রূপপুরের বিদ্যুৎ পেতে বাড়ছে অপেক্ষা
পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও বিলম্বিত হচ্ছে। পারমাণবিক জ্বালানি লোড এবং প্রাথমিক কমিশনিং-সংক্রান্ত পরীক্ষা শেষ হলেও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) বি-২ কমিশনিং লাইসেন্স না পাওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা যাবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এর আগে সরকার আশা করেছিল, চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল জ্বালানি লোডিং শুরুর পর আগস্টেই প্রথম ইউনিট থেকে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে। তবে সেই লক্ষ্য এখনই পূরণ হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ‘ক্রিটিকালিটি’ অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ভাষ্য অনুযায়ী, ক্রিটিকালিটি হলো এমন একটি পর্যায়, যেখানে রিঅ্যাক্টরে স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু হয় এবং এটিকে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত ১৬ এপ্রিল বায়েরা থেকে পাওয়া বি-১ কমিশনিং লাইসেন্সের আওতায় প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং এবং প্রয়োজনীয় কমিশনিং পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন ক্রিটিকালিটি অর্জন এবং পরবর্তী ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে হলে বি-২ কমিশনিং লাইসেন্স প্রয়োজন।
রূপপুর প্রকল্পের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের পর আমরা সফলভাবে প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোড করেছি এবং গুরুত্বপূর্ণ ৯০টি পরীক্ষা সম্পন্ন করেছি। এখন বায়েরা চূড়ান্ত পরিদর্শন শেষে লাইসেন্স দিলেই আমরা পরবর্তী ধাপে যেতে প্রস্তুত।’
তিনি বলেন, ক্রিটিকালিটি অর্জনের পরও সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে না। আরও চার থেকে ছয় সপ্তাহ বিভিন্ন ধাপের পরীক্ষা ও প্রস্তুতি শেষে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে।
তবে বায়েরা এখনো জানায়নি, কবে নাগাদ বি-২ কমিশনিং লাইসেন্স দেওয়া হবে।
বায়েরার চেয়ারম্যান মো. মাহামুদুল হাসান ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এই পর্যায়ে লাইসেন্স দেওয়া অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া। প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সন্তোষজনক ফলাফল নিশ্চিত হওয়ার পরই আমরা লাইসেন্স দেবো।’
তিনি বলেন, প্রকল্প আগেই বিলম্বিত হলেও নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে কবে নাগাদ লাইসেন্স দেওয়া হবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাননি।
রূপপুর প্রকল্পের সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. শওকত আকবর বলেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প সফলভাবে কমিশনিং সম্পন্ন করতে বাস্তবায়নকারী সংস্থা, পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ঠিকাদার ও নকশা প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় অপরিহার্য।
তিনি বলেন, ‘পারমাণবিক প্রকল্পে প্রতিটি সংস্থাকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হয়। সঠিক সমন্বয় নিশ্চিত করতে পারলেই প্রকল্প সফলভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।’
রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টরের মাধ্যমে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। পরে প্রকল্পের মেয়াদ তিন বছর বাড়ানো হয় এবং সংশোধিত সময়সূচি অনুযায়ী ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রথম ইউনিটের কমিশনিং আরও বিলম্বিত হলে দ্বিতীয় ইউনিটের সময়সূচিও প্রভাবিত হতে পারে।
ড. জাহেদুল হাসান বলেন, ‘প্রথম ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের একেবারে শেষপর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজ ৭০ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের কমিশনিংয়ের সময়সূচি প্রথম ইউনিটের তুলনায় প্রায় এক বছর পিছিয়ে থাকবে।’