এক্সপ্লেইনার

ত্বকের যত্নের ভিডিওতে শিশু, যেভাবে বাড়ছে ‘কসমেটিকোরেক্সিয়া’

দুলি মল্লিক
দুলি মল্লিক

‘হ্যালো এভরিওয়ান, আজকে সকাল সকাল স্কুলের একটা স্পেশাল ক্লাস আছে, আর বিকেলে কোচিং। তাই চলো চটপট আমার সঙ্গে রেডি হয়ে নাও।’ সকাল ৭টায় মোবাইল ফোনের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে এই কথাগুলো বলছিল ১০ বছর বয়সী নাবিহা (ছদ্মনাম)।

ঢাকার একটি নামী স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর সকালটা আর দশজন সাধারণ শিশুর মতো তাড়াহুড়ো করে পড়তে বসা কিংবা স্কুলের হোমওয়ার্ক করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় না। ক্লাসে যাওয়ার আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একের পর এক সানস্ক্রিন, ফেসিয়াল সিরাম, কোরিয়ান টোনার আর ময়েশ্চারাইজার মুখে মাখছে সে।

ছোট এই মেয়েটির ‘গেট রেডি উইথ মি ফর স্কুল’ ভিডিওটি যখন ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম শর্টসে আপলোড হয়, তখন মুহূর্তেই তাতে হাজার হাজার লাইক আর কমেন্ট পড়তে থাকে।

কমেন্ট বক্সে তার বয়সী আরও অনেক খুদে দর্শক ও সহপাঠী জানতে চায়—সে স্কুলে যাওয়ার আগে কোন ব্র্যান্ডের ‘গ্লো সিরাম’ বা ‘লিপ অয়েল’ ব্যবহার করেছে, যা তার স্কিনকে এত গ্লো দিচ্ছে।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময় লকডাউন চলাকালে ঘরের ভেতর বন্দি থাকা অবস্থায় স্রেফ মজার ছলে মায়ের প্রসাধন সামগ্রী নিয়ে যে খামখেয়ালি শুরু হয়েছিল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে আজ তা এক মারাত্মক আসক্তিতে রূপ নিয়েছে।

এখন প্রতিদিন স্কুল বা প্রাইভেট বা কোচিংয়ে যাওয়ার আগে এই দীর্ঘ রূপচর্চা নাবিহার দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে শুধু এই মেয়েটিই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুঁজলে ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী এমন শিশু-কিশোরীদের স্কুলে বা কোচিংয়ে যাওয়ার আগে এ ধরনের রূপচর্চা ও মেকআপের অসংখ্য ভিডিও পাওয়া যাবে, যা রীতিমতো মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা শিশু-কিশোরীদের নতুন এই মানসিক ও শারীরিক ব্যাধির নাম দিয়েছেন ‘কসমেটিকোরেক্সিয়া’। এটি মূলত অল্প বয়সীদের ‘নিখুঁত’ বা ‘ফ্ললেস’ ত্বক পাওয়ার এক তীব্র ও অস্বাস্থ্যকর মোহ।

কসমেটিক্স বা মেকআপের প্রতি শিশু-কিশোরীদের এমন চরম আসক্তির বাস্তব চিত্র এবং কোমল ত্বকে এর মারাত্মক প্রভাবের কথা উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনেও। 

চাইল্ড ইনফ্লুয়েন্সারের সত্যি গল্প

ছদ্মনামে লেখা প্রথম গল্পটি যে কতখানি বাস্তব সেটা বিবিসির প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, শিশু-কিশোরদের এই মেকআপের ট্রেন্ড এখন বিশ্বব্যাপী বড় রূপ নিয়েছে। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে তা আরও স্পষ্ট হয়।

উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয় যুক্তরাজ্যের ১৩ বছর বয়সী টিকটকার এলি মে’র কথা। মাত্র আট বছর বয়সে স্কিনকেয়ারের ভিডিও বানানো শুরু করে এলি।

টিকটকে ১৩ বছর বয়সী এলি মে এর অনুসারীর সংখ্যা ৩ লাখ ৩০ হাজার। ছবি: সংগৃহীত

টোনার, সিরাম, ময়েশ্চারাইজার, কনসিলার, ব্লাশ, মাসকারা—সব মিলিয়ে তার দৈনন্দিন সৌন্দর্যচর্চার তালিকা অনেক প্রাপ্তবয়স্ক নারীর চেয়েও দীর্ঘ।

এখন তার বয়স ১৩। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে তার অনুসারীর সংখ্যা তিন লাখ ৩০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

এলি মের গল্প শুধু এক কিশোরী ইনফ্লুয়েন্সারের গল্প নয়। এটি একটি নতুন বৈশ্বিক প্রবণতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে শিশু থেকে শুরু করে কিশোরীরা ধীরে ধীরে রূপচর্চার বিভিন্ন পণ্যের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে পড়ছে।

কসমেটিকোরেক্সিয়া কী

এক কথায় বললে কসমেটিকোরেক্সিয়া হলো, প্রসাধনীর প্রতি শিশু-কিশোরীদের নতুন এক আসক্তির নাম।

ইদানিং টিকটক, ইউটিউব বা ইনস্টাগ্রামে ঢুকলে দেখতে পাবেন ‘গেট রেডি উইথ মি’, ‘আফটার স্কুল স্কিনকেয়ার’ কিংবা ‘মর্নিং রুটিন’—এমন শিরোনামে বিভিন্ন প্রসাধনী ব্যবহার করে নিজেদের ত্বক পরিচর্যার নানা ধাপ দেখিয়ে ভিডিও পোস্ট করেছে স্কুলপড়ুয়া মেয়েরা।

চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, অল্প বয়স থেকেই নিখুঁত বা ‘পারফেক্ট’ ত্বক পাওয়ার প্রতি অতিরিক্ত মোহ তৈরি হয় এবং যখন কেউ বারবার প্রসাধনী ব্যবহার করতে শুরু করে তাকে কসমেটিকোরেক্সিয়া বলে।

গবেষণা ও জরিপ কী বলছে

ইতালির মিলান বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জিওভান্নি দামিয়ানি ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৫৫ শিশুর ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন, যাদের মধ্যে এই প্রবণতা দেখা যায় তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্কিনকেয়ার ভিডিও দেখে এবং প্রতিদিন প্রায় ১০টি আলাদা আলাদা স্কিনকেয়ার পণ্য ব্যবহার করে।

এর মধ্যে অনেকেই মেকআপ ছাড়া বাইরে যেতে বা বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে দেখা করতেও অস্বস্তি বোধ করে।

লন্ডনভিত্তিক ‘পাই’ নামে একটি স্কিনকেয়ার ব্র্যান্ড ৯ থেকে ১২ বছর বয়সী এক হাজার ৫০০ শিশুর ওপর একটি সমীক্ষা চালায়।

এতে দেখা গেছে, ৯ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় অর্ধেকই নিয়মিত একাধিক স্কিনকেয়ার পণ্য ব্যবহার করে। এদের অনেকেই মনে করে তাদের ত্বকে কোনো না কোনো সমস্যা আছে, যা ঠিক করার জন্য এসব পণ্য ব্যবহার করা জরুরি।

যেভাবে বাড়ছে স্কিনকেয়ারে আসক্তি

টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক বা স্ন্যাপচ্যাটের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোই এই প্রবণতা তৈরির পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘গেট রেডি উইথ মি’ বা তথাকথিত ‘গ্লাস স্কিন’ ত্বকের ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হয় অনেক শিশু ও কিশোরী। তারা তখন এমন সব স্কিনকেয়ার পণ্য ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যেগুলো মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি।

শিশুদের স্কিনকেয়ারের টিকটক। ছবি: সংগৃহীত

নিউইয়র্কের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ব্রুক এরিন ডাফি বলেন, ‘আগে স্কিনকেয়ার কোম্পানিগুলো মূলত ৩০ বা ৪০ বছর বয়সী নারীদের লক্ষ্য করে পণ্য বিক্রি করত। এখন এই চাপ তৈরি করা হচ্ছে শিশু ও কিশোরীদের ওপর। ফলে অল্প বয়সেই তারা নিজেদের চেহারা নিয়ে অযথা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে।’

কচি ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি

কিশোরীদের মধ্যে একটি বড় অংশই ইদানিং কোরিয়ানদের মতো চকচকে ‘গ্লাস স্কিন’ পাওয়ার জন্য মরিয়া।

টিকটকের ভিডিও বিশ্লেষণ করে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এই খুদে ইনফ্লুয়েন্সারদের স্কিনকেয়ার রুটিনের গড় খরচ প্রায় ২০ হাজার টাকা। যা প্রতি ৩ থেকে ৪ মাস পর পর পণ্য কেনার জন্য খরচ করতে হয়।

কিন্তু চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসল সমস্যা অন্য জায়গায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওতে দেখা এসব প্রসাধনী সামগ্রী ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করেছেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ডার্মাটোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম।

তার মতে, ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের ভিডিও বা বিজ্ঞাপনে যেসব পণ্য দেখা যায় সেগুলোর কোনো গ্যারান্টি নেই এবং এগুলো মোটেও নির্ভরযোগ্য নয়।

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, 'মেয়েরা প্রায়ই অন্যদের এসব ব্যবহার করতে দেখে প্রভাবিত হয়ে কিনে ফেলছে। কিন্তু বাস্তবে ত্বক ঠিক রাখতে এগুলোর কোনো কার্যকারিতা নেই।'

'আমার কাছে এমন অনেকে আসেন। তারা স্বীকার করেন যে ফেসবুকে দেখে প্রলোভনে পড়ে ক্রিম ও অন্যান্য পণ্য কেনেন। অনেকে ঢাকা গিয়ে কিনে নিয়ে আসেন। পরে ত্বকে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। তখন তারা আমাদের কাছে আসেন,' বলেন এই চিকিৎসক।

তার ভাষ্য, যারা গ্যারান্টিহীন এসব পণ্য ব্যবহার করেন, তাদের ত্বক ভালো হওয়ার বদলে উল্টো স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ত্বকের সুরক্ষায় এ ধরনের বিভ্রান্তিকর অনলাইন বিজ্ঞাপন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

ব্রিটিশ চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও এনএইচএস কনসালট্যান্ট ডা. জিন আয়ার বলেন, ‘শিশুদের ত্বক স্বাভাবিকভাবেই কোমল ও সুস্থ থাকে। প্রাকৃতিকভাবেই তাদের ত্বকে ময়েশ্চার থাকে, যা ক্ষতিকর উপাদান দূরে রাখে। এটাই তারুণ্য ও ত্বকের আসল সৌন্দর্য। তাই অ্যান্টি-এজিং বা বয়সের ছাপ কমানোর জন্য তৈরি পণ্যের কোনো প্রয়োজন তাদের নেই।’

ডা. আয়ার প্রায় ২০ বছর ধরে চিকিৎসা দিচ্ছেন। তিনি জানান, আজকাল ৮ বছরের শিশুরাও ত্বকে মারাত্মক অ্যালার্জি বা রিঅ্যাকশন নিয়ে তার চেম্বারে যাচ্ছে। প্রসাধনী ব্যবহারের কারণে শিশুদের ত্বকে ব্রণ ও প্রদাহের ঘটনাও বেড়েছে।

রেটিনলের কারণে ত্বকে র‌্যাশ ও জ্বালাপোড়া হয়। ছবি: সংগৃহীত

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এই পণ্যগুলো তৈরিই করা হয়েছে বয়স্কদের জন্য, যেন তাদের বলিরেখা বা বয়স লুকানো যায়। শিশুদের এই পণ্যগুলোর কোনো প্রয়োজনই নেই। উল্টো এগুলোতে থাকা কড়া রাসায়নিক উপাদান শিশুদের কোমল ত্বকে স্থায়ী ক্ষতি করছে।’

বিশেষ করে রেটিনল নামের উপাদানটি শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানান তিনি। এটি ব্যবহারের ফলে শিশুদের ত্বক পুড়ে যাওয়ার মতো ক্ষতি হয়, যাকে চিকিৎসকরা ‘রেটিনল বার্ন’ বলছেন।

এছাড়া রেটিনলযুক্ত পণ্য ব্যবহারের ফলে ত্বকে জ্বালাপোড়া, র‍্যাশ, তীব্র চুলকানি ও একজিমার মতো সমস্যা এমনকি দীর্ঘমেয়াদি সংবেদনশীলতাও তৈরি হতে পারে।

এমনকি অল্প বয়সে অতিরিক্ত ফেসক্রিম মাখার কারণে অনেকের কপালের সামনের অংশের চুল পড়ে যাওয়ার (ফ্রন্টাল ফাইব্রোসিং অ্যালোপেসিয়া) লক্ষণও দেখা যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন ডা. জিন আয়ার।

যেভাবে বিঘ্নিত হতে পারে মানসিক বিকাশ

শিশু-কিশোরীরা যখন নিজেদের চেহারাকে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা তথাকথিত 'নিখুঁত' সৌন্দর্য যেমন, গ্লাস স্কিনের সাথে তুলনা করে, তখন তারা নিজেদের অপর্যাপ্ত মনে করে এবং গভীর হীনমন্যতায় ভোগে বলে মনে করেন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার ডেইলি স্টারকে বলেন, অন্যের মতো হওয়ার চেষ্টার ফলে নিজস্ব পরিচয় বা স্বকীয়তা গড়ে ওঠে না।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘ধরেন কোনো কিশোরীর চুল কোকড়া, কিন্তু সে ইনস্টাগ্রামে দেখলো তার স্ট্রেইট চুলের বান্ধবীর ছবিতে বেশি লাইক ও কমেন্টস পড়ছে। তখন স্বাভাবিকভাবেই তার নিজের কোকড়া চুল আর ভালো লাগবে না। আর এভাবে যখন কোনো শিশু বা কিশোর-কিশোরী তার সৌন্দর্যের জন্য অন্যের “লাইক” ওপর নির্ভর করে, তখন তার স্থায়ী ও প্রকৃত আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে না।’

মেখলা সরকার আরও বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় কে তাকে লাইক দিল বা কে কমেন্ট করল, তার ওপর ওই শিশু বা কিশোরীর 'সেলফ-এস্টিম' নির্ভর করে। এটি তাদের মানসিকভাবে ভঙ্গুর করে তোলে। তারা তাদের শরীর বা চেহারা নিয়ে অতিরিক্ত সচেতন হয়ে পড়ে। অনেক সময় তারা কোরিয়ান বা বিদেশি তারকাদের সৌন্দর্যের মানদণ্ডকে আদর্শ মানে, যা আমাদের দেশের মানুষের জেনেটিক গঠনের সাথে মেলে না।

তার মতে, কম বয়সে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার এবং এ ধরনের বিজ্ঞাপনের প্রভাব থেকে এই শিশু বা কিশোরীদের দূরে রাখা প্রয়োজন

ইতালির মনোবিজ্ঞানী আলবার্তো স্টেফানা বলেন, ‘কসমেটিকোরেক্সিয়া নামক এই মানসিক সমস্যার সঙ্গে বডি ডিসমর্ফিক ডিসঅর্ডারের (বিডিডি) গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এটি এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে মানুষ নিজের শরীরের কোনো কাল্পনিক বা সামান্য খুঁত নিয়ে তীব্র হীনমন্যতা ও উদ্বেগে ভোগে। তারা নিজেদের বাস্তব চেহারার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা ফিল্টার করা বা কৃত্রিমভাবে সম্পাদিত ছবির তুলনা করে।

অনেক সময় শিশুরাও এই লজ্জায় কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে চায় না।

লন্ডন ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক জেসিকা রিংরোজ বলেন, ‘শিশুরা যখন ইন্টারনেটের এই রঙিন জগৎ দেখে, তখন তারা ভাবে এটাই বুঝি ‘আদর্শ জীবন’। আর যখন তারা নিজেদের সেই অতি-নিখুঁত রূপ দিতে পারে না, তখন তারা নিজেদের ব্যর্থ মনে করতে শুরু করে।’
 

কী বলছে প্রসাধনী শিল্প

প্রসাধনী শিল্পের প্রতিনিধিরাও স্বীকার করেছেন যে, শিশুদের জন্য বয়স উপযোগী পণ্য ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা প্রয়োজন।

যুক্তরাজ্যের কসমেটিকস, টয়লেট্রি অ্যান্ড পারফিউমারি অ্যাসোসিয়েশন (সিটিপিএ) সম্প্রতি অভিভাবকদের জন্য একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে।

সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী ডা. এমা মেরেডিথ বলেন, তারা শিশুদের অ্যান্টি-এজিং পণ্য ব্যবহারের পক্ষে নয়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে শিশুদের সামনে এমন একটি সৌন্দর্যের মানদণ্ড তুলে ধরা হচ্ছে, বাস্তবে যার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন।

ডা. মেখলা সরকার বলেন, প্রসাধন কোম্পানিগুলো মূলত ১৩-১৪ বছরের কিশোর-কিশোরীদের লক্ষ্য করে তাদের বিজ্ঞাপন তৈরি করে। কারণ, একজন ৩০ বছর বয়সী মানুষের তুলনায় এই বয়সের মেয়েদের প্রভাবিত করা অনেক সহজ। সোশ্যাল মিডিয়ায় শিশুদের ব্যবহার করেই এসব প্রসাধনের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, যা দেখে অন্য শিশুরা ইনফ্লুয়েন্সড হয়।

 

যদিও টিকটক কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা রেখেছে এবং ১৮ বছরের কম বয়সীদের লক্ষ্য করে কোনো বিজ্ঞাপন দেখায় না।

বিশেষজ্ঞ মত হলো, শিশুদের ত্বকের যত্ন প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেটি হওয়া উচিত বয়স উপযোগী ও চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী।

যেহেতু কোম্পানিগুলো তাদের লাভের জন্য বিজ্ঞাপন দেবেই, তাই সন্তানদের এই প্রসাধনের মোহ এবং বিজ্ঞাপনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে রক্ষা করতে অভিভাবকদের সচেতনতাই সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন ডা. মেখলা সরকার।