যুক্তরাষ্ট্র বলছে আলোচনা চলছে, ইরান বলছে না—সত্য কী?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জোর দিয়ে বলছেন যে, যুদ্ধ বন্ধ করতে ইরানের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনা চলছে। তবে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা বারবার ট্রাম্পের এ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের ডামাডোল ও দুই পক্ষের প্রচারণার মধ্যে কে সত্য বলছে বা কাকে বিশ্বাস করা যায়, তা বোঝা কঠিন।

তবে যুদ্ধ শেষ হলে কার কী লাভ বা ক্ষতি—এমন বিশ্লেষণ থেকে কিছুটা এসব বক্তব্য নিয়ে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছে সংবাদ মাধ্যম আলজাজিরা।

ট্রাম্পের দাবি

ট্রাম্প দাবি করেছেন, এক ‘শীর্ষ ইরানি’ কর্মকর্তার সঙ্গে ‘খুব ভালো’ আলোচনার পর ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য’ হয়েছে।

তার এই মন্তব্যের সময়টি ছিল গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রে সাপ্তাহিক ছুটির পর শেয়ারবাজার খোলার দিন। এমনকি হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানকে যে ৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন ট্রাম্প, সেটিও চলতি সপ্তাহের লেনদেন শেষ হওয়ার সময়ের সঙ্গে মিলে যায়।

অনেকেই এই সময়ের মিলকে ভিন্ন চোখে দেখছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে গত দুই সপ্তাহে তেলের দাম ওঠানামা করে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছানোর পর এ ধরনের মন্তব্য বাজারকে শান্ত রাখার কৌশল হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

একইসঙ্গে ট্রাম্পের আলটিমেটাম ও আলোচনার বার্তা দেওয়ার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে সেনা পাঠানোর ক্ষেত্রে হাতে কিছুটা সময়ও পাবে ওয়াশিংটন।

ইরানের অস্বীকার

ট্রাম্পের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, যাকে অনেকে ট্রাম্পের উল্লেখ করা সেই 'শীর্ষ কর্মকর্তা' বলে মনে করছেন।

গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। আর্থিক ও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যে চোরাবালিতে আটকা পড়েছে তা থেকে বাঁচতে "ফেক নিউজ" বা ভুয়া খবর প্রচার করা হচ্ছে।’

শেয়ার বাজার ও তেলের দামের ওপর যুদ্ধের প্রভাব শুধু ট্রাম্পের জন্য নয়, ইরানের জন্যও প্রাসঙ্গিক।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরানের কৌশল ভিন্ন। তারা চায় এ যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক অর্থনীতি চাপের মুখে পড়ুক, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলার বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ তৈরি হয়।

ফলে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার কথা বলে বাজার স্থিতিশীল রাখতে চাইছে, সেখানে আলোচনা অস্বীকার করে বাজারকে অস্থির রাখা এবং ট্রাম্প প্রশাসনকে স্বস্তি না দেওয়া ইরানের জন্য জরুরি।

যুক্তরাষ্ট্রের লাভ-ক্ষতি

আলোচনা আসলে হচ্ছে কি না বা কোন পর্যায়ে আছে, তা দুই পক্ষের প্রকাশ্য মন্তব্য থেকে বোঝা কঠিন। বরং প্রশ্ন হলো—এই মুহূর্তে আলোচনা বা যুদ্ধ বন্ধ হলে কার কী লাভ।

আল জাজিরার বিশ্লেষণ বলছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নেতানিয়াহুকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করা এই যুদ্ধের পরিণতি ও ইরানের সহনশীলতা কিছুটা অবমূল্যায়ন করেছিলেন ট্রাম্প।

গত সপ্তাহে তিনি বলেছিলেন, ‘তারা যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য সব দেশের পেছনে লাগবে, তা কেউ আশা করেনি।’

বাস্তবতার কারণে ট্রাম্প এখন যুদ্ধের খরচ ও ঝুঁকি উপলদ্ধি করছেন। তিনি এখন বুঝতে পারছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করলে তাকে আরও বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে।

ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমাতে ইরানি তেলের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। ২০১৯ সালের পর এই প্রথম ইরানি তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলো।

ইরানও বুঝতে পারছে যে, উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়ার কারণেই এই নতি স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে সামনে কংগ্রেস নির্বাচন। জ্বালানির দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপ পড়ছে, যা ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের জন্য ক্ষতিকর।

ফলে ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি পথ—যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি নেওয়া অথবা যুদ্ধ শেষ করে সমালোচনা সহ্য করা।

ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি

তবে যুদ্ধ শেষ করার সিদ্ধান্ত এখন পুরোপুরি ট্রাম্পের হাতে নেই। এক বছরের কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয়বার হামলার শিকার ইরান এখনই যুদ্ধ থামাতে আগ্রহী নয়। দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে যুদ্ধ শেষ করতে চায় না ইরান।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইরান তার রণকৌশল বদলেছে। তারা আর সংযম দেখাতে চায় না। টিকে থাকার স্বার্থে সংঘাত দীর্ঘায়ত করেই লাভ দেখতে পারে দেশটি।

ইরানের কট্টরপন্থীদের মতে, ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা ইন্টারসেপ্টরের মজুত কমে আসছে। ফলে সময় গড়ালে ইরানের হামলা আরও কার্যকর হতে পারে। তাই এখনই যুদ্ধ থামিয়ে ইসরায়েলকে সেই মজুদ পুনরায় গড়ে তোলার সুযোগ দেওয়া ঠিক হবে না বলে মনে করছেন তারা।

তবে ইরানও বড় ক্ষতির মুখে। ইতোমধ্যে দেড় হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি, অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে।

পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করছেন দেশটির মধ্যপন্থীরা। তাদের যুক্তি হলো, ইরান ইতোমধ্যে তার শক্তিমত্তা প্রমাণ করেছে এবং এখনই আলোচনার উপযুক্ত সময়।

ভবিষ্যতে আর ইরানের ওপর হামলা হবে না—এমন নিশ্চয়তা এবং হরমুজ প্রণালিতে বাড়তি কর্তৃত্বের মতো ছাড় পাওয়া গেলে তেহরান সমঝোতায় রাজি হতে পারে।