এক্সপ্লেইনার

যে কারণে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে পুরনো বইয়ের বিক্রি

স্টার অনলাইন ডেস্ক

হঠাৎ করেই গোটা বিশ্বে পুরনো ও আগে ব্যবহার করা বইয়ের চাহিদা বেড়ে গেছে।

গত কয়েক মাসে বই বিক্রেতারা এ বিষয়টি লক্ষ্য করছেন। পুরনো বই কেনার অসংখ্য অর্ডার পাচ্ছেন তারা। একসঙ্গে হাজারো কপি উপন্যাস দূরবর্তী কোনো গুদামে পাঠানোর নির্দেশনা মানতে হচ্ছে তাদের।

অনেকের ধারণা, এই নজিরবিহীন চাহিদার নেপথ্যে আছে এআই প্রযুক্তি।

সাত দিনের বিক্রি এক দিনেই

নর্থাম্বারল্যান্ডের বার্টার বুকস নামের বইয়ের দোকানের মালিক স্টুয়ার্ট ম্যানলি বিবিসিকে জানান, তিনি সাধারণত প্রতি সপ্তাহে দুই-তিন হাজার বই বিক্রি করে থাকেন।

তবে সম্প্রতি তিনি একটি কানাডীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে অসংখ্য বইয়ের অর্ডার পান। সংখ্যা উল্লেখ না করে স্টুয়ার্ট জানান, সাত দিনেও তিনি এত বই বিক্রি করতে পারেন না।

তিনি বলেন, ‘৩০ বছর ধরে পুরনো বইয়ের ব্যবসায় আছি। এরকম ঘটনা এর আগে কখনো দেখিনি।’

স্টুয়ার্টই একমাত্র বিক্রেতা নন, যিনি এ ধরনের ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বই বিক্রেতারা একই ধরনের ঘটনার কথা জানিয়েছেন।

তাদের অনেকেই জানেন না, বিক্রি করা বই শেষ পর্যন্ত কোথায় বা কার হাতে পৌঁছাবে।

সন্দেহ করা হচ্ছে, আগ্রহী পাঠক নয়, এসব বই চলে যাবে নতুন তথ্যের উৎসের জন্য বুভুক্ষু হয়ে থাকা ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ বা এআইয়ের কাছে।

উত্তর লন্ডনে ওয়ালডেন বুকস পরিচালনা করেন ডেভিড টোবিন। তার দোকানেও সম্প্রতি অস্বাভাবিক ধরনের বিক্রি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে বিক্রি হয়নি এমন কিছু বই বিক্রি করতে পেরে ভালো লাগছে। তবে শেষ পর্যন্ত সেগুলো ধ্বংস করে ফেলা হলে তা দুঃখজনক হবে।’

বই নিয়ে আইনি লড়াই

যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালতের রায় থেকে এ বিষয়টি সম্পর্কে সামান্য আভাস পাওয়া যায়।

এআই সফটওয়্যারকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য গণহারে পুরনো বই কেনা কোনো অবৈধ কাজ নয়—এমন রায় দেন মার্কিন বিচারক। ঘটনাটি ২০২৫ সালের।

এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের বিরুদ্ধে তিনজন লেখক মামলা করেছিলেন। ওই মামলার রায়ে বিচারক উইলিয়াম অ্যালসাপ উল্লেখ করেন, সমাজে বৈপ্লবিক রূপান্তর আনবে এমন উদ্যোগে ওই লেখকদের বইগুলো ব্যবহার করছে অ্যানথ্রপিক। যার ফলে বাদী লেখকদের মামলা বাতিল করে দেন বিচারক।

গত মাসে ওই বিচারিক কার্যক্রম-সংক্রান্ত আদালতের নথি প্রকাশ করা হলে জানা যায়, অ্যানথ্রপিকের এআই চ্যাটবট ক্লডকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য হাজারো পুরনো বই কেনা হলেও সেগুলো ‘কাজ শেষে’ ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে।

“ক্লডকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় উন্মুক্ত ওয়েব ডেটা, বাণিজ্যিকভাবে সংগৃহীত বিভিন্ন ডেটাসেট এবং আমরা নিজেরা তৈরি করা ডেটার সমন্বয়ে,” বলেন এক মুখপাত্র।

তারা জোর দিয়ে বলেন, এআই প্রশিক্ষণের জন্য বই সংগ্রহ করা এই খাতে খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়।

তারা আরও বলেন, ‘আমাদের কোনো ডেটা সংগ্রহ কর্মসূচিতে বিরল বা প্রাচীন বই কিনে ধ্বংস করা হয় না।’

তবু এআই ইঞ্জিনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর বিপুল পরিমাণ পুরনো বই কাগজের মণ্ডে পরিণত করে ধ্বংস করা হচ্ছে—এমন ধারণা বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি করছে।

স্ক্যান করেই বই ধ্বংস?

অ্যানথ্রপিকের মামলাসংক্রান্ত আদালতের নথিতে জানা যায়, পুরনো বই সংগ্রহ করে এআইয়ের প্রশিক্ষণে যুক্ত করার এই প্রকল্প নিয়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা নিয়মিত একে অপরের সঙ্গে বার্তা বিনিময় করতেন। এ সময় তারা একে ‘পানামা প্রকল্প’ বলে উল্লেখ করেন।

নথিতে বলা হয়েছে, অ্যানথ্রপিকের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল ‘বিশ্বের সব বই স্ক্যান করে ধ্বংস করে ফেলা’।

ইংরেজিতে ‘ডেস্ট্রাক্টিভ স্ক্যানিং’ বা ধ্বংসাত্মক স্ক্যানিং নামের এই প্রক্রিয়ায় বই এমন স্থানে পাঠানো হয়, যেখানে বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ায় অসংখ্য বইয়ের ডিজিটাল রূপান্তর করা সম্ভব।

সব পৃষ্ঠা দ্রুত স্ক্যান করার সুবিধার্থে এর বাঁধাই খুলে ফেলা হয়। এর ফলে চাইলেও এই বইগুলো আর পাঠকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার উপায় থাকে না। স্ক্যানের পর বইগুলোর পুনঃচক্রায়ন করা হয়।

বার্টার বুকসের ম্যানলি বলেন, ‘প্রজেক্ট পানামাকে ঘিরে অনেক রহস্য রয়েছে।’

‘নামটি আমার কাছে নতুন, তবে প্রকল্পটির বাস্তবতা নতুন নয়। বই বিক্রেতাদের বিভিন্ন ফোরামে এটি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে’, যোগ করেন তিনি।

তার বইগুলো এই প্রকল্প বা অন্য এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর এ ধরনের কোনো প্রকল্পের জন্য কেনা হচ্ছে কি না, তা তিনি জানেন না।

তবে তিনি বলেন, এসব বিক্রির হিসাব রাখাও কঠিন। কারণ বিক্রিগুলো এমনভাবে হচ্ছে, যার ‘সুনির্দিষ্ট কোনো ধরন বা যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না’।

বিক্রি হওয়া বইয়ের মধ্যে দুর্লভ বা অপ্রচলিত লাতিন ভাষার বই থেকে শুরু করে কাউবয় উপন্যাসও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বইগুলোর বিষয়বস্তুর এই বৈচিত্র্যও এআইয়ের দিকে ইঙ্গিত করে।

কারণ কিছুটা ভিন্ন ধরনের এবং অপেক্ষাকৃত দুর্লভ বইয়ের লেখাগুলো চ্যাটবটের মতো জেনারেটিভ এআই টুলের প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার হতে পারে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাস্বত্ব বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এমিলি হাডসন বলেন, যুক্তরাজ্যের কপিরাইট আইন যুক্তরাষ্ট্রের আইন থেকে ভিন্ন।

তিনি বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে মূল বিষয়টি হলো, এ ধরনের সব ধরনের কপি করার কাজ করার আগে কপিরাইটের মূল মালিকের অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন। এআই প্রশিক্ষণ দেওয়া বা প্রশিক্ষণের জন্য লাইব্রেরি তৈরি করার মতো কাজও এর অন্তর্ভুক্ত।’

নৈতিক উদ্বেগ

বই বিক্রেতাদের জন্য বিষয়টি একটি নৈতিক সংকট তৈরি করেছে।

বই ধ্বংস করার ধারণায় তারা অস্বস্তি বোধ করছেন। যদিও তারা স্বীকার করেন, সব বই সংরক্ষণ করা জরুরি নয়।

এডিনবরার ম্যাকনটাস বইয়ের দোকানের মালিক ডেরেক ওয়াকার বিবিসিকে বলেন, ‘সম্প্রতি প্রকাশিত কোনো অ্যাকাডেমিক বই যদি মাত্র ১০০ কপি প্রকাশিত হয়ে থাকে এবং এর মধ্যে ৭৫টি ইতোমধ্যে বিভিন্ন লাইব্রেরিতে থাকে, তাহলে বাজারে সেটি খুবই দুর্লভ হতে পারে। তবে এর একটি কপি ধ্বংস হয়ে গেলে হয়তো খুব বড় ক্ষতি হবে না।’

‘কিন্তু আমাদের কাছে এমন বইও রয়েছে এবং আমরা এমন বই বিক্রিও করেছি, যার একটি মাত্র সংস্করণের একটি মাত্র কপি তখন পর্যন্ত টিকে ছিল’, বলেন তিনি।

তিনি মত দেন, ‘এত দীর্ঘ সময় টিকে থাকার পর এ ধরনের কোনো বই শুধু (স্ক্যান করে) ধ্বংস করার জন্য কেনা হলে সেটা অনেক বড় সমস্যা তৈরি করবে।’

বই ব্যবসায়ী ম্যানলি বলেন, ‘অনেক বইয়ের ক্ষেত্রে পুনঃচক্রায়ন একটি ভালো সমাধান হতে পারে। বিশেষ করে যেসব বই মানুষ আর নিজেদের বুকশেলফে রাখতে চান না। এতে সার্বিকভাবে বইয়ের ব্যবসা গতিশীলও হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বইগুলো শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে এবং সেগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে কারও কারও নৈতিক উদ্বেগ থাকতে পারে।’

কিন্তু বিশ্বের এখন আর ‘দা ভিঞ্চি কোড’ বইটির ৫০ লাখ কপির প্রয়োজন নেই—মত দেন তিনি।

‘আমি এমন বইয়ের বিজ্ঞাপন অনলাইনে ২০ বছর ধরে দিয়ে আসছি, যেগুলো এখন পর্যন্ত এক কপিও বিক্রি হয়নি’, যোগ করেন তিনি।