহু অপারেশনে অংশ নিয়েছিলেন জুয়েল। নিয়েছিলেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে অপারেশন ফার্মগেট, যাত্রাবাড়ী পাওয়ার স্টেশনসহ নানা দুর্ধর্ষ অপারেশনে।
ক্র্যাক প্লাটুনের উপর দায়িত্ব পড়েছিল সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন উড়িয়ে দেয়ার। রামপুরা বিলে তারা রেকি করতে গেলেন। পুরো নৌকায় ৯ জন গেরিলার অস্ত্র ছিল নৌকার পাটাতনের নিচে, কেবল বদির হাতেই স্টেনগান। তারা দেখলেন দূর থেকে একটা নৌকা আসছে। ওই নৌকা যে হানাদারদের নৌকা এটা বুঝতে পেরেই ব্রাশফায়ার শুরু করলেন বদি। বদির হাত ছিল নিখুঁত। যার ফলে নৌকায় আঘাত করতেই হানাদার সৈন্যরাও ব্রাশফায়ার শুরু করলো। বেশিরভাগই ডুবে গেল হানাদার সৈন্যরা। যারা সাঁতার জানতো তারা সাঁতরে পাড়ে উঠলো। নৌকা একপাশের পাড়ে ভিড়তেই হঠাৎ জুয়েল বলে উঠলেন। 'এই বদি আমার হাতে জানি কি হইছে, দেখ তো।' বদি টর্চের আলো ফেলতেই দেখলেন একটি গুলি জুয়েলের আঙ্গুলের মাঝ বরাবর সোজা ভেদ করে চলে গেছে। এরপর ফেরার পথে বদি জুয়েলের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তোর কি খুব কষ্ট হচ্ছে?'
শুনেই প্রকাণ্ড হাসিতে জুয়েল বললো, 'নারে হেভি আরাম লাগতাছে। দেশের লাইগা রক্ত দিলাম, আবার জানটাও বাঁচলো।'
মগবাজারে ফিরতেই আজাদ তাকে নিয়ে গেলেন চিকিৎসক আজিজুর রহমানের কাছে। সেখানে ডাক্তার আজিজুর রহমান তাকে দেখেই বললেন, 'এ তো সিরিয়াস।' পচনের হাত থেকে হাত বাঁচাতে ডাক্তার বললেন তিনটি আঙ্গুল কেটে ফেলতে হবে। হঠাৎ ডাক্তারের মুখের দিকে তাকিয়ে ভেজা গলায় বললেন, 'আঙ্গুল তিনটা রাইখেন স্যার, দেশ স্বাধীন হইলে ন্যাশনাল টিমের হইয়া ওপেনিংয়ে নামুম।'
এরপর আজাদদের বাসায় বিশ্রামে ছিলেন জুয়েল। আহত হওয়ায় ক্র্যাক প্লাটুনের দুর্ধর্ষ ধানমণ্ডি অপারেশন করতে পারেননি জুয়েল।
৩০ আগস্ট দিবাগত রাত দুইটার দিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আজাদদের মগবাজারের বাড়িতে হানা দেয়। সেখান থেকে আজাদ, জুয়েল, আবুল বাশার, সেকান্দার হায়াত খান ও মনোয়ারকে তুলে নিয়ে যায় হানাদাররা। কেবল সেখান থেকে ব্রাশফায়ার করে পালিয়ে গিয়েছিলেন কাজী কামাল।
তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়া ড্রাম ফ্যাক্টরি সংলগ্ন এমপি হোস্টেলের মিলিটারি টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের।
চালানো হয় পৈশাচিক নির্যাতন। জুয়েলের ভাঙা তিনটি আঙ্গুলে প্লাস দিয়ে নখ টেনে তুলে সুই ঢোকানো হয়।
প্রচণ্ড যন্ত্রণায় বারবারে চিৎকার করে উঠেছেন জুয়েল, জ্ঞান হারিয়েছেন হানাদারদের চরম পৈশাচিক নির্যাতনে।
পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের বারবার একই প্রশ্ন 'কাহা সে ট্রেনিং লেকে আতা তুম লোগনে, কিধার সে আর্মস আতা'
কিন্তু জুয়েল যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি কিছুতেই মুখ ফুটে বলবেন না। তার চোয়াল ফেটে রক্ত ঝরেছে, ভীষণ অত্যাচারে দাঁত ভেঙে গেছে নাকের চামড়া ফেটে গেছে। ব্যাথানাশক ওষুধ ছিল টর্চার সেলে। এই ব্যাথানাশক ওষুধ খাওয়ানোর কারণ যেন শত নির্যাতনেও মারা না যায় গেরিলারা। এতো নিষ্ঠুর পাশবিক ও ভয়াবহ নির্যাতনের পরও একবারের জন্যও তারা বলেননি সহযোদ্ধাদের নাম।
হাজারো অত্যাচার টলাতে পারেনি আবদুল হালিম জুয়েলকে। আসলে হেরে যাওয়াটা তো তার রক্তে ছিল না। লড়াই করে বুক চিতিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন মাতৃভূমির প্রতি অসীম ভালোবাসায়। স্বাধীন দেশে ওপেনার হয়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন, স্বাধীন মাতৃভূমিতে শ্বাস নেয়ার স্বপ্নের মাঝে কী অদ্ভুত ব্যবধান। দেশটাকে কতোটুকু ভালোবাসা যায় শিখিয়েছিলেন জুয়েল।
আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল আর ফিরে আসেননি। ফিরে আসেননি দেশের ওপেনিং জুটির বিপক্ষ দলের ত্রাস হয়ে। দেশকে ভালোবেসে, দেশের স্বাধীনতায় যিনি তার সবটুকু দিয়ে গেছেন।
আহমাদ ইশতিয়াক ahmadistiak1952@gmail.com