সীমান্ত অঞ্চলে কেন নতুন সামরিক অভিযান শুরু করেছে মিয়ানমার?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

নতুন প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মধ্যেই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করেছে।

বিরল মাটির খনিজসমৃদ্ধ এলাকা, সীমান্ত বাণিজ্যপথ এবং বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত কৌশলগত ঘাঁটি পুনর্দখলই এসব অভিযানের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও বিশ্লেষকেরা।

মার্চে দীর্ঘদিনের সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন সামরিক প্রধান ইয়ে উইন উ সীমান্ত এলাকায় আরও আক্রমণাত্মক কৌশল নিয়েছেন বলে জানিয়েছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স।

সাম্প্রতিক অভিযানগুলো মূলত চীন সীমান্তসংলগ্ন কাচিন রাজ্য, ভারত সীমান্তবর্তী চিন রাজ্য এবং থাইল্যান্ড সীমান্তঘেঁষা কারেন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমার জানিয়েছে, গত সপ্তাহে সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে ইয়ে উইন উ দাবি করেন, সামরিক বাহিনী চিন রাজ্যের ফালাম শহর এবং কাচিন রাজ্যে মান্দালয়-মিতকিয়িনা যোগাযোগ পথের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে।

myanmar war
মিয়ানমারের কারেন রাজ্যে কারেন ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির (কেএনএলএ) নিয়ন্ত্রিত একটি ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ সেশন চলাকালে কুচকাওয়াজ করছেন বামার পিপলস লিবারেশন আর্মির (বিপিএলএ) নবনিযুক্ত সদস্যরা। ৬ মার্চ ২০২৪। ছবি: রয়টার্স 

মিয়ানমারবিষয়ক বিশ্লেষক সাই কিই জিন সোয়ে রয়টার্সকে বলেন, ‘সামরিক বাহিনীর কৌশলগত লক্ষ্য হলো, প্রধান যোগাযোগ ও বাণিজ্য পথগুলোর ওপর আবার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাণিজ্যকেন্দ্র থাকা সীমান্ত শহরগুলো পুনর্দখলে সামরিক বাহিনী মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।’

রয়টার্স জানিয়েছে, কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোর পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বিরল খনিজের জন্য লড়াই

সামরিক বাহিনীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য উত্তরাঞ্চলীয় কাচিন রাজ্য। চীন সীমান্তবর্তী এ অঞ্চল বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ভারী বিরল মাটির খনিজ উৎপাদনের উৎস হিসেবে পরিচিত। বৈদ্যুতিক গাড়ি, উইন্ড টারবাইনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যে এসব খনিজ ব্যবহৃত হয়।

মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে সশস্ত্র বাহিনী দিবসের ৬৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কুচকাওয়াজে সেনাদের পরিদর্শন করছেন মিয়ানমারের সাবেক সেনাপ্রধান ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট জেনারেল মিন অং হ্লাইং। ২৭ মার্চ ২০১২। ছবি: রয়টার্স

২০২৪ সালের অক্টোবরে ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় কাচিন স্বাধীনতা বাহিনী।

গোষ্ঠীটির মুখপাত্র নাও বুউ রয়টার্সকে বলেন, বিশেষ করে চিপউই ও পাংওয়া এলাকায় তারা প্রতিরক্ষা জোরদার করেছে।

তার ভাষ্য, ‘আমরা তাদের আমাদের বন্দুকের নল দিয়েই স্বাগত জানাব।’

চিন ও কারেন রাজ্যে সংঘর্ষ

ভারত সীমান্তবর্তী চিন রাজ্যেও সামরিক বাহিনী ব্যাপক বিমান হামলা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট।

গোষ্ঠীটির মুখপাত্র সালাই ভ্যান বলেন, সামরিক বাহিনীর হামলার মুখে প্রতিরোধ যোদ্ধারা ফালাম ও টনজং শহর থেকে কৌশলগতভাবে সরে গেছে।

মিয়ানমারের কারেন রাজ্যে কারেন ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির (কেএনএলএ) নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পাহারায় দাঁড়িয়ে আছেন বামার পিপলস লিবারেশন আর্মির (বিপিএলএ) এক সদস্য। ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪। ছবি: রয়টার্স

রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ইরান থেকে অবৈধভাবে সরবরাহ হওয়া জেট জ্বালানি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিমান হামলা অব্যাহত রাখতে সহায়তা করেছে। গত ১৫ মাসে এক হাজারের বেশি বেসামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

এদিকে থাইল্যান্ড সীমান্তঘেঁষা মিয়াওয়াডি-কাওকারেইক মহাসড়কের নিয়ন্ত্রণ নিতেও অভিযান শুরু করেছে সামরিক বাহিনী। এটি দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত বাণিজ্যপথ।

২০২৪ সালে সীমান্ত শহর মিয়াওয়াডিতে প্রবেশ করে কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন। এরপর থেকেই এলাকাটিতে তীব্র সংঘর্ষ চলছে।

শান্তি আলোচনায় অনাস্থা

এপ্রিলে মিন অং হ্লাইং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে ১০০ দিনের মধ্যে শান্তি আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। তবে বেশ কয়েকটি জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী তাৎক্ষণিকভাবে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়নের মুখপাত্র সও টাও নি বলেন, ‘শান্তির পথে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো সামরিক বাহিনী বারবার ভঙ্গ করেছে।’

মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনের কাউহমুতে অং সান সু চি। ১৮ জুলাই ২০১৯। ফাইল ছবি: রয়টার্স 

তিনি বলেন, ‘সম্পূর্ণভাবে আস্থার অভাব রয়েছে। তারা যা চেষ্টা করবে, তা ব্যর্থ হবে।’

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ চলছে। এরপর দেশজুড়ে গণবিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরে সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপ নেয়।