দেশে দেশে কফি পানের এই সংস্কৃতিগুলো জানেন?

শ
শবনম জাবীন চৌধুরী

অনেকেরই সকালটা শুরু হয় এক কাপ কফি হাতে নিয়ে। কখনো ব্যস্ততার সঙ্গী, তো কখনো দীর্ঘ আড্ডার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্বজুড়ে যদি তুমুল জনপ্রিয় একটি পানীয়ের নাম জানতে চাওয়া হয়, তাহলে নির্দ্বিধায় কফির নামটিই চলে আসে।

এক কাপ কফিতে যেন মেলে স্বস্তি, এনার্জি আর ক্ষণিকের প্রশান্তি। তবে দেশভেদে কফি পানের রীতিতে রয়েছে কিছুটা ভিন্নতা। নানা রকম রীতিতে ফুটে ওঠে শত-সহস্র বছরের দেশীয় সংস্কৃতি, প্রথা এবং মূল্যবোধ। দেশ বদলালেই বদলে যায় কফির স্বাদ, আর এর গল্পেও আসে বৈচিত্র্য।

কফি কি শুধু পানীয়?

কফি পানীয় বা ক্যাফেইনের উৎসের চেয়েও বেশি কিছু। ভাবছেন, কীভাবে? দেশে দেশে কফি পানের ধরনে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি, যা এটিকে শুধু দৈনন্দিন একটি অভ্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। বরং, এর রয়েছে মানুষকে কাছে নিয়ে আসার, একটি সুন্দর ও অর্থবহ কথোপকথনের সূচনা করার, আতিথেয়তা প্রকাশের, বন্ধুত্ব গড়ে তোলার, বিশেষ মুহূর্তগুলো উদযাপনের এবং ঐতিহ্যকে তুলে ধরা ও বজায় রাখার এক শক্তিশালী ক্ষমতা।

কফি তৈরির পদ্ধতি, পরিবেশনের ধরন এবং কফি পানের আচার-বিধি, সব মিলিয়েই যেন একেকটি ভিন্ন গল্প তৈরি হয়। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কোন দেশে কীভাবে কফি পান করা হয়?

ইথিওপিয়া

ইথিওপিয়াকে কফি গাছের উৎপত্তিস্থল বলা হয় এবং এটি ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। এখানে কফি শুধু একটি পানীয় নয়, বরং পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বাড়ানোর অন্যতম একটি মাধ্যম। 
কফির গল্পটি এখানে একটু ভিন্ন ধরনের।

ইথিওপিয়ায় কফি উৎসব পালন করা হয়। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিত সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয় এই উৎসবে। কফি উৎসবের শুরুটা হয় চুলায় একেবারে তাজা সবুজ রঙের কফির বীজ ভাজার মধ্য দিয়ে।

প্রথমে আমন্ত্রিত অতিথিরা এই ভাজা কফির দারুণ গন্ধ উপভোগ করেন। তারপর এগুলো গুঁড়ো করে ‘জেবেনা’ নামের ঐতিহ্যবাহী এক বিশেষ মাটির পাত্রে জ্বাল দেওয়া হয় এবং ছোট কাপে পরিবেশন করা হয়। এই কফির সঙ্গে অতিথিদের সাধারণত পপকর্ন বা অন্যান্য হালকা খাবার পরিবেশন করা হয়।

ভাবছেন, এক কাপ কফিতেই উৎসব শেষ! মোটেই না। মোট তিন দফায় কফি পরিবেশন করা হয় এবং রাউন্ডগুলো ‘আবোল’, ‘টোনা’ ও ‘বারাকা’ নামে পরিচিত। প্রতিটি রাউন্ডেরই নিজস্ব কিছু ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতি রয়েছে। কয়েক ঘণ্টা ধরে এই উৎসব চলতে থাকে।

এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যস্ততার ভিড়ে কিছু সময়ের জন্য কফির উষ্ণতায় একে অন্যের সঙ্গে সময় কাটানো, কুশল বিনিময়, নিজেদের চিন্তাভাবনাগুলো ভাগ করে নেওয়া এবং পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নতি করা। এটি ইথিওপিয়ার সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।

ইতালি

ইতালিতে কফি সংস্কৃতিতে এসপ্রেসোর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কফি হবে খুব সাদামাটা এবং দ্রুত পান করা যাবে-এভাবেই ইতালীয়রা কফি পান করতে পছন্দ করেন। কখনো তারা কফিতে সামান্য চিনি বা দুধ মিশিয়ে নেন, তবে সেটি সাধারণত কেবল সকালবেলার জন্যই।

অনেকেই সকালে ক্যাপাচিনো বা লাতে পান করেন। এর সঙ্গে তারা ক্রোয়েস্যান্ট খেতে ভালোবাসেন। সকালের পর তারা সাধারণত কফিতে দুধ যোগ করেন না। এটিই তাদের প্রচলিত রীতি।

কোনো ক্যাফেতে বসে আরাম করে সময় নিয়ে বা আড্ডা দিতে দিতে কফি খাওয়ার চলও সেখানে তুলনামূলকভাবে কম। বরং ইতালির কফি সংস্কৃতিতে ক্যাফের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে দ্রুত এক কাপ কফি শেষ করে বেরিয়ে পড়ার চল রয়েছে।

সুইডেন

সুইডেনে ‘ফিকা’ একটি সুপরিচিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ভাবছেন, এর সঙ্গে কফির সম্পর্ক কী? সংক্ষেপে বললে, ফিকাকে কফি ব্রেক বলা যেতে পারে। আর বিস্তারিত বললে, অফিস বা দৈনন্দিন কাজ থেকে কিছুটা সময় বের করে বন্ধু-বান্ধব, পরিবার বা সহকর্মীদের সঙ্গে কফি এবং হালকা স্ন্যাকস, যেমন পেস্ট্রি, খাওয়ার জন্য বিরতি নেওয়াকে বোঝায়। বাড়িতে বা কফি শপে বসেও ফিকা উপভোগ করা যেতে পারে।

জীবনের কর্মব্যস্ততায় হারিয়ে না গিয়ে কাছের প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে সময় কাটানো এবং তাদের গুরুত্ব দেওয়ার ব্যাপারে অনুপ্রেরণা জোগায় এই রীতি।

তুরস্ক

তুরস্কে কফি যেন এক প্রাচীন ঐতিহ্যের নাম। কফির সঙ্গে ভাগ্য গণনার এক দারুণ সংস্কৃতিও রয়েছে এ দেশে। কফি তৈরির পদ্ধতিটিও খানিকটা ভিন্ন। কফির বীজ খুব মিহি করে গুঁড়ো করে এর সঙ্গে প্রয়োজনমতো পানি ও চিনি যোগ করে ‘জেজভে’ নামের ছোট্ট একটি পাত্রে জ্বাল দেওয়া হয়। জেজভে সাধারণত হাতলওয়ালা তামা, পিতল বা স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি একটি ছোট পাত্র।

এরপর কফি ছোট কাপে পরিবেশন করা হয়। কফি সাধারণত ছেঁকে পরিবেশন করা হয় না, তাই কাপের তলায় কফির গুঁড়া জমে থাকে। এর সঙ্গে অনেকেই তুর্কি ডিলাইট খেতে পছন্দ করেন। 
ইতালিতে যেমন দ্রুত কফি শেষ করার চল রয়েছে, তুরস্কে কফি মানেই ধীরে-সুস্থে, চুমুকে চুমুকে উপভোগ করা। একসঙ্গে আড্ডার টেবিলে, পরিবারের সঙ্গে বা বিশেষ কোনো উপলক্ষে কফি থাকতেই পারে।

তুরস্কে একটি প্রাচীন লোকাচার এখনো চলমান, যা বেশ চমকপ্রদ। কফি পান করা শেষ হলে কাপটি উল্টে একটি পাত্রের ওপর রাখা হয়। কাপে থাকা কফির গুঁড়া পাত্রের ওপর জমা হয়ে যে আকৃতি ধারণ করে, তার ওপর নির্ভর করে সেই ব্যক্তির ভাগ্য গণনা করা হয়।

ভিয়েতনাম

ডিমের কুসুম, চিনি ও কনডেন্সড মিল্ক একসঙ্গে ভালো করে ফেটিয়ে অনেকটা ক্রিমের মতো করে কফির ওপর দিয়ে কখনো খেয়েছেন? ভিয়েতনামে এটিকে ‘এগ কফি’ বলা হয় এবং এটি বেশ জনপ্রিয়।

এগ কফির পাশাপাশি ভিয়েতনামের জনপ্রিয় কফিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘ক্যাফে সুয়া দা’। এটি মূলত ভিয়েতনামি আইসড কফি। কনডেন্সড মিল্কের সঙ্গে মিশিয়ে এই কফি পরিবেশন করা হয়।

সৌদি আরব

মধ্যপ্রাচ্যে অ্যারাবিক কফি বা ‘কাহওয়া’ বেশ জনপ্রিয় একটি পানীয়। হালকা ভাজা কফির বীজ দিয়ে কাহওয়া তৈরি করা হয়। এতে সাধারণত এলাচ এবং কখনো লবঙ্গ বা জাফরান যোগ করা হয়। এরপর ছোট কাপে পরিবেশন করা হয়।

আর সৌদি আরব মানেই আতিথেয়তার তালিকায় থাকে খেজুর। কফির সঙ্গে অতিথিদের খেজুর পরিবেশন করা হয়। অতিথিদের প্রতি সম্মান জানানো এবং আতিথেয়তার ঐতিহ্য ধরে রাখার অংশ হিসেবেই এই কফি পরিবেশন করা হয়ে থাকে।