ইরান যুদ্ধ থামাতে ভোট দিয়ে ট্রাম্পকে ‘তিরস্কার’ করল মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা সীমিত করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব পাস করেছে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২১৫-২০৮ ভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। এর ফলে কংগ্রেস অনুমতি না দিলে ট্রাম্পকে ইরান যুদ্ধ থেকে সেনা সরিয়ে নিতে হবে।
ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে চারজন রিপাবলিকান সদস্য যোগ দেওয়ায় এই প্রতীকী প্রস্তাবটি পাস হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা জানাতেই তারা এই অবস্থান নিয়েছেন।
বিবিসি জানায়, ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি পরিষদ ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন’ গ্রহণ করেছে। তবে এর আইনি কার্যকারিতা কতটা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে হোয়াইট হাউস এটির গুরুত্ব খারিজ করে দিয়ে বলেছে, এটি প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করার একটি অসাংবিধানিক চেষ্টা।
তবুও প্রস্তাবটি পাস হওয়া তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। কারণ এটি ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হোয়াইট হাউসের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। এরই মধ্যে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং যুদ্ধবিরোধী জনমতও জোরালো হয়েছে।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, এটি ছিল ট্রাম্পের যুদ্ধসংক্রান্ত ক্ষমতা সীমিত করার জন্য প্রতিনিধি পরিষদের চতুর্থ প্রচেষ্টা। মে-তে সিনেটেও একইরকম একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছিল, তবে এখনো সেখানে পূর্ণাঙ্গ ভোট হয়নি।
বুধবার আলোচিত প্রস্তাবটি ছিল একটি ‘কনকারেন্ট রেজোলিউশন’। রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেটেও এটি পাস হলে আর প্রেসিডেন্টের সইয়ের প্রয়োজন হবে না। যদিও এই প্রস্তাব আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
এই ভোট ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরীণ বিভক্তিরও ইঙ্গিত দিয়েছে। এর কয়েক দিন আগে কংগ্রেসের রক্ষণশীল সদস্যদের বিরোধিতার মুখে প্রশাসন রাজনৈতিক মিত্রদের জন্য প্রস্তাবিত ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের ‘অ্যান্টি ওয়েপনাইজেশন’ তহবিল পরিকল্পনা থেকে সরে আসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকান সদস্য থমাস ম্যাসি, ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক, টম ব্যারেট ও ওয়ারেন ডেভিডসন ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দিয়ে প্রস্তাবটি পাসে ভূমিকা রাখেন। মেইনের ডেমোক্র্যাট সদস্য জ্যারেড গোল্ডেনও এবার প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন।
মিশিগানের রিপাবলিকান সদস্য টম ব্যারেট বলেন, ‘যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসের এবং এই ক্ষমতা রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।’
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন কি না জানতে চাইলে তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘আমি আমার বিবেকের নির্দেশনা অনুযায়ী যা সঠিক মনে করি, সেটার পক্ষেই ভোট দিই। আর তার পরিণতিও মেনে নিতে প্রস্তুত।’
প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্রেগরি মিকস এই ভোটকে ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবৈধ ও ব্যয়বহুল ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে উভয় দলের গুরুত্বপূর্ণ তিরস্কার এবং যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের প্রথম পদক্ষেপ’ বলে বর্ণনা করেন।
মিকস বলেন, ট্রাম্প যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। বরং তিনি জ্বালানির দাম বাড়িয়েছেন এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক সমাধান আরও কঠিন করে তুলেছেন।
প্রস্তাবটির সহ-উদ্যোক্তা মিকস বলেন, আজ এই প্রস্তাব পাস হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। আরও বেশি রিপাবলিকান এখন তাদের ভোটারদের কথা শুনছেন। তারা মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি অনির্দিষ্টকালীন যুদ্ধ চান না।
এই ভোটের আগে ট্রাম্প দাবি করেন, যুদ্ধ অবসানের আলোচনা ‘খুব ভালোভাবে’ এগোচ্ছে এবং চলতি সপ্তাহান্তেই তা চূড়ান্ত হতে পারে।
বুধবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা আগের রাতেও তাদের ওপর জোরালো আঘাত হেনেছি, আসলে গত রাতেও।’
ইরানে হামলার প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ‘কেউ কেউ বলতে পারেন তারা কিছুটা উসকানি পেয়েছিল, কারণ আমরা অন্য একটি কারণে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। তাই তারা পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, তার প্রশাসনের অধিকাংশ সদস্যই ‘সবাইকে হত্যা না করেই’ একটি চুক্তির মাধ্যমে দ্রুত এই সংঘাতের অবসান চান।
ট্রাম্পের ভাষ্য, ‘তাত্ত্বিকভাবে তারা একটি চুক্তিপত্রে সই করার খুব কাছাকাছি রয়েছে। বাস্তবে তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কও বেশ ভালো হয়েছে।’
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর জবাবে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা চালায় ইরান। এরপর থেকে বৈশ্বিক নৌপরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে।
এপ্রিলে ইরানের বন্দর ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে অবরোধ কার্যক্রম শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।
৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছায় বলেও বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।