পাবনায় হাই ফ্লো অক্সিজেন সংকট, বাড়ছে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু
পাবনায় করোনায় মৃত্যুহার কম থাকলেও, জেলা সদর হাসপাতালে করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পাওয়ায় তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। হাসপাতালের কোভিড ইউনিটে এখন পর্যন্ত ৯১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮২ জনই মারা গেছেন গত একমাসে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, মারা যাওয়া রোগীদের বেশিরভাগেরই করোনার লক্ষণ ছিল।
জানা গেছে, পাবনা সদর হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপন হলেও, সেখানে অক্সিজেন সরবরাহ এখনও শুরু হয়নি।
এদিকে, গত একমাসে জেলায় আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। হাই-ফ্লো অক্সিজেন ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) অভাবে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সেবা দিতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
এ প্রসঙ্গে পাবনা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক সালেহ মোহাম্মদ আলী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'করোনা রোগীদের চিকিৎসায় অক্সিজেন সরবরাহ খুব গুরুত্বপূর্ণ। যখন একজন রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে যায়, তখন তার হাই-ফ্লো অক্সিজেন বা আইসিইউ সহায়তার দরকার পড়ে। পাবনা সদর হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্লান্ট থাকলেও তরল অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। এ কারণে সংকটাপন্ন রোগীদের আমরা হাই-ফ্লো অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারছি না।'
তিনি আরও বলেন, 'যদিও আমরা সিলিন্ডারে করে অক্সিজেন সরবরাহ করে সংকট মেটাচ্ছি। তবে, হাই-ফ্লো অক্সিজেনের যথেষ্ট অভাব আছে। এই মুহূর্তে সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া সেন্ট্রাল অক্সিজেনের অভাবে চার শয্যার আইসিইউটি অব্যবহৃত পড়ে আছে।'
'প্রয়োজনীয় হাই-ফ্লো অক্সিজেনের অভাবে আমরা এখানে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ভর্তি করাতে পারছি না', বলেন ড. সালেহ।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর করোনাভাইরাস শুরু হওয়ার পর থেকে চলতি মাসের ৪ আগস্ট পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ও করোনার লক্ষণ নিয়ে পাবনা সদর হাসপাতালে মোট ৯১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮২ জনই গতমাসে মারা গেছেন। তাদের অধিকাংশই শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যায় ভুগছিলেন।
সবুজ হোসেন নামে এক রোগীর স্বজন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমার দাদি পড়ে যাওয়ার পর শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা শুরু হয়। এরপর গত ১ আগস্ট তাকে পাবনা সদর হাসপাতালে নিলে করোনার লক্ষণ থাকায় কোভিড ইউনিটে ভর্তি করা হয়। ভর্তি করার পর তাকে সিলিন্ডারে করে অক্সিজেন দেওয়া হয়। এক পর্যায়ে তিনি মারা যান।'
ডা. সালেহ মোহাম্মদ আলী ডেইলি স্টারকে বলেন, 'অধিকাংশ রোগীকে সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। সে মুহূর্তে তাদের হাই-ফ্লো অক্সিজেন সরবরাহের প্রয়োজন হয় কিন্তু আমাদের কাছে সেটি নেই।'
পাবনা সদর হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. কে এম আবু জাফর ডেইলি স্টারকে বলেন, 'হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্লান্ট তৈরি হয়েছে। তরল অক্সিজেনের প্লান্ট স্থাপনের কাজও করা হয়েছে। গত মাসে নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ করার পরও এখনো তরল অক্সিজেনের সরবরাহ পাচ্ছি না।'
ডা. জাফর বলেন, 'অক্সিজেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্পেকট্রাকে বারবার অনুরোধ করেছি কিন্তু তারা অক্সিজেন সরবরাহ করেনি। এছাড়া অক্সিজেন সরবরাহ চেয়ে আমরা বেশ কয়েকবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্পেকট্রাকে চিঠি দিয়েছি।'
অক্সিজেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্পেকট্রার এজিএম ইঞ্জিনিয়ার জাহাঙ্গীর আলম ডেইলি স্টারকে জানান, বিদ্যমান প্ল্যান্টগুলোতে অক্সিজেন সরবরাহ করতেই তারা হিমশিম খাচ্ছেন।
তিনি বলেন, 'কয়েক মাস আগেও ১৫ থেকে ২০ টন অক্সিজেন যথেষ্ট ছিল। এখন আমরা ভারত থেকে নিয়মিতভাবে ১২০ টন করে অক্সিজেন আনছি। তবে, করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় এই পরিমাণ অক্সিজেনও প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। আমরা আরও বেশি পরিমাণে তরল অক্সিজেন আমদানির চেষ্টা করছি।'
পাবনা সদর হাসপাতালের অক্সিজেন প্লান্টটি একদম নতুন। খুব দ্রুতই সেখানে অক্সিজেন সরবরাহের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
পাবনা জেলার সিভিল সার্জন ডা.. মনিসার চৌধুরী ডেইলি স্টারকে বলেন, 'চলতি বছরের জুলাই মাসে পাবনায় ব্যাপক হারে করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এছাড়া গত মাসে ৩১ হাজার ১৭৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করে পাঁচ হাজার ৪১৫ জনের করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়।'
পাবনায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুহার অনেক কম উল্লেখ করে তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, 'কোভিড ইউনিটে অনেক মানুষ মারা গেছেন। তার অর্থ এই নয় যে, তারা সবাই করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে রোগীরে এখানে ভর্তি হচ্ছেন, তবে তারা সবাই করোনা আক্রান্ত নন।'