২ জুলাই ১৯৭১, একটি লোক জীবিত থাকা পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে: খালেদ মোশাররফ
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ২ জুলাই গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল একটি দিন। এদিন মুক্তিবাহিনীর ২ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ ব্রিটিশ টেলিভিশন সাংবাদিকদের দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বাংলাদেশে একটি লোক জীবিত থাকা পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে। বাংলাদেশ থেকে পাক সেনা খতম করে তবে থামব।’ নিজ পরিবার সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘অন্যান্য বহু পরিবারের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা আমি নিজের চোখেই দেখেছি। নিজের কথা চিন্তা করার অধিকার এখন আর আমার নেই। বাংলাদেশই আমার পরিবার।’
সম্প্রতি ইরানের সর্ববহুল ও জনপ্রিয় সংবাদপত্র দৈনিক কায়রানের রাজনৈতিক সম্পাদক আমির তাহেরি এক সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশ সফর করেন। সেই সফরে তিনি বিভিন্ন সামরিক কার্যক্রম ঘুরে দেখেন। একইসঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানের সাক্ষাৎকার নেন।
২ জুলাই আমির তাহেরির একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয় দৈনিক কায়রানে। সেখানে আমির তাহেরি লিখেছেন, সেনাবাহিনীর সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চরম পর্যায়ে চলছিল, তখন ঢাকায় আসেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান। তিনি বিস্তৃতভাবে হাসেন, সামান্য স্নায়ুবিক উত্তেজনা আছে এবং খুব দ্রুত কথা বলেন। তিনি ঢাকার গভর্নর হাউজে আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমি প্রশ্ন করার পরে টিক্কা খান জবাবে বলেন, ‘আমি এখানে ঘটনা চরম আকার ধারণ করার পরে এসেছি। আমাকে দুটি জিনিস করতে বলা হয়েছে, প্রথমত: সেনাবাহিনীর ঐক্য ধরে রাখা এবং দ্বিতীয়ত: মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আরও আলোচনার জন্য দরজা খোলা রাখা। রাষ্ট্রপতি আমাকে পরিষ্কার বলেছেন যে, কোনো পরিস্থিতিতেই যেন আমি আলোচনার সব সম্ভাবনা বন্ধ না করে দেই। কিন্তু, এটা আমার বুঝতে সময় লাগেনি যে, মুজিব দেশভাগের জন্য নাছোড়বান্দা হয়ে গেছেন। তার দল এবং বন্ধুরা সেই পথেই এগোচ্ছিল। তা সত্ত্বেও, আমি শেষ মুহূর্তের আগে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিইনি। আমরা সবাই চেয়েছি একটি সুরাহা হোক। নির্বাচনী প্রচারণার সময়, মুজিব প্রকাশ্যে এবং বেসরকারিভাবে বলেছিল যে, ছয় দফা কর্মসূচি নির্বাচনের পর বোঝাপড়া করে নেওয়া যাবে। ওই পদক্ষেপে দেশ মূলত আলাদাই হয়ে যায়। কিন্তু, তারপরেও আমরা মুজিবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিলাম না। পরে দুটি নাটকীয় ঘটনা ঘটেছে। প্রথমে মুজিব প্রকাশ্যে বলেছে যে, ছয় দফার সঙ্গে কোনো আপোষ হবে না। এটা বলে তিনি চুক্তি ভঙ্গ করেছেন। তারপর তিনি একটি সমান্তরাল সরকার গঠন করলেন, যখন আমরা এখানে আছি। তিনি ঢাকায় ন্যাশনাল ব্যাংক বন্ধ করলেন এবং তার দায়িত্ব অন্য একটি ব্যাংককে দিলেন। তিনি পাকিস্তানী ব্যাংক নোট স্ট্যাম্পড করেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণা করেন। তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলে দেন যে, তিনি জাতীয় পরিষদে যোগ দেবেন না, যদি সেখানে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা থাকেন। তিনি দুটি পরিষদ চাইলেন। উপরন্তু, তিনি সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রচার করতে থাকেন এবং বলেন, তিনি আমাদের সবার বিচার করবেন। তার এজেন্টের মাধ্যমে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সৈন্য ও অফিসারদের বলেন, সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ ত্যাগ করতে। যেহেতু তিনি একটি নিজের প্যারামিলিটারি প্রতিষ্ঠান গড়েছেন। বরাবর আমরা আশা করেছি, তিনি বুঝতে পারবেন যে, সেনাবাহিনী তাকে পাকিস্তান বিভক্ত করার অনুমতি দেবে না। কিন্তু, তিনি আমাদের সংকল্পকে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি প্রেস, রেডিও এবং পূর্ব পাকিস্তানের টেলিভিশনকে বলেছিলেন, পাকিস্তানের কোনো সংবাদ সম্প্রচার না করতে এবং আমরা যে তথ্যই প্রদান করি না কেন, সেগুলো প্রচার না করতে। তারপর সব সরকারি ভবন ও ব্যাংক থেকে পাকিস্তানি পতাকা সরানোর আদেশ দেন। একটি অনুষ্ঠানে তার সমর্থকরা পাকিস্তানি পতাকা এবং আমাদের জাতির জনক মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সব ছবি পুড়িয়ে ফেলে। আপনি কল্পনা করতে পারছেন যে, আমাদের ধৈর্যের সীমা ছিল না। যখন পাকিস্তান দিবস আসলো, মুজিব ও তার সমর্থকরা তাকে “বাংলাদেশ দিবস” বলল।’
ঢাকায় এদিন
২ জুলাই পাকিস্তানের তাহরিক-ই-ইশতেকলাল পার্টি প্রধান এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান সপ্তাহব্যাপী সফর শেষে ঢাকা ত্যাগ করেন। ঢাকা ত্যাগের আগে তিনি বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘পাকিস্তানের ভবিষ্যতের জন্য আগামী তিনমাস সংকটপূর্ণ। সরকারকে জনগণের ন্যায্য দাবি-দাওয়া মিটিয়ে দিতে হবে। কে সরকার গঠন করবে তা বড় সমস্যা নয়, সমস্যা হচ্ছে আদৌ কোনো সরকার গঠন করা যাবে কিনা এবং দেশের গণতন্ত্র টিকবে কিনা।’
ভারতে এদিন
২ জুলাই লোকসভায় বাংলাদেশের বিষয়ে তুমুল বিতর্ক হয়। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে উত্তর দিতে গিয়ে সরদার শরণ সিং বলেন, ‘ভারত এই মুহূর্তে চাইলেও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান সম্ভব না। কারণ আমরা আমাদের দেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারি না। ভারত যথোপযুক্ত সময়ে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে। তবে, এই মুহূর্তে নয়।’
একই দিন দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ এক বৈঠকে বলেন, ‘পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কিছুদিন আগে দেওয়া বিবৃতিটি পাকিস্তান থেকে পূর্ববাংলার বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাই প্রমাণ করে। তিনি নিজেই তো পূর্ববঙ্গকে আলাদা করে দিলেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কখনোই পূর্ববঙ্গের মানুষের কথা তুলে ধরতে পারেনি। একইসঙ্গে পূর্ববঙ্গেও তার বক্তব্য নিয়ে তীব্র বিদ্বেষ লক্ষ্য করা গেছে।’
২ জুলাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও সরদার শরণ সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ব্রিটিশ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনা শেষে বেরিয়ে সংসদীয় দলের আহ্বায়ক আর্থার বটমলি সাংবাদিকদের বলেন, ‘পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্র যে অস্ত্র সরবরাহ করছে, তা কেবল মানবাধিকারেরই প্রশ্ন নয় বরং এই অস্ত্র সরবরাহ তাদের নিষেধাজ্ঞারও বিরুদ্ধ।’
২ জুলাই ভারতের সর্বোদয় সাধনা পত্রিকায় সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গাফফার খানের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। কিছুদিন আগে আফগানিস্তানে তার এই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল। সাক্ষাৎকারে খান আবদুল গাফফার খান বলেন, ‘পাকিস্তান সরকারের একমাত্র উদ্দেশ্যই হলো পুঁজিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত করা। যদিও তা হয়েই আছে। কিন্তু, তারা এখন চাইছে আমলাদের হাতেই দেশকে তুলে দেবে, যেন পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ আমলারাই গড়ে দিতে পারেন, যেন শাসকদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী থাকে। পূর্ব বাংলার মানুষদের নিয়ে তাদের ভাবনার কিছুই নেই। তাদের অপরাধ ছিল তারা আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করেছিল। তাই পাকিস্তানী শাসকদের ধারণা, সেখানে কী হচ্ছে তা কেবলই সেনাবাহিনীর হাতে।’
২ জুলাই ভারতের ত্রাণ মন্ত্রণালয় এদিন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, পূর্ব বাংলা থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৫ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৬ জনে।
পাকিস্তানে এদিন
২ জুলাই পাকিস্তানের কোয়েটায় পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমার দল পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের সাহায্য ছাড়াই রাজ্য সরকার গঠন করতে পারবে। একইসঙ্গে বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশেও সরকার গঠনে সক্ষম।’
২ জুলাই পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সভাপতি খান আবদুল ওয়ালি খান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘তার সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সফর। এই সফরের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের কোনো যোগসূত্র নেই।’ সম্প্রতি তার এই সফর নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল। অনেকে বিভিন্ন পত্রিকায় এমনও মন্তব্য করেছিলেন যে, এই সফরটি পাকিস্তান সরকার নিজেদের ভাবমূর্তির জন্য ওয়ালি খানকে দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করাচ্ছে।
২ জুলাই বাংলাদেশের পক্ষে প্রচারণা চালানোর সুযোগ করে দেওয়ার প্রতিবাদে পাকিস্তান কমনওয়েলথের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়। পাকিস্তান সরকার এক বিজ্ঞপ্তিতে এদিন বলে, কমনওয়েলথ পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছে। যা ভীষণ লজ্জাজনক। এই মুহূর্তে আমাদের পক্ষে তাই কমনওয়েলথের সঙ্গে থাকা সম্ভব না।
২ জুলাই পাকিস্তান সরকার বাণিজ্য সংক্রান্ত ছাড়া সব ধরনের বেসরকারি পর্যায়ের বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ করে দেয়।
আন্তর্জাতিক মহলের বিবৃতি
২ জুলাই হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী জেনো ফক হাঙ্গেরির সংসদ অধিবেশনে দেওয়া এক বক্তৃতায় বলেন, ‘পূর্ববাংলায় চলমান পরিস্থিতি এখন কেবল আর পাকিস্তানের মধ্যেই চলমান নয়, এটি এখন বৈশ্বিক ইস্যু। পূর্ববাংলার সাধারণ মানুষকে রক্ষার জন্য এবং ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের নিরাপদে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের জন্য সব দেশ, জাতি, মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে।’
২ জুলাই মার্কিন সিনেটর চার্লস এ্যাথিয়ান ও সিনেটর বেডফোর্ড মোর্সে পাকিস্তানে নতুন করে সমরাস্ত্র সরবরাহের লাইসেন্স প্রদান বন্ধ এবং মঞ্জুরীকৃত লাইসেন্স বাতিল করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারের উভয় পরিষদে প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
২ জুলাই সিরিয়া ও গাম্বিয়া পাকিস্তানের অখণ্ডতার স্বপক্ষে তাদের পূর্ণ সমর্থনের কথা ঘোষণা করে।
দেশজুড়ে প্রতিরোধ যুদ্ধ
২ জুলাই কুমিল্লার লাটুমুড়ায় হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর একটি দল পাকিস্তানি হানাদারদের অবস্থানের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এই হামলায় হানাদার বাহিনীর ১২ জন সৈন্য নিহত ও চার জন আহত হয়।
২ জুলাই চাঁদপুরের মতলবে জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর একটি দল পাকিস্তানি পুলিশ ও রেঞ্জারদের অবস্থান লক্ষ্য করে মতলব থানায় হামলা করে। এই হামলায় পাঁচ জন পুলিশ নিহত ও সাত জন আহত হয়। অন্যদিকে, এক মুক্তিযোদ্ধা নিহত হন।
২ জুলাই সুনামগঞ্জ শহরের কাছে মুক্তিবাহিনীর একটি দল হানাদার বাহিনীর একটি টহলদার দলের ওপর হামলা চালায়। মুক্তিবাহিনীর এই হামলায় হানাদার সেনাদের পুরো দল নিহত হয়।
সূত্র:
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, সপ্তম, অষ্টম, দশম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড
দৈনিক পাকিস্তান, ৩ জুলাই ১৯৭১
দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা, ৩ জুলাই ১৯৭১
আহমাদ ইশতিয়াক
ahmadistiak1952@gmail.com