ফ্রিদা কাহলোর ছবির হামিংবার্ড, বানর আর কালো বিড়াল কী গল্প বলে?
গলায় কাঁটার মালা। কাঁটার খোঁচায় ক্ষত, সেখান থেকে চুঁইয়ে পড়ছে রক্ত। মালার সঙ্গে ঝুলছে নিথর একটি হামিংবার্ড। এক কাঁধের পেছনে কালো বিড়াল, অন্য পাশে স্পাইডার মাঙ্কি বা মাকড়সা বানর। মাথার ওপর প্রজাপতি আর ড্রাগনফ্লাইয়ের মতো রহস্যময় কিছু অবয়ব।
১৯৪০ সালে আঁকা ফ্রিদা কাহলোর বিখ্যাত ছবি ‘আনটাইটেলড সেলফ-পোর্ট্রেট উইথ থর্ন নেকলেস অ্যান্ড হামিংবার্ড’। প্রথম দেখায় ছবির এসব উপাদান অলংকরণ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে সেগুলোতে ধরা পড়ে শিল্পীর ব্যক্তিগত যন্ত্রণা, প্রেম ও বিচ্ছেদ, মানসিক শক্তি এবং প্রকৃতির সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক।
মেক্সিকান চিত্রশিল্পী ফ্রিদা কাহলো ১৯৫৪ সালে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে মারা যান। মৃত্যুর পরও তার জনপ্রিয়তা ক্রমেই বেড়েছে। এখন শিল্পের জগৎ ছাড়িয়ে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও তিনি এক অনন্য প্রতীক। তার স্বতন্ত্র চেহারা ও শিল্পকর্ম আধুনিক শিল্পী থেকে শুরু করে অধিকারকর্মীদেরও অনুপ্রাণিত করে। তার ছবি ও চেহারা এখন দেখা যায় নানা পণ্যেও।
কাহলোর জীবন ছিল শারীরিক যন্ত্রণা আর আবেগের টানাপোড়েনে ভরা। শৈশবে পোলিও হয়েছিল তার। ১৮ বছর বয়সে পড়েন ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায়। সেই দুর্ঘটনার ক্ষত তাকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে সারা জীবন। চিত্রশিল্পী দিয়েগো রিভেরার সঙ্গে দাম্পত্যও ছিল অস্থির। তার জীবনের এসব প্রেম, বিচ্ছেদ, শারীরিক কষ্ট ও আকাঙ্ক্ষা বারবার উঠে এসেছে আত্মপ্রতিকৃতিতে।
নিজের জীবনের সৌন্দর্য, যন্ত্রণা ও আকাঙ্ক্ষাকে যেভাবে অনুভব করেছেন, কোনো রাখঢাক ছাড়াই তা ক্যানভাসে তুলে ধরেছেন কাহলো। এভাবেই আত্মপ্রতিকৃতির প্রচলিত ধারণাকে নিজের মতো করে বদলে দিয়েছিলেন তিনি।
কাহলো মোট ৫৫টি আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছিলেন। প্রাণীর প্রতি ছিল তার আজীবনের ভালোবাসা। তাই অনেক ছবিতেই প্রাণীরা এসেছে তার সঙ্গী হয়ে, কখনো আবার প্রতীক হয়ে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লন্ডনের টেট মডার্নে ‘ফ্রিদা: দ্য মেকিং অব অ্যান আইকন’ নামে নতুন এক প্রদর্শনীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ১৯৪০ সালের এই আত্মপ্রতিকৃতি।
বিচ্ছেদের সময় আঁকা ছবি
ছবিটি আঁকার সময় কাহলোর ব্যক্তিগত জীবনে তীব্র টানাপোড়েন চলছিল। দিয়েগো রিভেরার সঙ্গে তখন তার বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। যদিও একই বছরের শেষ দিকে তারা আবার বিয়ে করেন। একই সময়ে মার্কিন আলোকচিত্রী নিকোলাস মুরের সঙ্গে কাহলোর দীর্ঘদিনের প্রেমও ভাঙনের মুখে ছিল।
ছবিটির দিকে তাকালে বোঝা যায়, কেন্দ্রে কাহলো। পেছনটা ভরা ঘন সবুজ পাতায়। যেন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় কোনো বনের মধ্যে বসে আছেন তিনি। চারপাশের প্রাণীগুলোর গাঢ় রঙের বিপরীতে সবুজ পাতাগুলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
কালো বিড়ালটির চোখ চকচক করছে। পিঠ বাঁকানো ও পশম খাড়া, যেকোনো মুহূর্তে যেন ঝাঁপিয়ে পড়বে। অন্য পাশে বানরটি ব্যস্ত কাহলোর কাঁটার মালা নিয়ে। আর এত কিছুর মাঝেও কাহলোর মুখ আশ্চর্য রকম স্থির। গলার ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে, কিন্তু মুখে যন্ত্রণার প্রকাশ নেই।
টেট মডার্নের কিউরেটর টোবিয়াস অস্ট্রান্ডার বিবিসিকে বলেন, দর্শকের দিকে কাহলোর সরাসরি তাকিয়ে থাকার ধরনটি বিশেষভাবে চোখে পড়ে। সেই দৃষ্টিতে আক্রমণাত্মক ভাব নেই, আবার দ্বিধা বা সংকোচও নেই।
হামিংবার্ডে হারানো প্রেম?
কাহলোর গলায় কাঁটার মালার সঙ্গে ঝুলে থাকা হামিংবার্ডটি ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
হামিংবার্ডকে ঐতিহ্যগতভাবে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। মেক্সিকোর অ্যাজতেক সংস্কৃতিতে যুদ্ধের দেবতার সঙ্গেও এই পাখির যোগ আছে। কিন্তু কাহলোর ছবিতে পাখিটি প্রাণহীন।
অস্ট্রান্ডার বলেন, এর পেছনে আরেকটি লোকজ বিশ্বাসও কাজ করে থাকতে পারে। হারানো প্রেম ফিরে পাওয়ার তাবিজ হিসেবে হামিংবার্ড ব্যবহারের একটি ঐতিহ্য ছিল।
পাখিটির আকৃতির সঙ্গে কাহলোর স্বতন্ত্র জোড়া ভ্রুর আকৃতিরও মিল দেখেন অস্ট্রান্ডার। যেন হামিংবার্ডটির মধ্যেও নিজের কিছুটা ছায়া রেখে দিয়েছেন কাহলো।
বানর কি রিভেরার দেওয়া যন্ত্রণার প্রতীক?
কাহলোর ডান কাঁধের পাশে রয়েছে তার পোষা বানর। দিয়েগো রিভেরা তাকে প্রাণীটি দিয়েছিলেন।
ছবিতে বানরটিকে দেখা যায় কাহলোর কাঁটার মালা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে। আর সেই কাঁটাই তার গলায় ক্ষত তৈরি করে রক্ত ঝরাচ্ছে।
অস্ট্রান্ডারের ব্যাখ্যায়, বানরটি তাই রিভেরার সঙ্গে সম্পর্ক থেকে পাওয়া কাহলোর মানসিক যন্ত্রণার প্রতীকও হতে পারে।
তবে বানরের অর্থ শুধু এটুকু নয়। প্রাক-হিস্পানিক সংস্কৃতিতে স্পাইডার মাঙ্কি ছিল অদম্য সৃজনশীলতা, খেলাধুলাপ্রবণতা ও উর্বরতার প্রতীক।
ফলে একই বানরের মধ্যে মিশে থাকতে পারে ব্যক্তিগত স্মৃতি, যন্ত্রণা এবং বহু পুরোনো সাংস্কৃতিক অর্থ।
কালো বিড়াল কি অশুভ, নাকি রক্ষাকর্তা?
কাহলোর বাঁ কাঁধের পেছনে কালো বিড়ালটি প্রথম দেখায় অশুভ কিছুর ইঙ্গিত বলেই মনে হতে পারে। চকচকে চোখ ও টানটান শরীরে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে আছে এটি।
কিন্তু অস্ট্রান্ডারের মতে, বিড়ালটিকে শুধু দুর্ভাগ্যের প্রতীক হিসেবে দেখলে ছবিটির আরেকটি সম্ভাব্য অর্থ বাদ পড়ে যায়। এটি কাহলোর রক্ষাকারী প্রাণী বা অভিভাবকসুলভ শক্তির প্রতীকও হতে পারে।
তাই একই ছবিতে পাশাপাশি ধরা পড়ে কাহলোর অসহায়তা আর শক্তি। তিনি আহত, গলা থেকে রক্ত ঝরছে। অথচ তার পাশেই যেন পাহারা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক রক্ষাকারী শক্তি।
মাথায় প্রজাপতি ও ড্রাগনফ্লাই
কাহলোর চুলে বেগুনি সুতা দিয়ে বিনুনি করা। সেখানে রয়েছে রুপালি প্রজাপতির পিন। বাস্তবেও তার কাছে এমন পিন ছিল।
এর ওপরে দেখা যায় ড্রাগনফ্লাইয়ের মতো কিছু ফুল। বাস্তবে এমন কোনো প্রাণী বা ফুল নেই। অস্ট্রান্ডারের চোখে এগুলো ছবিটির রূপক বা ম্যাজিক রিয়ালিস্ট উপাদান।
মেক্সিকোর আদিবাসী সংস্কৃতিতে প্রজাপতি ও ড্রাগনফ্লাই—দুটিই আত্মার পুনর্জন্মের ধারণার সঙ্গে যুক্ত। ছবির এমন ছোট ছোট উপাদানেও বোঝা যায়, কত বিচিত্র সাংস্কৃতিক সূত্র নিজের কাজে মিলিয়ে দিয়েছিলেন কাহলো।
এসব প্রতীকে কাহলোর মেস্তিজা পরিচয়ের ছাপও আছে। মেস্তিজা বলতে আদিবাসী মেক্সিকান ও ইউরোপীয়দের মিশ্র ঐতিহ্যকে বোঝায়।
অন্যদিকে গলার কাঁটার মালায় আছে খ্রিষ্টীয় আত্মত্যাগ এবং মেক্সিকোর ঔপনিবেশিক যুগের ধর্মীয় চিত্রকলার ইঙ্গিত।
অস্ট্রান্ডার বলেন, সেই সময় একজন নারী শিল্পীর নিজেকে খ্রিষ্টের মতো যন্ত্রণার প্রতীকে তুলে ধরা ছিল অত্যন্ত সাহসী কাজ।
‘আমি কখনো স্বপ্ন আঁকিনি’
কাহলোর ছবিতে প্রাণীর উপস্থিতিকে অনেক সময় ‘এক্সোটিক’ বা পরাবাস্তব বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু কাহলো নিজে তার কাজকে পরাবাস্তববাদী মনে করতেন না।
১৯৫৩ সালে টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, মানুষ পরাবাস্তববাদী মনে করলেও তিনি তা ছিলেন না। তিনি স্বপ্নের বদলে নিজের বাস্তবতাই এঁকেছেন। আর সেই বাস্তব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল প্রাণীরা।
মেক্সিকো সিটির কাছেই কাসা আজুলে বেড়ে ওঠার সময় থেকেই কাহলোর চারপাশে নানা প্রাণী ছিল। শৈশবে পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ সময় তাকে শয্যাশায়ী থাকতে হয়েছিল। তখন প্রাণীরা তাকে সঙ্গ দিয়েছে।
১৮ বছর বয়সে ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় তার শরীর গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণা হয়ে ওঠে জীবনের অংশ। সেই সময়েও প্রাণীরা ছিল তার সঙ্গী ও সান্ত্বনার উৎস।
বড় হওয়ার পর কাহলো স্পাইডার মাঙ্কি, নানা পাখি, মেক্সিকান লোমহীন কুকুর ও হরিণসহ অনেক প্রাণী পুষতেন। এসব প্রাণীর থাকার জন্য পিরামিডের মতো একটি কাঠামোও তৈরি করেছিলেন রিভেরা।
কখনো প্রাণীর সঙ্গে একাকার কাহলো
নিজের ছবিতে কাহলো বারবার পোষা প্রাণীদের পাশে নিজেকে এঁকেছেন। উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ১৯৩৮ সালের ‘সেলফ-পোর্ট্রেট উইথ মাঙ্কি’ এবং ১৯৪১ সালের ‘মি অ্যান্ড মাই প্যারট’।
কখনো আবার মানুষ আর প্রাণীর সীমারেখাই মুছে দিয়েছেন তিনি।
১৯৪৬ সালের ‘দ্য উন্ডেড ডিয়ার’ ছবিতে একটি হরিণের শরীরে দেখা যায় কাহলোর মুখ। হরিণটির শরীর বিদ্ধ একের পর এক তীরে।
ছবিটির নিচে লেখা ‘কারমা’ বা কর্ম। এখানে যন্ত্রণাকে কাহলো যেন জীবনের অনিবার্য নিয়তির অংশ হিসেবেই দেখেছেন।
প্রদর্শনী নিয়ে লেখা এক প্রবন্ধে বিয়াত্রিজ গার্সিয়া-ভেলাস্কো বলেন, কাহলোর আঁকা ক্ষতগুলো সেন্ট সেবাস্তিয়ানের চিত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়। এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় তার আজীবনের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও যন্ত্রণা। কিন্তু সেই যন্ত্রণার মাঝেও প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে তিনি খুঁজে পেয়েছেন শক্তি ও আরোগ্য।
পোষা প্রাণীরা কি তার সন্তানের বিকল্প ছিল?
কাহলোর প্রাণীগুলো নিয়ে একটি বহুল প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো, তারা ছিল তার আকাঙ্ক্ষিত সন্তানের বিকল্প। সন্তান হারানোর বেদনাও নিজের শিল্পে অকপটে তুলে ধরেছেন কাহলো।
তবে অস্ট্রান্ডার বলেন, প্রাণীদের সঙ্গে তার সম্পর্ককে শুধু এই একটি ব্যাখ্যায় আটকে দেওয়া অতিসরলীকরণ।
১৯৪৯ সালের ‘দ্য লাভ এমব্রেস অব দ্য ইউনিভার্স, দ্য আর্থ (মেক্সিকো), মাইসেলফ, দিয়েগো অ্যান্ড সেনিয়র শোলোটল’ ছবিতে বরং কাহলো স্বামী রিভেরাকেই শিশুর মতো নগ্ন অবস্থায় কোলে ধরে রেখেছেন। তার পায়ের কাছে রয়েছে প্রিয় কুকুর সেনিয়র শোলোটল। অ্যাজতেক পুরাণের একটি চরিত্রের নামে কুকুরটির নাম রাখা হয়েছিল।
অস্ট্রান্ডার বলেন, প্রাণীগুলো ছিল কাহলোর ভালোবাসা ও স্নেহ প্রকাশেরও একটি জায়গা। শারীরিক অবস্থার কারণে অনেক সময় বাড়িতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হতো তাকে। সেই বাড়িই ধীরে ধীরে নূহের নৌকার মতো হয়ে উঠেছিল তার নিজস্ব এক জগৎ।
কখনো প্রাণীগুলো এসেছে সন্তানের প্রতীক হয়ে, কখনো আবার কাহলোর চারপাশের তারুণ্য, প্রাণশক্তি আর সঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করেছে।
যন্ত্রণার মধ্যেও জীবনের প্রতি টান
জীবনের শেষ পর্যন্ত শারীরিক যন্ত্রণা কাহলোর পিছু ছাড়েনি। ১৯৫৩ সালে গুরুতর গ্যাংগ্রিনের কারণে তার ডান পা কেটে ফেলতে হয়।
এরপর ডায়েরিতে তিনি লিখেছিলেন, উড়ে যাওয়ার জন্য যদি ডানা থাকে, তাহলে পা দিয়ে কী হবে?
এই মনোভাবই যেন কাহলোর আত্মপ্রতিকৃতিগুলোর মূল শক্তি। সবচেয়ে যন্ত্রণাময় ছবিগুলোতেও তাই আছে তীব্র জীবনীশক্তি।
নিজের জীবন নিয়ে কাহলো একবার বলেছিলেন, তিনি অসুস্থ নন, তিনি ভেঙে গেছেন। কিন্তু যত দিন ছবি আঁকতে পারবেন, তত দিন বেঁচে থাকতে পেরে তিনি আনন্দিত।
তাই তার ছবির হামিংবার্ড, বানর, কালো বিড়াল, প্রজাপতি কিংবা হরিণ কেবল প্রাণী নয়। কখনো তারা প্রেম আর বিচ্ছেদের ভাষা, কখনো যন্ত্রণা আর মৃত্যুর। আবার কখনো তারা সুরক্ষা, স্বাধীনতা, পুনর্জন্ম আর বেঁচে থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।