বিশ্লেষণ

অধিকাংশ ধর্ষণ হয় নিজ ঘরে, ধর্ষক পরিচিত মুখ

আবির অয়ন এবং তারেক হোসেন

বাংলাদেশে অধিকাংশ ধর্ষণের ঘটনা অন্ধকার গলি বা নির্জন রাস্তায় ঘটে না। ঘটে মানুষের সবচেয়ে আস্থার জায়গায়, অর্থাৎ নিজ বাড়িতেই।

২০১২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরির (বিপিও) ডেটা থেকে ৮ হাজার ৬৭টি ধর্ষণ মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করেছে দ্য ডেইলি স্টার। এতে দেখা যায়, অপরাধের অন্যতম প্রধান ঘটনাস্থল ভুক্তভোগীর নিজের বাড়ি।

গত পাঁচ বছরের ৬৮০টি ঘটনা গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এর মধ্যে ১৮৬টিই ঘটেছে ভুক্তভোগীর নিজের বাড়িতে এবং ১৭৯টি ধর্ষকের বাড়িতে।

সম্প্রতি ঢাকায় আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও একই ধারা দেখতে পাওয়া যায়। নিজের বাসা থেকে কয়েক কদম দূরে ধর্ষক ও খুনির ঘরে তাকে হত্যা করা হয়।

বিপিওর ডেটায় এমন বহু ঘটনা পাওয়া গেছে, যেখানে শিশুদের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিবেশীর ঘরে ডেকে নেওয়া হয়েছে, অথবা পরিচিত পরিবেশেই তারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।

২০২৫ সালে মানিকগঞ্জের ১৩ বছরের এক কিশোরীর ঘটনাই ধরা যাক। তাকে নিজ বাড়িতে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করেন ৬২ বছর বয়সী এক প্রতিবেশী। এর এক বছর আগে মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়িতে চকলেটের লোভ দেখিয়ে ১০ বছরের শিশুকে ঘরে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম বিপিও দেশজুড়ে সহিংসতা ও সংঘাতের গতিপ্রকৃতি নিয়ে কাজ করে। তাদের সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, নিজ বাড়ির বাইরেও অপরাধীরা নানা ধরনের জায়গা ব্যবহার করে। এসব জায়গা কখনো নির্জন, কখনোবা পরিচিত।

৮ হাজার ৬৭টি ঘটনার মধ্যে ৬৮০টি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাগান, জঙ্গল ও ফসলের মাঠে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৯৬টি এবং পরিত্যক্ত স্থানে ৯৫টি।

এমনকি ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫৩টি, যার মধ্যে ২৮টি মাদ্রাসায়, ১৫টি স্কুলে এবং ১০টি মসজিদে।

বাণিজ্যিক জায়গা বা যানবাহনেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, তবে এর হার তুলনামূলক কম। স্থানীয় দোকানে ২৫টি, যানবাহনে ১৭টি ও হোটেলে ১২টি ধর্ষণের ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশে এত ধর্ষণের ঘটনার কারণ জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘এখানে অনেকগুলো ধাপ আছে। তবে, প্রধানত সমাজে গভীরভাবে গেঁথে থাকা নারীবিদ্বেষী মানসিকতাই এর জন্য দায়ী। এখানে নারীকে ভোগের বস্তু হিসেবে দেখা হয়।’

তিনি বলেন, ‘অপরাধীরা খুব ভালো করেই জানে যে আইনের ফাঁকফোকর আছে, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতাও আছে। এ জন্যই তারা ইচ্ছা করেই এসব অপরাধে জড়ায়, কারণ জানে যে বড় কোনো শাস্তি ছাড়াই তারা পার পেয়ে যাবে।’

যেসব এলাকায় ধর্ষণ বেশি

দেশে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে শহরাঞ্চল ও শিল্পাঞ্চলে।

বিশ্লেষণ করা ৮ হাজার ৬৭টি ঘটনার মধ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫৩১টি ঘটনা ঘটেছে। এরপরেই রয়েছে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী।

জেলার হিসাবে ঢাকায় ৯১৩টি ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এরপরেই রয়েছে চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জ।

উপজেলা পর্যায়ে গেলে এই চিত্র আরও বেশি উদ্বেগজনক। সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে যে পাঁচটি উপজেলায় সেগুলো হলো—সাভার, নারায়ণগঞ্জ সদর, গাজীপুর সদর, ধামরাই ও কালিয়াকৈর। এর প্রতিটিই বড় শিল্প এলাকা।

এসব এলাকায় ভুক্তভোগীদের প্রায় ৫৮ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। গত ১৩ বছরে সারা দেশে যত পোশাকশ্রমিককে ধর্ষণ করা হয়েছে, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ঘটেছে এই পাঁচ উপজেলায়।

অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘শিল্প এলাকাগুলোতে বিপুল-সংখ্যক নারী কাজের জন্য ঘরের বাইরে যান। তারা প্রতিনিয়তই রাস্তাঘাটে ও কর্মক্ষেত্রে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে, ধর্ষণ করা হচ্ছে। চাকরি হারানোর ভয়, আইন-আদালতের বিপুল খরচসহ নানা কারণে তারা অনেক সময়ই এসব ঘটনায় অভিযোগ করেন না।’

ভুক্তভোগী কারা

বিশ্লেষণ করা ৮ হাজার ৬৭টি ধর্ষণের ঘটনায় অর্ধেকেরও বেশি বা ৪ হাজার ৫২০টি ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী হয়েছে শিশু ও কিশোরী এবং প্রাপ্তবয়স্ক নারীর সংখ্যা ১ হাজার ৭৮৩।

অতি অল্প বয়সী শিশুদেরও যৌন নিপীড়ন করা হচ্ছে। যেমন: ২০২৫ সালে সিলেটে বিস্কুটের লোভ দেখিয়ে দুই বছরের কন্যাশিশুকে যৌন নিপীড়ন করা হয়।

সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, ৭৩১টি ঘটনায় ভুক্তভোগী ছিল শিশু। ২৮২টি ঘটনায় শিক্ষার্থী এবং ১৩৫টি ঘটনায় ভুক্তভোগী পোশাকশ্রমিক।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কেবল নারী ও কন্যাশিশুদেরই যৌন নিপীড়ন করা হয়নি। অন্তত ১০৮টি ঘটনায় ভুক্তভোগী হয়েছে ছেলেশিশু। এর মধ্যে ৩১টি ঘটনা ঘটেছে ধর্মীয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, যেখানে নিপীড়ক ছিলেন মাদ্রাসা শিক্ষক, মসজিদের ইমাম বা মুয়াজ্জিন।

এর একটি উদাহরণ হলো, গত বছর সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলায় ১০ বছরের এক ছেলেকে বলাৎকারের অভিযোগে মসজিদের ইমামকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অভিযুক্ত কারা

পর্যালোচনা করা ঘটনাগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা ভুক্তভোগীদের পূর্বপরিচিত। বড় অংশই আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক বা পরিবারের সদস্য।

ডেটা থেকে দেখা যায়, ১৬৯টি ঘটনায় আত্মীয়-স্বজন জড়িত। এর মধ্যে চাচা-মামা ও বৈবাহিক সূত্রের আত্মীয়ও রয়েছেন। ৫৩টি ঘটনায় বাবা এবং ৫১টি ঘটনায় স্বামী বা সাবেক স্বামী অভিযুক্ত। বন্ধুদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ৭৩টি ঘটনায়। এ ছাড়া ৪৪টি ঘটনায় পরিবারের অন্যান্য সদস্য অভিযুক্ত হয়েছেন।

অন্তত ৫০২টি ঘটনায় অভিযুক্তের তালিকায় রয়েছেন প্রতিবেশী। অনেক ক্ষেত্রেই তারা খাবার বা উপহারের লোভ দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের, বিশেষ করে শিশুদের নিজেদের ঘরে ডেকে নেন।

স্কুল, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গৃহশিক্ষক জড়িত ছিলেন অন্তত ৩৬৬টি ঘটনায়।

পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অভিযুক্ত হয়েছেন অন্তত ৬৪টি ঘটনায়। ২০২০ সালে খাগড়াছড়িতে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে এক পুলিশ কনস্টেবলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এর বাইরে ১ হাজার ৩৬৯টি ঘটনায় স্থানীয় বখাটেরা জড়িত, যারা প্রায়ই সংঘবদ্ধভাবে অপরাধ করে। এ ছাড়া ১৯৬টি ঘটনায় উত্ত্যক্তকারী এবং ১১২টি ঘটনায় পরিবহনশ্রমিক জড়িত। ১৬২টি ঘটনায় সন্দেহভাজন ছিলেন রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকীর মতে, ‘শুধু কঠোর আইন করলেই যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধ কমে না।’

তিনি বলেন, ‘যেসব দেশে আইনের কার্যকর শাসন ও ধারাবাহিক প্রয়োগ হয়, সেখানে এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থা দুর্বল, আইনের ধারাবাহিক ও কঠোর প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। সেখানে আইনে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তি থাকলেও বাস্তবে তার খুব একটা প্রভাব পড়ে না।’