ইরানে কেন হামলা চালাল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল, যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে?
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাত দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক হামলার পর উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই সংঘাত কয়েক দিনের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে লেবাননসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল কেন ইরানে হামলা চালিয়েছে এবং এই যুদ্ধ আরও কতদিন চলতে পারে, তা নিয়ে আজ এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি।
কী ঘটেছে
হামলার প্রথম ধাপেই তেহরানসহ বিভিন্ন এলাকায় ইরানের সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং নিরাপত্তা অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়।
ইসরায়েলি বাহিনীর দাবি, এসব হামলায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। পরে তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয় বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
ইরানের পাল্টা হামলা
হামলার জবাবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান।
কাতার, বাহরাইন, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতে বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। এসব হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন।
৬ মার্চ জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস ইন ইরান জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে অন্তত ১ হাজার ২০৫ জন বেসামরিক নাগরিক।
সংঘাত ছড়িয়েছে লেবাননেও
সংঘাত দ্রুত লেবাননেও ছড়িয়ে পড়ে। ২ মার্চ ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করলে ইসরায়েল পাল্টা বিমান হামলা চালায়।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী বৈরুতসহ বিভিন্ন এলাকায় চালানো হামলায় এখন পর্যন্ত ৮৩ শিশুসহ ৩৯০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
এই সংঘাতে এক লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
কেন হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দাবি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছিল, যা তাদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছিল।
দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের অভিযোগ, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই হামলাকে ‘প্রতিরোধমূলক সামরিক পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তবে ইরান বরাবরই দাবি করছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং তা জ্বালানি উৎপাদনসহ বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
আঞ্চলিক উত্তেজনা কেন বাড়ছে
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত শুধু ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম।
ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী এবং ইরাক ও সিরিয়ার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী।
এদের অনেকেই ইতোমধ্যে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে বা জড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।
এ কারণে আশঙ্কা করা হচ্ছে, সংঘাত আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় প্রভাব ফেলছে।
হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস সরবরাহ বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল প্রতিদিন এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনা এবং সৌদি আরবের একটি বড় তেল শোধনাগারও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এই অঞ্চলে ভ্রমণ করা কি নিরাপদ
এই যুদ্ধ কোভিড-১৯ মহামারির পর বৈশ্বিক ভ্রমণে অন্যতম বড় বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আকাশসীমা বন্ধ হয়ে গেছে এবং হাজারো ফ্লাইট স্থগিত হয়েছে।
৬ মার্চ ইতিহাদ এয়ারলাইনস ঘোষণা দেয়, আবুধাবি থেকে লন্ডন, ম্যানচেস্টার, বার্সেলোনা, ব্রাসেলস, ডাবলিন, রোম, প্যারিস ও মিলানে সীমিত ফ্লাইট চালু করা হবে।
আঞ্চলিক আকাশসীমা আংশিকভাবে খুলে দেওয়ার পর এমিরেটস এয়ারলাইনসও কিছু ফ্লাইট পুনরায় চালু করেছে।
৭ মার্চ কাতারের আকাশসীমা আংশিকভাবে খুলে দেওয়া হলে কাতার এয়ারওয়েজ জানায়, তারা নতুন ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা করছে। ৮ মার্চ দোহায় সীমিত ফ্লাইট পুনরায় চালু করা হয়।
যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে সংশ্লিষ্ট গন্তব্য সম্পর্কে পরামর্শ জানতে তাদের ওয়েবসাইট দেখে নেওয়া উচিত।
যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে
এই সংঘাত কতদিন স্থায়ী হতে পারে, তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমদিকে বলেছিলেন, এই সামরিক অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে।
পরে হোয়াইট হাউস জানায়, পরিস্থিতি বিবেচনায় অভিযান ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই সামরিক অভিযান চলবে।
মানবিক সংকটের আশঙ্কা
সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমার বড় অংশ আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে এবং হাজারো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে অঞ্চলজুড়ে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে লেবানন, সিরিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে শরণার্থী সংকট দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।