আবার যুদ্ধ শুরু হলে ইরানের অস্তিত্ব থাকবে না: ট্রাম্প
ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে টানা তৃতীয় দিনের মতো পাল্টা আঘাত হানার কথা জানিয়েছে তেহরান। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে নাজুক যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে চলমান আলোচনাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
এএফপি জানিয়েছে, এই পাল্টাপাল্টি হামলা পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এগিয়ে চলা শান্তি প্রক্রিয়ার ভঙ্গুরতাকেই সামনে এনেছে। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধ হরমুজ প্রণালির নৌপথে বিঘ্ন সৃষ্টি করে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) আজ রোববার জানায়, তারা গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং নির্দেশনা অমান্যকারী জাহাজের বিরুদ্ধে আগের চেয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তেহরানের অনুমোদিত একমাত্র নৌপথটি ইরানের উপকূল ঘেঁষে নির্ধারিত একটি করিডোর দিয়ে পরিচালিত হয়।
বিপ্লবী গার্ড আরও দাবি করেছে, তারা কুয়েত ও বাহরাইনেও পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
এক বিবৃতিতে তারা জানায়, কুয়েতের আলি আল-সালেম ঘাঁটি এবং বাহরাইনের পোর্ট সালমানে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটির আটটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘যেকোনো অজুহাতে, এমনকি তুচ্ছ লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধেও শত্রুপক্ষের আগ্রাসনের জবাব হবে ধ্বংসাত্মক।’
বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রোববার দেশটিতে দুই দফা বিমান হামলার সতর্কসংকেত বেজে ওঠে।
এর আগে, জুনের মাঝামাঝি পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতা স্মারকে পৌঁছায় ওয়াশিংটন ও তেহরান, যার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের স্থায়ী অবসান।
চুক্তিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এবং তাদের মিত্ররা একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান শুরু করবে না এবং শক্তি প্রয়োগ কিংবা হুমকি দেওয়া থেকেও বিরত থাকবে।
‘ইরানের অস্তিত্ব থাকবে না’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার যুদ্ধ শুরু করতে বাধ্য হয়, তাহলে ‘ইরানের আর অস্তিত্ব থাকবে না।’
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পর তিনি এই মন্তব্য করেন।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘যুদ্ধবিরতি চুক্তি আবারও লঙ্ঘনের কারণে মার্কিন বিমান বাহিনী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।’
তিনি আরও লেখেন, ‘একসময় এমন পরিস্থিতি আসতে পারে, যখন আমাদের আর সংযত থাকা সম্ভব হবে না এবং আমরা অত্যন্ত সফলভাবে শুরু করা কাজ সামরিকভাবে শেষ করতে বাধ্য হব। যদি তা ঘটে, তাহলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।’
হামলার মুখে আন্তর্জাতিক নৌপথ
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শনিবারের হামলা ছিল ‘কিকু’ নামে পানামার পতাকাবাহী একটি তেলবাহী জাহাজে ইরানের ড্রোন হামলার জবাব। জাহাজটিতে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, তাদের অভিযানে ইরানের নজরদারি অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা কেন্দ্র, ড্রোন গুদাম এবং মাইন পাতার সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
ইরানি গণমাধ্যম দক্ষিণ ইরানের সিরিক ও কেশম এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে।
এর আগের দিন শুক্রবারও যুক্তরাষ্ট্র একই ধরনের হামলা চালায়। তখন ওয়াশিংটনের দাবি ছিল, ‘এভার লাভলি’ নামে আরেকটি জাহাজে ইরানের হামলার জবাব হিসেবে ওই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত রয়েছে। হিজবুল্লাহ প্রধান নাইম কাসেম সংঘাত অবসানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় অঞ্চলজুড়ে শান্তি প্রচেষ্টা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ইরান এসব হামলাকে ‘নিষ্ঠুর আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, এগুলো অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
তেহরান সতর্ক করে বলেছে, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ যেন হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরে প্রবেশ বা বের না হয়। তবে কিছু জাহাজ এখনও তেহরানের অনুমোদনহীন বিকল্প পথ ব্যবহার করছে।
সমঝোতা স্মারকে ইরান ৬০ দিনের জন্য পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং উল্টো পথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ ও বিনা খরচে চলাচলের নিশ্চয়তা দিয়েছিল।
লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাংক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক এইচ এ হেলিয়ার বলেন, আন্তর্জাতিক সংঘাত না বাড়িয়েই বিশ্ব বাণিজ্যিক নৌপরিবহনের ওপর স্থায়ী চাপ সৃষ্টি করতে ইরান হরমুজ প্রণালিতে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে পারে।
তার মতে, নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন ওয়াশিংটনের জন্য দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রণোদনা তৈরি করছে। অন্যদিকে, দীর্ঘায়িত আলোচনা ও প্রণালিতে নিয়ন্ত্রিত চাপ বজায় রাখা ইরানের কৌশলগত স্বার্থে কাজ করতে পারে।
লেবানন ইস্যুতে নতুন উত্তেজনা
মার্চের শুরুতে ইরানের সমর্থনে ইসরায়েলের দিকে রকেট হামলা চালানোর মাধ্যমে হিজবুল্লাহ লেবাননকে এই আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলে। এর জেরে ইসরায়েলি অভিযান শুরু হয়, যা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতিকেও দুর্বল করে দিয়েছে।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইসরায়েল ও লেবানন দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে।
তবে একদিন পর হিজবুল্লাহ নেতা নাইম কাসেম চুক্তিটিকে ‘অপমানজনক, লজ্জাজনক এবং সার্বভৌমত্বের আত্মসমর্পণ’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন।
বরং তিনি ওয়াশিংটন ও তেহরানের চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের আহ্বান জানান, যার মধ্যে লেবাননের যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে এলেও নতুন চুক্তিতে সে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জোর দিয়ে বলেছেন, হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের তথাকথিত নিরাপত্তা অঞ্চলে ইসরায়েলি সেনারা অবস্থান করবে এবং বেসামরিক লোকজনকে সেখানে ফিরতে দেওয়া হবে না।
শনিবার তিনি চুক্তিটিকে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে বলেন, এটি ‘ইরান ও হিজবুল্লাহর জন্য বড় ধাক্কা’।
তবে তার কট্টর ডানপন্থী নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এই চুক্তিকে ‘বড় ভুল’ বলে আখ্যা দিয়ে দাবি করেন, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে সক্ষম একমাত্র ইসরায়েলি বাহিনীই।
