ইরানের হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পর কতটুকু কার্যকর মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলো

স্টার অনলাইন ডেস্ক

প্রায় এক মাস ধরে ইরানের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অনেকটাই বিপর্যস্ত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো। বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে ইতোমধ্যে মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একাধিক ঘাঁটি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেগুলো এখন ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে অনেক মার্কিন সেনা কাছাকাছি হোটেল বা ভবন থেকে কাজ চালাচ্ছেন—যা তাদের পাশাপাশি বেসামরিক লোকজনের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী আজ শুক্রবার নতুন করে মার্কিন ঘাঁটি ও সেনাদের কাছ থেকে বেসামরিক মানুষকে দূরে থাকার নির্দেশনা দিয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে উঠে আসে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি ও সক্ষমতার তথ্য।

ওপেন-সোর্স বিশ্লেষক ফ্যাবিয়ান হিন্‌জের জিওলোকেটেড ডেটার বরাতে টেলিগ্রাফ জানায়, ইরান এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের অন্তত ১০৪টি ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটি

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি ঘাঁটির অনেকগুলোই ধারাবাহিক হামলায় কার্যত ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে কুয়েতের আলি আল সালেম ঘাঁটি। এ ঘাঁটিতে এ পর্যন্ত ২৩টি হামলার তথ্য পাওয়া গেছে।

এছাড়া কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজানে ১৭ বার এবং ক্যাম্প বুহরিংয়ে ৬ বার হামলা হয়েছে।

স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, হামলায় এসব ঘাঁটিতে যোগাযোগ অবকাঠামো, স্যাটেলাইট সরঞ্জাম, জ্বালানি মজুদ ও গুদামঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কোন দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে কতবার হামলা

ওপেন-সোর্স বিশ্লেষক ফ্যাবিয়ান হিন্‌জের হিসাব অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে কুয়েতের ঘাঁটিগুলোতে। গত এক মাসে অন্তত ৫০ বার হামলা হয়েছে।

এছাড়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৭ বার, বাহরাইনে ১৬ বার, ইরাকে ৭ বার, কাতারে ৬, সৌদি আরবে ৬ ও জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ২ বার হামলা হয়েছে।

ক্ষয়ক্ষতি

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) গবেষণায় বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম দিকেই অন্তত ৮০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে।

জর্ডানে হামলায় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—থাড, রাডারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ার বেসে একটি হ্যাঙ্গার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি কাতারের আল উদেইদে একাধিক অ্যান্টেনা ও স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে।

কুয়েত
কুয়েতের আলি আল সালেম ঘাঁটিতে এ পর্যন্ত ২৩বার হামলা চালিয়েছে ইরান। ছবি: সংগৃহীত  

আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল ধাফরা ঘাঁটিতে সেনাদের থাকার একটি ভবনে বিস্ফোরণে বড় ধরনের গর্ত সৃষ্টি হয়েছে।

ইরানের দাবি, এসব হামলায় তাদের উন্নত খোররমশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আঘাত

ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি) বিশেষভাবে রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

থাড সিস্টেমের চারটি স্থানে আঘাত হানা হয়েছে বলে জানা গেছে। কাতারের একটি আগাম সতর্কীকরণ রাডারসহ আরও কয়েকটি স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানো আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

বাহরাইন
বাহরাইনে পঞ্চম মার্কিন নৌবহরের সদরদপ্তরে হামলা। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া 

ব্রিটিশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, ইরানের হামলার সংখ্যা কিছুটা কমলেও এখন আরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ভেদ করতে পারছে। কারণ প্রতিরোধে ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

সামরিক সক্ষমতা

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বেশি চাপ পড়েছে। এক মাসের যুদ্ধে থাডের মজুদ কমেছে ৪০ শতাংশ। এভাবে চললে আগামী ২৩ দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে থাডের মজুদ।

এছাড়া, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে নৌবাহিনীর এজিস সিস্টেমের (এসএম) মজুত ১৭ শতাংশ, প্যাট্রিয়টের মজুত ১৬ শতাংশ শেষ হয়েছে। তবে এয়ার টু এয়ার প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় পুরোটাই বহাল আছে।

আক্রমণমূলক অস্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র—এটিএসিএমএস। ইতোমধ্যে ৪৬ শতাংশ মজুত শেষ। আর ১৮ দিনের মজুত অবশিষ্ট রয়েছে।

চার্ট
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও আক্রমণমূলক অস্ত্রের মজুত। তথ্যসূত্র: রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট

এরপরই শেষ হওয়ার তালিকায় রয়েছে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র। এক মাসে প্রায় ১৭ শতাংশ মজুত শেষ হয়েছে। আর প্রায় আড়াই মাসের মজুত আছে মার্কিন ঘাঁটিতে।  

এছাড়া অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র (এলআরএএসএম)এর মজুত ১৩ শতাংশ ও স্বল্পমূল্যের ওডব্লিউএ ড্রোন (লুকাস/স্করপিয়ন) এর মজুত ১০ শতাংশ শেষ হয়েছে। বর্তমানে এই দুই অস্ত্রের মজুত দিয়ে সর্বোচ্চ তিন থেকে চার মাস চলতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র।

টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো এখন তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। অনেক ঘাঁটি আংশিক বা সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও দুর্বল হয়েছে।

তবে পাল্টা হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের সামরিক সক্ষমতায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।

মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত ইরানে ১০ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নৌস্থাপনাসহ জাহাজ নির্মাণ অবকাঠামোর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।