১৫ বছরে টাকার মান প্রায় অর্ধেক, বেড়েছে আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি: সংসদে অর্থমন্ত্রী
গুণগত দিক থেকে ভারসাম্যহীনতা, নীতি সমন্বয়ের ঘাটতি ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অর্থনীতি যে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে, সেখান থেকে উত্তরণ আজকের সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আজ শুক্রবার সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৩তম দিনে তিনি আওয়ামী লীগ ও এর আগে বিএনপির শাসনামলে অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচকের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘২০০১-০৬ সময়ে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য বজায় রাখতে নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, যেখানে জাতীয় সঞ্চয় জিডিপির ২৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং মোট বিনিয়োগ ছিল ২৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সালে এই চিত্র উল্টে গেছে। বিনিয়োগ জিডিপির ৩০ দশমিক ৭০ শতাংশ হলেও সঞ্চয় ২৮ দশমিক ৪২ শতাংশে নেমে এসেছে। বিনিয়োগ সঞ্চয়কে ছাড়িয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত চাহিদা বৈদেশিক উৎস থেকে সংস্থান করায় বহিঃখাতের ওপর চাপ বেড়েছে।’
‘২০০৫-০৬ সালে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মান ছিল ৬৭ দশমিক ২ টাকা। ২০২৩-২৪ সালে সেটা হয়েছে ১১১ টাকা এবং ২০২৪-২৫ সালে আরও বেড়ে হয়েছে ১২১ টাকা। ক্রমাগত অবচিতির কারণে ১৫ বছরে টাকার মান প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। ফলে আমদানি ব্যয় বেড়েছে, যা মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করেছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতাকে কমিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে কয়েক গুণ,’ যোগ করেন তিনি।
মুদ্রা সরবরাহের চিত্র তুলে ধরে আমীর খসরু বলেন, ‘২০০৫-০৬ অর্থবছরে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ (এম২) প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ এবং রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ছিল ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ, যা অর্থনীতিতে প্রাণশক্তির ইঙ্গিত দেয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এম২ প্রবৃদ্ধি কমে হয় মাত্র ৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৯ শতাংশ।’
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ মন্থরতা ও ব্যাংকিং খাতে তারল্য চাপের তুলনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ২০০৬ সালের জুনে অভ্যন্তরীণ সম্পদের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে। অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধিও ২১ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশে দাঁড়ায়।
২০০৫-০৬ সালে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সময়ে মুদ্রানীতির অব্যবস্থাপনাসহ কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৯ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে আসে এবং ২০২৪-২৫ সালে আরও কমে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হয়।
রাজস্ব ফাঁকি ও অপচয়ের কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের সম্পদ আহরণ সক্ষমতা সীমাবদ্ধ থাকায় রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যায়নি বলেও এ সময় মন্তব্য করেন তিনি। অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য, এই সময়ে কর-জিডিপি অনুপাত সন্তোষজনক মাত্রায় উন্নীত করা সম্ভব হয়নি।
‘২০০৫-০৬ সালে মোট রাজস্ব ছিল ৪৩৯ বিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ৮ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে, ব্যয় ছিল ১১ দশমিক ১ শতাংশ। ফলে বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ২ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সালে রাজস্ব বেড়ে ৪ হাজার ৯০ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়ালেও জিডিপির অনুপাতে তা ৮ দশমিক ২ শতাংশেই স্থির থাকে। অন্যদিকে, ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে ১২ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়ায়, ফলে ঘাটতি বেড়ে হয় ৪ দশমিক ০৫ শতাংশ,’ বলেন তিনি।
রাজস্ব আদায়ের বিপরীতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজেট ঘাটতি কমানো যাচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘শুধু বাজেট ঘাটতি যে বেড়েছে—তাই নয়, এ বৃদ্ধির মানও প্রশ্নবিদ্ধ। প্রকল্প ছিল অতিমূল্যায়িত এবং এগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাইও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে করা হয়নি। বিগত সরকারের আমলে বাস্তবায়িত মেগা প্রকল্পগুলো এই ক্ষেত্রে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য। ফলে জনগণ সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল ভোগ করতে পারেনি। লুটপাটের মাধ্যমে লক্ষ-কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।’