১০ আগস্ট ১৯৭১: দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধী-আঁদ্রে গ্রোমিকো বৈঠক
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১০ আগস্ট গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল একটি দিন। এদিন দিল্লিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আঁদ্রে গ্রোমিকোর সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এই বৈঠকে শরণার্থী সংকট, আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের উপর চাপ বৃদ্ধি, শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার নিয়ে পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ের উত্তেজনা নিরসনসহ বিভিন্ন বিষয় ঠাঁই পায়।
বৈঠকে সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আঁদ্রে গ্রোমিকো ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে বলেন, 'সোভিয়েত ইউনিয়ন শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারের বিরুদ্ধে। কারণ এই বিচারের সিদ্ধান্ত থেকে পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসন যদি সরে না আসে তবে পূর্ব পাকিস্তানে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। অন্যদিকে শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের ভোটে নির্বাচিত। সুতরাং তাকে নিয়েই আলোচনা হতে পারে। শরণার্থী সমস্যা আসলেই জটিল। এক্ষেত্রে সোভিয়েত সরকার ভারতকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ উভয়ভাবেই সহায়তা ও সহযোগিতা দেবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন সবসময়ই ভারতের পাশে ছিল এবং থাকবে।'
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বৈঠকে আঁদ্রে গ্রোমিকোকে বলেন, 'শেখ মুজিবুর রহমানকে বিচারের মুখোমুখি করা মানে নির্বাচিত গনপ্রতিনিধিকে প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে আক্রমণ করা। যেখানে তিনিই জনগণের দ্বারা নির্বাচিত এখন তাকেই উৎখাত করে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে। পাকিস্তান সরকার শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো নাটক সাজিয়েছে। যেখানে শরণার্থীদের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলা হচ্ছে। অথচ পূর্ব বাংলা নিরাপদ নয়। মানুষ গণহত্যা ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে প্রাণ বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে অথচ পাকিস্তান সরকার নিজেরাই তাদের তাড়িয়ে এখন ভারতকে দোষারোপ করছে, বৈশ্বিক মহলে ভারতের নামে মিথ্যাচার করছে।'
১০ আগস্ট বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম মুজিবনগর থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেন, 'বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কোনো চেষ্টা করা হলে বিশ্বের এই অঞ্চল অগ্ন্যুৎপাতের মুখোমুখি হবে।' এসময় তিনি সভ্যতা, গণতন্ত্র, মানবতা ও ন্যায়বিচারের নামে বিশ্বের সব রাষ্ট্রপ্রধান এবং জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের নিঃশর্ত মুক্তির জন্য হস্তক্ষেপ করার আবেদন জানান।
ভারতে এদিন
১০ আগস্ট রাজ্যসভায় অনুষ্ঠিত প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংসদীয় কমিটিকে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম বলেন, 'দেশের নিরাপত্তায় সর্বদা সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত আছে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী থেকেও তারা বেশি প্রশিক্ষিত। আমাদের নৌ বাহিনীকেও আমরা ঢেলে সাজিয়েছি। পাকিস্তান যদি আমাদের উপর হামলা চালানোর চেষ্টা চালায় তবে এর দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়া হবে।'
১০ আগস্ট দিল্লিতে পাকিস্তান দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন ২০টি উর্দু পত্রিকার সম্পাদকেরা। এই বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের নেতৃত্ব দেন প্রখ্যাত সম্পাদক আলী সিদ্দিকী। এসসময় তারা পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের একটি কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। সমাবেশ শেষে আলী সিদ্দিকীর নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন উর্দু পত্রিকার সম্পাদক পাকিস্তান দূতাবাসে প্রতিবাদ স্মারকলিপি দিতে গেলে দূতাবাসের কেউ সেই স্মারকলিপি গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। এই অবস্থায় তারা এই প্রতিবাদ স্মারকলিপিটি পাকিস্তান দূতাবাসে ছুঁড়ে দিয়ে, দিল্লির মার্কিন দূতাবাসে যান। সেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পাকিস্তানকে অস্ত্র সহায়তা ও বিক্রির প্রতিবাদে একটি প্রতিবাদ লিপি মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছে হস্তান্তর করেন।
পাকিস্তানে এদিন
১০ আগস্ট মার্কিন সিনেটের শরণার্থী বিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান এডওয়ার্ড কেনেডির ১২ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া পূর্ব পাকিস্তান সফর বাতিল করে পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসন। একই সঙ্গে এদিন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে তার নির্ধারিত বৈঠকও বাতিল করা হয়।
আন্তর্জাতিক মহলে এদিন
১০ আগস্ট মার্কিন সিনেটের শরণার্থী বিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান এডওয়ার্ড কেনেডি শরণার্থীদের অবস্থা পরিদর্শন ও সাম্প্রতিক সময়ের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য কলকাতায় আসেন। এদিন তিনি কলকাতায় এসেই সরাসরি বয়রা সীমান্তে চলে যান। সেখানে তিনি দুটো শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন। শরণার্থী শিবির পরিদর্শন শেষে তিনি কলকাতা বিমানবন্দরে ফিরে যান। এসময় তিনি কলকাতা বিমানবন্দরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, 'দেশে ফিরে শরণার্থীদের সুরক্ষার জন্য এবং শরণার্থীরা যেন দ্রুততম সময়ে স্বদেশে ফিরে যেতে পারে সে ব্যাপারে আমরা পদক্ষেপ নেবো।'
১০ আগস্ট নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম রজার্স পূর্ব বাংলার বিষয়ে ও শরণার্থী পরিস্থিতি, ভারত পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সময়ের অবস্থা সম্পর্কে জাতিসংঘ মহাসচিব উ'থান্টের সঙ্গে আলোচনা করেন। চার ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকে জাতিসংঘে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি জর্জ ডব্লিউ বুশও উপস্থিত ছিলেন।
দেশব্যাপী এদিন
১০ আগস্ট মুন্সিগঞ্জের মীরকাদিমের আবদুল্লাহপুরে শান্তিকমিটির সমাবেশে স্থানীয় রাজাকার ও শান্তিকমিটির সদস্যদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সময় মুক্তিবাহিনীর গেরিলাদের গুলিতে নিহত হয় পূর্ব পাকিস্তান নেজামে ইসলাম পার্টির নেতা, রাজাকার ও শান্তিকমিটির নেতা মাওলানা মাহমুদ মোস্তফা আল মাদানী।
দেশব্যাপী প্রতিরোধ যুদ্ধ
১০ আগস্ট সিলেটে ক্যাপ্টেন রবের নেতৃত্বে পাঁচ কোম্পানি যোদ্ধা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর শাহবাজপুর রেলওয়ে স্টেশন অবস্থানের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এসময় হানাদার বাহিনীও পাল্টা আক্রমণ চালায়। প্রায় দুই ঘন্টা যুদ্ধ শেষে মুক্তিবাহিনী শাহবাজপুর রেলওয়ে স্টেশনের একটি বড় অংশ নিজেদের দখলে নেয়। এসময় মুক্তিযোদ্ধারা দখলকৃত এলাকায় পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। এক পর্যায়ে হানাদার সেনারা পিছু হটে ক্যাম্পে ফিরে আর্টিলারি আক্রমণ শুরু করে। হানাদার বাহিনীর এ পাল্টা আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে পিছু হটে। এই যুদ্ধে ইপিআরের হাবিলদার কুতুব, নায়েক মান্নান ও মুজাহিদ হাবিলদার মোহাম্মদ ফয়েজসহ মোট ৬ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং পাঁচ জন আহত হন। মুক্তিবাহিনী শাহবাজপুর রেলওয়ে স্টেশনে এসময় প্রচুর গোলাবারুদ উদ্ধার করে।
১০ আগস্ট সিলেটের কানাইঘাটের ৪ নম্বর সেক্টরের ডাউকি সাব-সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর একটি দল রাজাকারদের চতুলবাজার ঘাঁটি আক্রমণ করে। এসময় তিন রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়ে এবং দুই রাজাকার নিহত হয়। আক্রমণ শেষে মুক্তিবাহিনীর দলটি কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই নিজেদের ঘাঁটিতে ফিরে যায়।
১০ আগস্ট শালদা নদীর পশ্চিমে মুক্তিবাহিনীর ক্যাপ্টেন সালেকের নেতৃত্বে এক প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধা কুমিল্লা সিএন্ডবি সড়কের কাছে শিদলাই গ্রামে মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি স্থাপন করে।
এদিন দিরাইয়ে এক রাজাকারের বাড়িতে হামলা চালায় মুক্তিযোদ্ধারা।
সূত্র:
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র: পঞ্চম, ষষ্ঠ, অষ্টম, দশম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড।
দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা, ১১ আগস্ট ১৯৭১
দৈনিক পাকিস্তান, ১১ আগস্ট ১৯৭১
আহমাদ ইশতিয়াক ahmadistiak1952@gmail.com