মুক্তিযুদ্ধ

২৪ আগস্ট ১৯৭১: জেনেভায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতদের সম্মেলন

আহমাদ ইশতিয়াক

১৯৭১ সালের ২৪ আগস্ট সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতদের দুই দিনব্যাপী সম্মেলন শুরু হয়। এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুলতান মোহাম্মদ খান। এই সম্মেলনে বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতেরা দায়িত্বপ্রাপ্ত দেশের পূর্ব পাকিস্তান বিষয়ক অবস্থান নিয়ে আলোচনা করেন। একই সঙ্গে এই সম্মেলনে নানা কার্যকর পন্থা নিয়ে আলোচনা হয়।

এদিন ইত্তেফাক পত্রিকায় 'জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের বহাল সদস্যদের পূর্ণ নিরাপত্তার আশ্বাস শিরোনামে' একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটিতে, 'ঢাকায় এপিপি পরিবেশিত এক খবরে বলা হয়: বেআইনি ঘোষিত আওয়ামী লীগের যে সকল জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যের সদস্যপদ বহাল রাখা হইয়াছে, পূর্ব পাকিস্তান সরকার তাহাদের পূর্ণ নিরাপত্তা বিধানের আশ্বাস প্রদান করিয়াছেন। প্রাদেশিক সরকারের জনৈক মুখপাত্র গতকাল এখানে বলেন যে, এই সকল জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যের বর্তমান জাতীয় সংকটের দিনে স্ব স্ব এলাকায় নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচকদের প্রতি দায়িত্ব পালনের জন্য আগাইয়া আসিতে দ্বিধাবোধ করা উচিত নহে। মুখপাত্র আরও বলেন যে, বেআইনি ঘোষিত আওয়ামী লীগের টিকেটে যে সকল জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হইয়াছিলেন, তাহাদের সকলের ব্যাপারই আদ্যোপান্ত পরীক্ষা করিয়া দেখা হইয়াছে এবং ৮৮ জন জাতীয় পরিষদ সদস্য এবং ৪ জন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যের বিরুদ্ধে কিছুই পাওয়া যায়নি। কাজেই তাদের ভয়ের কিছুই নাই।'

ঢাকায় এদিন

২৪ আগস্ট পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসন এক বিবৃতিতে জানায়, 'ভারতীয় অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পঁচাগড়া, সাতক্ষীরা, ঝিকরগাছা, ঠাকুরগাঁও, সিলেট ও কুমিল্লা দিয়ে ৫০০ অমুসলিমসহ ৫৪০০ শরণার্থী দেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন।

২৪ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তান নেজামে ইসলাম দলের জেনারেল সেক্রেটারি মওলানা আশরাফ আলী এক বিবৃতিতে বলেন, 'সীমান্ত এলাকায় নিরীহ জনগণের ওপর ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীরা অত্যাচার করছে। তাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে।

২৪ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তান কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি ও শান্তি কমিটির আহ্বায়ক খাজা খয়েরউদ্দিন প্রাদেশিক সহসভাপতি এ কিউ এম শফিকুল ইসলামসহ এদিন এক সফরে লাহোরের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। লাহোর ও রাওালপিণ্ডিতে তাদের দলের সমাবেশ ও সভায় বক্তব্য রাখার কথা। মূলত বিভক্ত তিন মুসলিম লীগকে একত্রিত করতেই তাদের এই সফর।

ভারতে এদিন

২৪ আগস্ট যুগান্তর পত্রিকায় 'শরণার্থী সাহায্যে মেয়ররা টাকা দিলেন' শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদনে বলা হয় সর্ব ভারতীয় মেয়রস কাউন্সিল বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য ৫০ হাজার টাকা দান করেছে। বোম্বের মেয়র এ কথা জানিয়ে কলকাতার মেয়রকে চিঠি দিয়েছেন। কলকাতার মেয়র শ্যামসুন্দর গুপ্ত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের জন্য সর্ব ভারতীয় মেয়র সম্মেলন ডাকতে অনুরোধ জানান। প্রস্তাবটি রাজনৈতিক প্রস্তাব বলে বোম্বের মেয়র ওই কার্যসূচি দিয়ে সভা ডাকতে রাজি হননি।

২৪ আগস্ট কলকাতায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী কমিটির চেয়ারম্যান ডি পি ধর প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে গোপন একটি বৈঠক করেন।

বৈঠকে মুক্তিবাহিনীর নানা কার্যক্রম, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থা, পাকিস্তানি বাহিনীর বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গিসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়।

২৪ আগস্ট যুগান্তর পত্রিকায় 'জঙ্গীশাহীর ত্রাহি ত্রাহি রব- এখন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে কাতর আবেদন' শিরোনামে আরো একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, 'পূর্ববঙ্গের সামরিক প্রশাসন জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ আইন সভার সমস্ত সদস্যদের (কর্তৃপক্ষ যাদের অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছেন) প্রতি আজ এক আবেদন জানিয়ে বলেছেন যে, তারা জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্ব পালনে দ্রুত এগিয়ে আসেন।

পাকিস্তানে এদিন

২৪ আগস্ট করাচি বিমান বন্দরে পূর্ব পাকিস্তান কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি ও শান্তি কমিটির আহ্বায়ক খয়েরউদ্দিন বলেন, 'সবার উচিত দলীয় রাজনীতির উর্ধ্বে থেকে পাকিস্তানের আদর্শে বিশ্বাসী একমনা ব্যক্তিদের সাথে হাত মিলানো। সবার উচিত মুসলিম লীগে যোগদান করা কারণ এই দলই পাকিস্তান এনেছে। আমরা পাকিস্তানের শক্তি অটুট রাখবো।'

২৪ আগস্ট লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর মহাসচিব চৌধুরী রহমত বলেন, 'দেশ থেকে শাসন তুলে কোনো বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার সময় এখনো আসেনি। এখন সামরিক প্রশাসনের হাতেই দেশ নিরাপদ। পরবর্তীতে উপযুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি হলে তবেই নির্বাচনের প্রসঙ্গ আসবে।

আন্তর্জাতিক মহলে এদিন

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতদের দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের প্রথম দিনে জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আগা শাহী বলেন, 'জাতিসংঘের আসন্ন সাধারণ অধিবেশনে ভারত কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর জোরালো সমর্থন পাবে। এজন্য ভারত বিশ্বব্যাপী তাদের দূতদের প্রেরণ করে আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের সমর্থন আদায় করে নিচ্ছে। এটি এড়াতে হলে আমাদের অবশ্যই পাকিস্তানে বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা, অন্তত চার ভাগের একভাগ শরণার্থী ফিরিয়ে নেয়া, খাদ্য সমস্যার সমাধান এবং শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার আপাতত স্থগিত রাখতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব দেখালেও যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ গণমাধ্যম পাকিস্তানের ঘোর বিরোধী।

সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত জেড এম ফারুকি বলেন, 'চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে সহায়তার জন্য প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও সাধারণ মানুষ বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিশীল। তবে আওয়ামী লীগ ও শরণার্থীদের প্রতি সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির সমর্থনের কারণে পাকিস্তানের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। আমার মতে পূর্ব পাকিস্তানে বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারকাজ চালানো সহজ হবে।'

ব্রিটেনে নিযুক্ত পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত সালমান আলী বলেন, 'ব্রিটিশ সরকার এখন আর পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত নয়। বিভিন্ন বাঙালি প্রতিষ্ঠানের কার্যকলাপের বিরোধিতা করার জন্য আমরা যদিও পাকিস্তান সলিডারিটি প্রতিষ্ঠান গঠনে সহায়তা করছি। অন্যদিকে ব্রিটেনের সংবাদপত্রগুলো ইহুদিদের করায়ত্ত বলেই বরাবরই পাকিস্তানবিরোধী। লেবার পার্টিও ১৯৪৭ সালের দেশভাগ বানচাল করার জন্য বদ্ধপরিকর।

সম্মেলনে সোভিয়েত ইউনিয়নে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত জামসেদ মার্কার তার বক্তব্যে বলেন, 'আমরা ধারণা করছি সোভিয়েত ইউনিয়ন এতো দ্রুত পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে না। তবে ভারতের সঙ্গে এই মাসের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন যে চুক্তি করেছে তা এই অঞ্চলে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বৃদ্ধি করবে। তবে এই চুক্তি মূলত চীনকে আটকানোর জন্য এবং চীনের প্রভাব কমানোর হন্য। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নয় বলে আমার ধারণা।'

সম্মেলনে চীনে নিযুক্ত পাকিস্তানের বাঙালি রাষ্ট্রদূত কে এম কায়সার বলেন, 'চীন পূর্ব পাকিস্তানের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে রাজি নয়। তবে চীন বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সমর্থন সন্তোষজনক মনে করে। ভারত-সোভিয়েত চুক্তির খবরও চীনের কোনো সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি। কারণ চীনারা মনে করে, এ চুক্তি তাদের স্বার্থবিরোধী।

সম্মেলনের প্রথম দিনে যুগোস্লাভিয়া, পশ্চিম জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, সুইজারল্যান্ডে, বেলজিয়াম, যুগোস্লাভিয়া ও চেক স্লোভাকিয়ায় নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতেরা বক্তব্য রাখেন।

দেশজুড়ে প্রতিরোধ যুদ্ধ

২৪ আগস্ট কুমিল্লার সি এন্ড বি রোডের কালামুড়ায় মুক্তিবাহিনীর একটি দল কালামুড়া ব্রিজে অবস্থানরত রাজাকারদের উপর হামলা চালায়। এ সময় ৭ জন রাজাকারের সবাই আত্মসমর্পন করে এবং মুক্তিযোদ্ধারা প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র দখল করে। পরে মুক্তিযোদ্ধারা কালামুড়া ব্রিজটি উড়িয়ে দেয়।

২৪ আগস্ট সুবেদার আবদুল ওয়াহাবের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা দল কালামুড়া ব্রিজের ২ মাইল দক্ষিণে মাধবপুর ও মীরপুরের মাঝখানে হানাদার সৈন্য ভর্তি ২টি বাস, ৩টি জিপ ও ২টি গাড়ির উপর অ্যামবুশ করে। এসময় মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণে হানাদার বাহিনীর সবগুলো গাড়ি ধ্বংস হয় এবং বহু হানাদার সৈন্য নিহত হয়। মুক্তিবাহিনী এসময় একজন রাজাকার ও তিন জন হানাদার সৈন্যকে অস্ত্রশস্ত্রসহ আটক করে।

২৪ আগস্ট ৮ নম্বর সেক্টর নাটোদা থেকে মুজিবনগরের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি কোম্পানির উপর নায়েব সুবেদার আবদুল মতিন পাটোয়ারীর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর একটি দল বাগুয়ানে ও আর একটি দল মানিক নগরে হানাদার সেনাদের অ্যামবুশ করে। এসময় দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র যুদ্ধ শুরু হয়। প্রায় আড়াই ঘণ্টাব্যাপী এই যুদ্ধে ৯ জন হানাদার সেনা নিহত ও অনেকে আহত হয়। এসময় মুক্তিযোদ্ধাদের গুলির মুখে হানাদার সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর একজন আহত হন।

২৪ আগস্ট সাতক্ষীরার আশাশুনিতে মুক্তিবাহিনী আশাশুনি রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ করে। এই হামলায় বেশ কয়েকজন রাজাকার নিহত হয় এবং পুরো ক্যাম্প ধ্বংস হয়।

সূত্র-

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র: সপ্তম, দশম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড।

দৈনিক যুগান্তর ২৪ আগস্ট ১৯৭১

দৈনিক পাকিস্তান ২৫ আগস্ট ১৯৭১

দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা ২৫ আগস্ট ১৯৭১

আহমাদ ইশতিয়াক ahmadistiak1952@gmail.com