যেভাবে ইরানের জিয়নকাঠি হলো ক্রিপ্টোকারেন্সি
ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুরুর পর কেটে গেছে ২৭টি দিন। আজ সংঘাতের ২৮তম দিন।
শুরু থেকেই দুই শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিমান হামলার জবাবে ইরান ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
অপ্রত্যাশিতভাবে ইসরায়েলের পাশাপাশি এ অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপরও হামলা চালায় ইরান। মূলত সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও কাতারসহ যেসব দেশ মার্কিন সেনাদের ঠাই দিয়েছে অথবা মার্কিন ঘাঁটি নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে, তারাই তেহরানের রোষানলে পড়ে।
অপরদিকে, পর্দার আড়ালে ঘটে যায় এক ডিজিটাল বিপ্লব।
বেশ কয়েক বছর ধরেই আন্তর্জাতিক আর্থিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ও নিজ সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে বড় আকারে ডিজিটাল মুদ্রায় ঝুঁকছে ইরান।
চলমান সংঘাতেও দেশের সাধারণ মানুষ ও শাসকগোষ্ঠী—উভয়ের জন্যই জিয়নকাঠি হয়েছে ক্রিপ্টোকারেন্সি।
মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এখনো এই মুদ্রার লেনদেন আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ।
লাখো ডলারের লেনদেন
যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই ইরানে ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত দুই কারণে ইরানে ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন বেড়েছে।
প্রথমত, দেশটির বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা তাদের বিরুদ্ধে আরোপিত আন্তর্জাতিক আর্থিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এই পথে গেছেন বলে তারা মত দেন।
পাশাপাশি বেসামরিক মানুষও বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে এই ডিজিটাল মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন।
হামলা শুরুর প্রথম কয়েকদিনের মধ্যেই ইরানের বিভিন্ন মুদ্রা বিনিময় প্ল্যাটফর্মে প্রায় ১ কোটি ডলার মূল্যমানের ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন হয়।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চের মধ্যে এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে ডেটা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান চেইনালিসিস।
৫ মার্চের মধ্যে এই তহবিলের এক তৃতীয়াংশ বিদেশি এক্সচেঞ্জগুলোতে পৌঁছে যায়।
চেইনালাইসিসের কর্মকর্তা কেইলিন মার্টিন এএফপিকে বলেন, লেনদেনের একটি অংশ নিঃসন্দেহে ইরানের নাগরিকদের হাত দিয়েই এসেছে। হামলার মুখে তড়িঘড়ি করে নিজেদের সঞ্চিত অর্থকে সুরক্ষিত রাখতে তারা এই উদ্যোগ নিয়ে থাকতে পারেন।
তবে এই বিপুল পরিমাণ লেনদেন এটাই প্রমাণ করে যে এর সঙ্গে শাসকগোষ্ঠী জড়িত—মত দেন কেইলিন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, আরও নতুন বিধিনিষেধ ও সাইবারহামলার ভয়েও মানুষ এসব উদ্যোগ নিয়ে থাকতে পারে।
গত বছরের জুনে ইসরায়েল-ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি হ্যাকাররা শীর্ষ ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্ম নোবিটেক্স থেকে নয় কোটি ডলার হাতিয়ে নেয়।
ব্লকচেইন প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস এই তথ্য জানিয়েছে।
শাসকগোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা
চেইনালাইসিস জানিয়েছে, এই বিপুল পরিমাণ লেনদেনের একটি বড় অংশ বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর বেশ কয়েকটি ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে এসেছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি বিশ্লেষক এলিপ্টিক জানিয়েছে, দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা যখন বন্ধ ছিল, তখনও রক্ষীবাহিনীর ওয়ালেটে লেনদেন চালু ছিল।
গত বছর ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর (আইআরজিসি) ওয়ালেটগুলোতে তিন বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যমানের ক্রিপ্টোকারেন্সি যোগ করা হয়। এটি দেশটির মোট ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের অর্ধেকেরও বেশি।
ছায়া ব্যাংকিং
আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ইরান প্রথাগত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সেবা থেকে বঞ্চিত। যার ফলে তারা বিভিন্ন বিকল্প পন্থায় লেনদেন অব্যাহত রেখেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি তেমনই এক বিকল্প মাধ্যম।
এই ডিজিটাল মুদ্রার মাধ্যমে তারা বিধিনিষেধের আওতায় থাকা তেল বিক্রি ও গোপনে ইয়েমেনের হুতি বা ফিলিস্তিনের হামাসের মতো সশস্ত্র মিত্র গোষ্ঠীর অর্থায়ন করেছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন।
ক্রিপ্টোকারেন্সির বিনিময়ে ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য অত্যাধুনিক অস্ত্র বিক্রি করছে। এ বছরের শুরুতে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ফাইন্যানশিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে এমনটাই জানানো হয়।
অর্থ পাচার বিরোধী প্রতিষ্ঠান এসিএএমএস-এর কর্মকর্তা ক্রেইগ টিম মত দেন, এসব ডিজিটাল সম্পদ ইরানের ‘ছায়া ব্যাংকিং’ কার্যক্রমের চালিকাশক্তি।
তিনি জানান, ব্যাংক ট্রান্সফারের তুলনায় এটি অপেক্ষাকৃত দ্রুত লেনদেন করা যায় এবং এর খরচও কম।
পাশাপাশি, বৈশ্বিক নীতিমালার ঘাটতির কারণে এসব ডিজিটাল লেনদেনের ওপর নজর রাখাও খুব একটা সহজ নয় বলে মত দেন টিম।
জিয়নকাঠি ক্রিপ্টোকারেন্সি
বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী ও ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘স্থিতিশীল’ ডিজিটাল মুদ্রাকে বেশি প্রাধান্য দেয়। এসব মুদ্রার মূল্যমান ডলারের বিপরীতে নির্ধারণ হয়।
তবে বেসামরিক নাগরিকরা বিটকয়েনের মতো জনপ্রিয় মুদ্রায় ঝুঁকছেন। এগুলো বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে খুব সহজেই ডলারে রূপান্তর করা যায় এবং ব্যক্তিগত ওয়ালেটেও সঞ্চিত রাখা যায়।
ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময়ও অনেক মানুষ তাদের সঞ্চিত অর্থ শাসকগোষ্ঠীর নাগাল থেকে সরিয়ে রাখতে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বদলে নেন।
সংঘাত শুরুর আগেই ইরানে মূল্যস্ফীতি ৫০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
বিশ্লেষক মার্টিন মত দেন, একদিকে যেমন ইরানের রিয়াল মূল্যহীন হয়ে পড়ছে, অপরদিকে দেশটির জনগণের জন্য ‘জিয়নকাঠি’ হিসেবে কাজ করছে ক্রিপ্টোকারেন্সি।





