বাসের ছিল না ফিটনেস, ট্রাক পাল্টে বানানো হয় অ্যাম্বুলেন্স
ফরিদপুরের নগরকান্দায় মুখোমুখি সংঘর্ষের বিআরটিসি বাস ও অ্যাম্বুলেন্সের বৈধ বা হালনাগাদ কোনো কাগজপত্র ছিল না।
বিআরটিএতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুর্ঘটনাকবলিত সরকারি ওই বাসের দুই বছর ধরে ফিটনেস সনদ ছিল না, তিন বছর দেওয়া হয়নি ট্যাক্স। অন্যদিকে অ্যাম্বুলেন্সটির কাগজপত্র ১৭ বছর ধরে নবায়ন করা হয়নি। এটি ছিল মূলত একটি ছোট ট্রাক। ট্রাকটিকে অবৈধভাবে পরিবর্তন করে অ্যাম্বুলেন্স বানানো হয়।
গত রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কের নগরকান্দার শংকরপাশা এলাকায় এই দুর্ঘটনায় 'অ্যাম্বুলেন্সে' থাকা পাঁচ জন নিহত হন। মাদারীপুর থেকে এক অসুস্থ স্বজনকে চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন পরিবারের সদস্যরা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, পথে একটি ভ্যানকে ওভারটেক করতে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা ঢাকাগামী বিআরটিসি বাসের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে অ্যাম্বুলেন্সটি দুমড়েমুচড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই চালকসহ আরোহীরা নিহত হন।
ফরিদপুর বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শক অরুণ সরকার জানান, খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। অ্যাম্বুলেন্সটির নম্বর প্লেটে ‘ঢাকা মেট্রো ঠ ১১-১২২৯’ লেখা ছিল। এ ধরনের নম্বর সাধারণত স্ট্যান্ডার্ড ভ্যান বা ছোট ট্রাকের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। অ্যাম্বুলেন্সের নম্বর সাধারণত ‘ছ’ দিয়ে শুরু হয়। মূলত এটি আগে অন্য গাড়ি ছিল। পরে এর কাঠামো পরিবর্তন করে অ্যাম্বুলেন্স বানানো হয়।
তিনি আরও জানান, গাড়িটির ফিটনেস ও ট্যাক্স সর্বশেষ ২০০৯ সালের ১৫ মে পরিশোধ করা হয়। মোবারক হোসেন নামের ঢাকার মিরপুরের এক বাসিন্দা সে সময় এটি হালনাগাদ করেছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, এরপর গাড়িটি একাধিকবার হাতবদল হয়েছে।
বিআরটিসির বাসের বিষয়ে তিনি বলেন, বাসের ফিটনেস সনদও হালনাগাদ ছিল না। এর মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর। এ ছাড়া ২০২৩ সালের ৫ ডিসেম্বরের পর থেকে বাসটির ট্যাক্সও পরিশোধ করা হয়নি।
বিআরটিএর নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দুর্ঘটনায় তিনজনের বেশি মানুষের মৃত্যু হলে জেলা প্রশাসক ও বিআরটিএ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন তৈরি করে ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠায়।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুস্মিতা সাহাকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে আছেন বিআরটিএর সহকারী পরিচালক পলাশ খীসা। হাইওয়ে পুলিশের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং বুয়েটের একজন প্রতিনিধিকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুস্মিতা সাহা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে কাজ শুরু করেছি। ঈদের ছুটির পর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।’
এ ঘটনায় এখনো ভাঙ্গা হাইওয়ে থানায় কোনো মামলা হয়নি। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হেলাল উদ্দিন জানান, পাঁচজন নিহত হলেও পরিবারের কেউ এখনো মামলা করেননি। নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা শোকাহত ও অসুস্থ থাকায় আসতে পারেননি। তবে দু-এক দিনের মধ্যে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন।
নিহত পাঁচজন হলেন মাদারীপুর সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামের আলমগীর হোসেন (৫৮), তার ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন (৬২), আলমগীরের স্ত্রী খুশি বেগম (৪৫), জাহাঙ্গীরের স্ত্রী মাজেদা বেগম (৫০) এবং অ্যাম্বুলেন্সের চালক কাউছার হোসেন (২৫)। চালক কাউছার মাদারীপুর সদর এলাকার শাহজাহান মাতুব্বরের ছেলে।
