ইরানের লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যের যেসব মার্কিন ঘাঁটি
ইরানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এ অবস্থায় আবারও নতুন করে সামরিক সংঘাতের মুখে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্য। এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি আগেই দিয়েছিল তেহরান।
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইতোমধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে প্রতিশোধমূলক পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্স ও সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলোর অবস্থান ও ভূমিকা তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
আল জাজিরা জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে কমপক্ষে ১৯টি স্থানে স্থায়ী ও অস্থায়ী ঘাঁটিতে ৪০-৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
এর মধ্যে স্থায়ী ঘাঁটি ৮টি। এগুলো রয়েছে বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), ইরাক, সৌদি আরব ও জর্ডানে।

বাহরাইন
বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তর। এই বহরের আওতায় রয়েছে— পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর, আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের কিছু অংশ।
এই ঘাঁটিতে ৯ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে।
কাতার
রাজধানী দোহার বাইরে মরুভূমিতে অবস্থিত ২৪ হেক্টর আয়তনের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের ফরোয়ার্ড সদরদপ্তর। এই কমান্ড মিসর থেকে কাজাখস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। মধ্যপ্রাচ্যে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি, যেখানে প্রায় ১০ হাজার সেনা অবস্থান করে।
চলতি বছর জানুয়ারিতে এই ঘাঁটিতে আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা জোরদারে একটি নতুন সমন্বয় কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।
কুয়েত
কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বড় সামরিক স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে ক্যাম্প আরিফজান হলো ইউএস আর্মি সেন্ট্রালের ফরোয়ার্ড সদরদপ্তর। ইরাক সীমান্ত থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি ‘দ্য রক’ নামে পরিচিত।
এছাড়া ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় এই ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।
মার্কিন সেনাবাহিনীর ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এটি ইরাক ও সিরিয়ায় মোতায়েনের আগে সেনা ইউনিটগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি কেন্দ্র বা ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত
আবুধাবির দক্ষিণে অবস্থিত আল ধাফরা বিমানঘাঁটি ইউএস এয়ার ফোর্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আমিরাত বিমান বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবহৃত হয় এটি।
এই ঘাঁটিতে এফ-২২ এর মতো উন্নত বিমান, ড্রোন এবং সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে।
মার্কিন বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিরোধী অভিযানসহ গোটা অঞ্চলে নজরদারি ও সামরিক মিশনে সহায়তা করেছে এটি।
দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দর আনুষ্ঠানিক সামরিক ঘাঁটি না হলেও এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সবচেয়ে বড় ‘পোর্ট অব কল’ বা বন্দর। এখানে নিয়মিতভাবে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ভিড়ে।
ইরাক
পশ্চিম আনবার প্রদেশে অবস্থিত আইন আল আসাদ বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি রয়েছে। ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীকে সহায়তার পাশাপাশি ন্যাটো মিশনে অবদান রাখছে এটি।
২০২০ সালে ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর প্রতিশোধ নিতে এই ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল তেহরান।
উত্তর ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে এরবিল বিমানঘাঁটি মার্কিন ও মিত্রবাহিনীর প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও লজিস্টিক সমন্বয়ের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সৌদি আরব
২০২৪ সালে সৌদি আরবে মার্কিন সেনার সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৩২১ জন। তারা সৌদি সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার এবং মার্কিন সামরিক বিমান পরিচালনায় সহায়তা করে।
এর কিছু সেনা রাজধানী রিয়াদের প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে অবস্থান করছে। এখানে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ও থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন রয়েছে।
জর্ডান
রাজধানী আম্মান থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে আজরাকে অবস্থিত মুয়াফফাক আল সালতি বিমানঘাঁটিতে ইউএস এয়ার ফোর্সেস সেন্ট্রালের ৩৩২তম এয়ার এক্সপেডিশনারি উইং অবস্থান করছে। এখান থেকে লেভান্ত অঞ্চল বা পূর্ব ভূমধ্যসাগর বরাবর পশ্চিম এশিয়ায় বিভিন্ন মিশন পরিচালিত হয়।
এসব ঘাঁটির বাইরে তুরস্কে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ‘ইনজিরলিক’।
তুরস্কে ‘ইনজিরলিক’ ঘাঁটি
যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক যৌথভাবে এটি পরিচালনা করে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা মিশনের জন্য এটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়।

এই ঘাঁটিতে যুদ্ধবিমান, ট্যাঙ্কার ও কার্গো বিমানসহ ন্যাটোর বিভিন্ন ধরনের বিমান রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে এটি লজিস্টিক হাব ও ফরোয়ার্ড ঘাঁটি হিসেবে কাজ করে। গোয়েন্দা নজরদারি ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র মজুত রয়েছে বলে জানা গেছে। সংবাদ মাধ্যমের তথ্য মতে, আনুমানিক ২০ থেকে ৫০টি ‘মার্কিন বি-৬১’ নামে পারমাণবিক বোমা এই ঘাঁটিতে মজুদ রয়েছে।
ইরানের কাছে এই ঘাঁটির কৌশলগত অবস্থান আঞ্চলিক সংকটে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম।
বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্কে এই মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম।