উত্তরের ৪ জেলায় উর্বর মাটি সাবাড় করছে ৫৯৫ ইটভাটা

এস দিলীপ রায়
এস দিলীপ রায়

রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় অবাধে কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি (টপ সয়েল) কেটে ইটভাটায় নেওয়া হচ্ছে। এতে জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হয়ে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

কৃষিবিদদের মতে ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি হলো মাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর। জমির এই অংশের মাটিতে জৈব উপাদানের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি থাকে। এই মাটি একবার তুলে নিলে জমিতে উর্বরতা ফিরে আসতে ১০ বছরেরও বেশি সময় লাগে।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও রংপুর জেলার অন্তত ৫৯৫টি ইটভাটায় ইট তৈরির জন্য ফসলি জমির উর্বর মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে।

কৃষিজমির উর্বর মাটি ব্যবহার করে ইট তৈরির দায়ে গত এক সপ্তাহে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও রংপুর জেলায় ১২টি ইটভাটাকে ১৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী ও উলিপুর, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ এবং রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় এসব অভিযান পরিচালনা করা হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় প্রশাসনের বারবার অভিযান চালালেও ইটভাটায় উর্বর মাটি সরবরাহ বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার একটি ইটভাটায় টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করেন জামাল উদ্দিন। তিনি জানান, একটি ইট তৈরি করতে প্রায় পাঁচ কেজির মতো মাটি লাগে। ইট তৈরি করতে টপ সয়েল সবচেয়ে ভালো। বছরে একটি ইটভাটায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ইট উৎপাদন করা হয়। এর জন্য বিপুল পরিমাণ কৃষিজমির মাটির প্রয়োজন হয়।

ইটভাটার মালিকদের দাবি, কৃষকরা স্বেচ্ছায় মাটি বিক্রি করেন। হাতীবান্ধা উপজেলার একটি ইটভাটা মালিক আফজাল হোসেন বলেন, 'ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরা নিজেরাই আমাদের কাছে মাটি বিক্রি করতে আগ্রহী।' তিনি আরও বলেন, 'আমরা যদি এই মাটি না কিনি তাহলে ইটভাটা বন্ধ হয়ে যাবে। আর ইটভাটা বন্ধ হয়ে গেলে সব উন্নয়ন কাজ বিঘ্নিত হবে।'

ইটভাটার মালিকেরা ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি বিক্রির জন্য কৃষকেরা আগ্রহী জানালেও মাঠপর্যায়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। কৃষকরা জানান, ইটভাটার মালিকদের কাছে একপ্রকার জিম্মি হয়েই তারা ফসলী জমির উপরিভাগের মাটি বিক্রি করছেন।

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের কৃষক আফতাব উদ্দিন (৬৫) বলেন, 'ইটভাটার মালিকেরা একসঙ্গে কয়েক বিঘা জমির উপরিভাগের মাটি কেটে নেয়। এতে বাকি জমি নিচু হওয়ায় সেচ ও চাষাবাদে সমস্যা হয়। ফলে আমাদের জমির মাটি বিক্রি করা ছাড়া কোন উপায় থাকেনা। বাধ্য হয়েই তখন আমাদের মাটি বিক্রি করতে হয়।'

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কৃষক নারায়ণ সরকার বলেন, 'এক বিঘা জমির টপ সয়েল ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। শুরুতে লাভ মনে হলেও পরে টানা কয়েক বছর ভালো ফলন পাওয়া যায় না।'

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও কৃষির ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে।

রংপুর বিভাগীয় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সাফিনুর রহমান বলেন, 'টপ সয়েলে জৈব উপাদান ও অণুজীব সবচেয়ে বেশি থাকে। এই মাটি একবার সরিয়ে নিলে জমির উর্বরতা ফিরতে এক দশকের বেশি সময় লাগে।'

রংপুর অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, এভাবে মাটি তোলায় ফসল উৎপাদনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

কুড়িগ্রামের পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, বিষয়টি ইতিমধ্যেই স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো হয়েছে এবং বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে।'

রংপুর বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম জানান, কৃষিজমি থেকে টপ সয়েল কেটে নাওয়া বন্ধে জেলা প্রশাসকদের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।