বিশ্লেষণ

কেন এখনো যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করছে বিশ্ব

স্টার অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অনেকে নিজের দেশের অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থা নিয়ে হতাশ। কিন্তু বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টাইম ম্যাগাজিনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দেশটির আর্থিক ব্যবস্থা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যে আলোচনা হয়, বিশ্বের সরকার, কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীরা বিষয়টিকে সেভাবে দেখেন না।

যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে অস্থিরতা, অকার্যকারিতা ও অবনতির কথা বেশি শোনা যায়, সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও বিনিয়োগকারীরা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থায় আরও বেশি প্রবেশের সুযোগ খুঁজছেন।

এর পেছনে তথ্যও আছে। বিশ্বের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) বড় অংশ এখনো যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে। মহামারির আগে বৈশ্বিক এফডিআইয়ের প্রায় ১৫ শতাংশ পেত যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪ সাল থেকে এই হার বেড়ে গড়ে প্রায় ২০ শতাংশে উঠেছে। চলতি বছরেও সেই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।

শেয়ারবাজারেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শক্তিশালী। বিশ্বের সব শেয়ারবাজারের মোট বাজারমূল্যের ১০ ভাগের প্রায় সাড়ে ছয়ভাগই যুক্তরাষ্ট্রের।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির ম্যানহাটনে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ ভবনে হিমস অ্যান্ড হার্স হেলথের ব্যানার। ২১ জানুয়ারি, ২০২১। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ডলারের ক্ষেত্রেও চিত্রটা একই। ডলারের ব্যবহার কমে যাচ্ছে, এমন আলোচনা গত কয়েক বছর ধরেই আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিস্তৃত ডলার সূচক এখনো ৪০ বছরের সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি।

গত বছর শুল্ক ঘোষণার কিছুদিন পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা নিষ্পত্তি ব্যাংক (বিআইএস) বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর একটি জরিপ চালায়। তাতে দেখা যায়, বৈদেশিক মুদ্রার ১০ ভাগের প্রায় নয়ভাগ লেনদেনেই ডলার রয়েছে।

তবে এসব তথ্যের অর্থ এই নয় যে, বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান চিরস্থায়ী। বরং এগুলো দেখায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোর নানা অস্থিরতার পরও যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থা এখনো বিশ্বের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয়।

টাইমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আগামী দশকের বড় অর্থনৈতিক প্রশ্ন শুধু কে ভবিষ্যৎ তৈরি করবে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হবে, সেই ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ দেবে কে?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন প্রজন্মের অবকাঠামো তৈরি করতে হবে, জ্বালানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে ও উৎপাদন খাতও ফিরিয়ে আনতে হবে দেশে। এসব করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ দ্রুত বিনিয়োগ করতে হবে।

মার্কিন ডলার, ইউরো, ইয়েন, পাউন্ড, তুর্কি লিরা ও চীনা ইউয়ানের নোট। ২৪ মার্চ, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

আর এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের বড় সুবিধা।

টাইমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে বেসরকারি মূলধন দ্রুত এবং বড় পরিসরে কাজে লাগানোর সুযোগ বেশি।

দেশটির শেয়ারবাজারের শক্তিও বিনিয়োগকারীদের আস্থার বড় প্রমাণ। এসঅ্যান্ডপি ৫০০-কে প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এই সূচক শুধু বর্তমান অর্থনীতির চিত্র দেয় না। এতে এমন অনেক কোম্পানি ও প্রযুক্তি রয়েছে, যেগুলোকে বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতের আয় ও প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি মনে করেন।

এই আস্থা শুধু বড় কোম্পানিগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি স্টার্টআপও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। বৈশ্বিক স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগের প্রায় ৬৪ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর কাছে।

এর কারণ যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থার কাঠামোও। একজন উদ্যোক্তা একটি ধারণা নিয়ে ব্যবসা শুরু করতে পারেন। স্থানীয় একটি ব্যাংকে হিসাব খুলতে পারেন। এরপর ভেঞ্চার ফান্ড থেকে প্রাথমিক মূলধন সংগ্রহ করতে পারেন। ব্যবসা বড় হলে একসময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় শেয়ারবাজারে কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার সুযোগও রয়েছে।

মিসরের কায়রোতে মার্কিন ডলারের ছবি প্রদর্শনকারী একটি মুদ্রা বিনিময়কেন্দ্রের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন মানুষ। ৬ মার্চ, ২০২৪। ছবি: রয়টার্স

অর্থাৎ, একটি ছোট স্টার্টআপও ধীরে ধীরে বৈশ্বিক কোম্পানিতে পরিণত হতে পারে। সেই কোম্পানির সাফল্যের অংশীদার হতে পারেন কোটি কোটি মার্কিন নাগরিকও। তারা অবসরকালীন তহবিল বা ব্যক্তিগত বিনিয়োগের মাধ্যমে কোম্পানিতে অর্থ রাখেন।

টাইমের বিশ্লেষণ বলছে, এই পুরো ব্যবস্থা মানুষকে শুধু ব্যবসা গড়তে সাহায্য করে না। এটি বাড়ি কেনা, সম্পদ তৈরি এবং ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি করে। একইসঙ্গে দেশের ভেতরে অবকাঠামো ও শিল্প গড়ে তুলতে এবং বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়াতেও এই আর্থিক ব্যবস্থা ভূমিকা রাখে।

এর উদাহরণও কম নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ পুনর্গঠনে মার্শাল পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতি—বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক শক্তি দেশটির নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করেছে।

তবে শুধু বড় অর্থনীতি বা নতুন প্রযুক্তি দিয়ে এই সাফল্যের ব্যাখ্যা হয় না।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের ভবন। ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে বহু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর। এসব প্রতিষ্ঠান কয়েক প্রজন্ম ধরে নানা সংকট ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নিজেদের বদলেছে। এর সঙ্গে রয়েছে লাখো ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ এবং বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থা।

এই আস্থার কারণেই বৈশ্বিক বাণিজ্যেও ডলারের এত বড় ভূমিকা। বিশ্বের বাণিজ্য, লেনদেন ও বিনিয়োগের বড় অংশ এখনো ডলারনির্ভর। অর্থনৈতিক সংকট বা বড় ধরনের ধাক্কার সময়ও বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের নিরাপত্তা, তারল্য ও স্বচ্ছতার দিকে ঝুঁকেন।

টাইমের বিশ্লেষণে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থা অবশ্যই নিখুঁত নয়। গত কয়েক দশকে এমন অনেক সময় এসেছে, যখন ব্যাংক ও শেয়ারবাজারের ওপর মানুষের আস্থা কমেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও বড় সংকটের মুখে পড়েছে।

কিন্তু প্রতিবারই ব্যবস্থা বদলেছে। সংস্কার হয়েছে। নতুন নিয়ম এসেছে। ধীরে ধীরে আস্থাও ফিরেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের (এনওয়াইএসই) কাছে ওয়াল স্ট্রিটের সড়ক নির্দেশক। ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯। ছবি: রয়টার্স

এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থার বড় শক্তি। সুবিধাটি এমন নয় যে, এখানে কখনো ব্যর্থতা আসে না। বরং ব্যর্থতার পরও এই ব্যবস্থা নিজেকে বদলাতে পারে। নতুন নিয়ম তৈরি করতে পারে। নতুন সুযোগও তৈরি করতে পারে।

বিশ্বের সবচেয়ে গভীর মূলধন বাজার গড়ে তোলা যুক্তরাষ্ট্র বারবার উদ্ভাবন, প্রতিযোগিতা ও পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজের বাজারকে নতুন করে সাজিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও নানা ধাক্কার পর ছোট-বড় মার্কিন কোম্পানিগুলো নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে, নতুন পণ্য ও প্রযুক্তি এনেছে এবং প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে।

তাই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে বাজি ধরা এখনো সহজ সিদ্ধান্ত নয়। এ কারণেই বহু অভিবাসী অতীতে যেমন যুক্তরাষ্ট্রকে বেছে নিয়েছেন, এখনো অনেকে দেশটিকে বেছে নিচ্ছেন। আর একই কারণে বিশ্বের মূলধনের বড় অংশও এখনো যুক্তরাষ্ট্রের দিকে যাচ্ছে।

Image
Multinationals
যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। ছবি: সংগৃহীত

শেষ পর্যন্ত বিষয়টি কেবলই আস্থার। বিশ্বের বিনিয়োগকারীরা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের সবকিছুকে নিখুঁত মনে করেন না।

কিন্তু তারা এখনো মনে করেন, বড় ধরনের সুযোগ তৈরি করা, অর্থ জোগাড় করা এবং সেই অর্থকে ব্যবসা ও প্রযুক্তিতে পরিণত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মতো জায়গা আর নেই।

টাইমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বের কোনো দেশ যদি আগামীকাল যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ওয়াল স্ট্রিট নিয়ে নিতে পারত, তাহলে তারা এক মুহূর্তও দেরি করত না।