এক্সপ্লেইনার

মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোর সক্ষমতা কেমন, যেভাবে মোকাবিলা করছে ইরান

স্টার অনলাইন ডেস্ক

সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন ও ভয়াবহ এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। গত এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে ১৩ হাজারের বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষাবাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ইরানে এ পর্যন্ত ১২ হাজার ৩০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে।

তবে এই সংঘাতের সবচেয়ে চমকপ্রদ খবর এসেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, ২০ বছরের বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো শত্রুর হামলায় একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে।

ইরানের আকাশে একটি ‘এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল’ এবং হরমুজ প্রণালির কাছে একটি ‘এ-১০ ওয়ারথগ’ ভূপাতিত হয়েছে। মার্কিন বিশেষ বাহিনী দুই দিনব্যাপী অভিযানে এফ-১৫ই-এর নিখোঁজ ক্রু এবং এ-১০-এর পাইলটকে জীবিত উদ্ধারের দাবি করেছে। তবু এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল। ছবি: ইউএস এয়ারফোর্স

সিএনএন ও আনাদোলু এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে (অপারেশন এপিক ফিউরি) এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৭টি যুদ্ধবিমান হারিয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে— তিনটি এফ-১৫, একটি কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং ট্যাংকার, একটি ই-৩ সেন্ট্রি, একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল এবং একটি এ-১০।

এছাড়া রয়টার্স জানায়, উদ্ধার অভিযানের সময়ও ইরান একাধিক ‘শত্রু বিমান’ ধ্বংসের দাবি করেছে। এর মধ্যে দুটি সি-১৩০ পরিবহন বিমান ও কয়েকটি হেলিকপ্টারের কথাও বলা হয়েছে।

এতে মার্কিন বিমানবাহিনীর অপ্রতিরোধ্য সক্ষমতা, তাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং যুদ্ধক্ষেত্রে এর বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিমানবাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী যুদ্ধবিমানগুলো ব্যবহার করছে।

এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল

এটি একটি ‘ডুয়াল রোল’ যুদ্ধবিমান। অর্থাৎ এটি আকাশে শত্রু বিমানের সঙ্গে লড়াই করতে পারে, আবার ভূমিতে আঘাতও হানতে পারে।

মার্কিন এয়ারফোর্স জানায়, এটি ঘণ্টায় ১ হাজার ৮৭৫ মাইল গতিতে উড়তে পারে এবং ২০ হাজার পাউন্ডের বেশি অস্ত্র বহন করতে সক্ষম। এতে ‘ল্যান্টার্ন’ সেন্সর পড রয়েছে, যার ফলে এটি রাতেও এবং খারাপ আবহাওয়াতেও নিচু দিয়ে উড়ে নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে। এতে দুজন ক্রু থাকেন—একজন পাইলট ও একজন অস্ত্র নিয়ন্ত্রক।

এফ-২২ র‍্যাপ্টর। ছবি: ইউএস এয়ারফোর্স

এফ-২২ র‍্যাপ্টর

এই যুদ্ধবিমানটি আকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য তৈরি। বিশ্বের প্রথম পঞ্চম প্রজন্মের এই বিমানের বড় বৈশিষ্ট্য হলো ‘সুপারক্রুজ’ ক্ষমতা—অতিরিক্ত জ্বালানি ছাড়াই শব্দের চেয়ে দেড় গুণ বেশি গতিতে উড়তে পারে।

এতে ‘স্টেলথ’ প্রযুক্তি রয়েছে, যা একে রাডার থেকে আড়াল করে রাখে। ফলে শত্রু বুঝে ওঠার আগেই এটি আঘাত হানতে পারে। এতে এম৬১এ২ ২০ মিলিমিটার কামান এবং জেডিএএম ও আমরাম মিসাইল থাকে।

এফ-৩৫এ লাইটনিং ২। ছবি: ইউএস এয়ারফোর্স

এফ-৩৫এ লাইটনিং ২

এটি মার্কিন বাহিনীর অন্যতম আধুনিক পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান, যা ধীরে ধীরে এফ-১৬ ও এ-১০-এর জায়গা নিচ্ছে। এর বড় শক্তি ‘সেন্সর ফিউশন’ ও ডিএএস প্রযুক্তি।

এর মাধ্যমে পাইলট হেলমেট ডিসপ্লেতে ৩৬০ ডিগ্রি পরিবেশ দেখতে পারেন এবং শত্রুর মিসাইলের আগাম সতর্কতা পান।

সিএনএন জানায়, সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে এই মডেলের একটি বিমান ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জরুরি অবতরণ করেছে।

এ-১০সি থান্ডারবোল্ট। ছবি: ইউএস এয়ারফোর্স

এ-১০সি থান্ডারবোল্ট

‘ওয়ারথগ’ নামে পরিচিত এই বিমানটি মূলত ক্লোজ এয়ার সাপোর্টের জন্য ব্যবহৃত হয়, অর্থাৎ স্থলবাহিনীকে কাছ থেকে সহায়তা দেয়। এটি নিচু দিয়ে ধীরগতিতে উড়তে পারে।

এর সামনে থাকা ৩০ মিলিমিটার গ্যাটলিং গান প্রতি মিনিটে ৩ হাজার ৯০০ রাউন্ড গুলি ছুড়তে পারে, যা ট্যাংক ধ্বংসে কার্যকর। পাইলট টাইটানিয়াম বর্মে সুরক্ষিত থাকেন এবং বিমানটি ২৩ মিলিমিটার গোলার আঘাত সহ্য করেও টিকে থাকতে পারে।

ই-৩ সেন্ট্রি ।ছবি: ইউএস এয়ারফোর্স

ই-৩ সেন্ট্রি

এটি একটি উড়ন্ত কমান্ড সেন্টার, যা আকাশে নজরদারি ও যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়। 
বোয়িং ৭০৭ ভিত্তিক এই বিমানের ওপর ৩০ ফুট চওড়া একটি ঘূর্ণায়মান রাডার ডোম রয়েছে। এর মাধ্যমে এটি ২৫০ মাইল দূর থেকেও শত্রু শনাক্ত করতে পারে। এটি নিচু দিয়ে উড়ে আসা লক্ষ্যও শনাক্ত করতে পারে এবং অন্যান্য যুদ্ধবিমানকে তথ্য দেয়। একবার জ্বালানি নিয়ে এটি প্রায় ৮ ঘণ্টা উড়তে পারে।

আনাদোলু জানায়, সৌদি আরবের ঘাঁটিতে থাকা অবস্থায় এমন একটি বিমান ইরানি হামলায় ধ্বংস হয়েছে।

সি-১৩০জে সুপার হারকিউলিস। ছবি: ইউএস এয়ারফোর্স

সি-১৩০জে সুপার হারকিউলিস

এটি একটি সামরিক পরিবহন বিমান, যা শত্রুকবলিত এলাকায় সৈন্য ও সরঞ্জাম পৌঁছাতে ব্যবহৃত হয়। এটি কাঁচা ও রুক্ষ রানওয়েতে ওঠানামা করতে পারে এবং ৪২ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত কার্গো প্যারাসুটে নামাতে সক্ষম।

এতে আধুনিক প্রপেলার ও ডিজিটাল এভিওনিক্স রয়েছে, যা একে দ্রুত ও দীর্ঘপথে উড়তে সাহায্য করে। বড় র‍্যাম্প দিয়ে হেলিকপ্টার বা সাঁজোয়া যানও বহন করা যায়।

আল জাজিরা জানায়, উদ্ধার অভিযানে এই বিমান ব্যবহৃত হয়েছে। পরে মার্কিন বাহিনী নিজেদের দুটি ‘এমসি-১৩০জে’ বিমান ধ্বংস করে।

মার্কিন ক্রু সদস্যকে উদ্ধারে আসা একটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে ইরান। ছবি: এএফপি

কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মার্কিন বিমান?

মার্কিন যুদ্ধবিমান প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হলেও যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা ভিন্ন। এফ-২২ বা এফ-৩৫-এ স্টেলথ প্রযুক্তি থাকলেও এফ-১৫ই বা এ-১০ যুদ্ধবিমানে তা নেই।

নির্ভুল হামলার জন্য অনেক সময় বিমানগুলোকে নিচু দিয়ে উড়তে হয়। এতে তারা কাঁধে বহনযোগ্য মিসাইল ও সাধারণ অস্ত্রের ঝুঁকিতে পড়ে।

বার্তাসংস্থা এপি জানায়, এফ-১৫ই সম্ভবত এমন পোর্টেবল মিসাইল দিয়ে ভূপাতিত হয়েছে। এছাড়া, ইনফ্রারেড বা রাডার-গাইডেড মিসাইল এলে পাইলটদের দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিতে হয়। কিন্তু নিচুতে থাকলে সময় ও সুযোগ কম থাকে।

ইরানি-আমেরিকান সামর বিশ্লেষক বেহনাম বেন তালেবলু বলেন, ‘একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আংশিক অকেজো হলেও তা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় নয়’—অর্থাৎ ছোট অস্ত্র দিয়েও বড় ক্ষতি করা সম্ভব।

ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ

মার্কিন বাহিনীর জন্য ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ব্যাপক হামলার পরও ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।

আনাদোলু জানায়, ইরানের কাছে খোররাম-৪, কদর-১১০ ও ইমাদের মতো ব্যালিস্টিক মিসাইল রয়েছে, যেগুলোর পাল্লা ২ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত। এছাড়া তাদের কাছে প্রায় ৮০ হাজার শাহেদ-১৩৬ কামিকাজে ড্রোনের মজুত রয়েছে, যা নিয়মিত উৎপাদনও করা যায়।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ই-৩ সেন্ট্রি দিয়ে নজরদারি এবং ইসি-১৩০এইচ কম্পাস কল দিয়ে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ পরিচালনা করছে। এই বিমানগুলো শত্রুর রাডার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা জ্যাম করে দেয়। তবুও যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৭টি বিমান হারিয়েছে।

সিএনএন জানায়, এর মধ্যে দুটি শত্রু হামলায় ভূপাতিত, একটি সৌদি ঘাঁটিতে ধ্বংস, তিনটি ভুলবশত নিজেদের প্রতিরক্ষায় ভূপাতিত এবং একটি ইরাকে বিধ্বস্ত হয়েছে।

এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইরানের প্রতিরোধ এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ কতটা জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই সংঘাত আধুনিক আকাশযুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে। প্রথমত, শুধু আকাশে শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেই পুরো আধিপত্য নিশ্চিত হয় না। ছোট ও সস্তা অস্ত্র দিয়েও শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করা যায়।

দ্বিতীয়ত, আধুনিক যুদ্ধ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং রসদনির্ভর। যুদ্ধের প্রথম ১৬ দিনেই যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলারের ১১ হাজার ২৯৪টি অস্ত্র ব্যবহার করেছে।

সস্তা ড্রোন ঠেকাতে অ্যারো, থাড ও প্যাট্রিয়টের মতো ব্যয়বহুল মিসাইল ব্যবহার করতে হচ্ছে, ফলে মজুত দ্রুত কমছে। পাশাপাশি টমাহক ক্রুজ মিসাইল ও জেডিএএম বোমার মজুতও চাপের মুখে পড়েছে।