‘রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন না হলে প্রশাসনের কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আশা করা যায় না’

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন না হলে প্রশাসনের কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আশা করা যায় না—একটি গোলটেবিল বৈঠকে এমন মত দিয়েছেন বক্তারা।

তারা বলেন, রাজনীতি ঠিক না হলে প্রশাসন ঠিক হবে না।

রাজধানীর ডেইলি স্টার সেন্টারে বুধবার 'বাংলাদেশের সরকারি প্রশাসনের রূপান্তর: চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও সংস্কারের রূপরেখা' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তাদের বক্তব্যে এমন অভিমত উঠে এসেছে।

গোলটেবিল বৈঠকটি যৌথভাবে আয়োজন করে ইউএনডিপি ও দ্য ডেইলি স্টার।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি কিন্তু স্বাধীন দেশের প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রশাসনিক কাঠামো সাজানো হয়নি।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর ২০টির মতো প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। যে কারণে প্রশাসন জবাবদিহিহীন হয়ে ফ্যাসিজমের জন্ম দিয়েছে।

এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে যে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, তা আমাদের নতুন বাংলাদেশ গড়া স্বপ্ন দেখিয়েছে। সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারলে প্রশাসনিক সংস্কারে নতুন কাঠামো প্রণয়ন সম্ভব, বলেন কাজী মারুফ।

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সদস্য ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব খন্দকার আমিনুর রহমান বলেন, প্রশাসনে দুর্নীতি অন্যতম বড় সমস্যা। কর্মচারীদের দুর্নীতি নিয়ে কথা হয়, তবে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয় প্রকল্পে। আমাদের এখানে দুর্নীতিবাজরা পার পেয়ে যায়, ফলে দুর্নীতি লাগাম টানা কঠিন। আর এটা হয় গণতন্ত্রের ঘাটতির কারণে।

দেখা যায় অনেক দুর্নীতিবাজ পদোন্নতি পেয়ে যায়, ভালো অফিসার বঞ্চিত থাকে। এই ব্যবস্থা উল্টে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের আগে পদোন্নতি দেওয়ার রীতি নিশ্চিত করতে হবে, যোগ করেন তিনি।

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সদস্য ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. রিজওয়ান খায়ের বলেন, স্বাধীনতার পর আমরা সংস্কারের অনেক বাস মিস করে ফেলেছি, এবার আমাদের টার্নিং পয়েন্ট, এই সুযোগ মিস করা যাবে না।

তিনি আরও বলেন, দেশ চালাতে গেলে শক্ত মেরুদণ্ডের মানুষ লাগবে। ইয়েস ম্যান দিয়ে দেশ চলে না, ব্যুরোক্রেসি চলে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের অধ্যাপক আসিফ মাহমুদ শাহান বলেন, বাংলাদেশের প্রশাসনে ফ্যাসিবাদী প্রবণতার শুরু ১৯৭২ সাল থেকে। কারণ দেশ স্বাধীন হলেও আমাদের দেশের মতো প্রশাসন কাঠামো আমরা তৈরি করতে পারিনি।

তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের পর আমাদের রাষ্ট্রের কাঠামোই বদলে ফেলা হলো। ৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত স্বৈরতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশ শাসন হয়েছে। লক্ষ করলে দেখবেন, প্রশাসন সংশ্লিষ্ট আইন-বিধিগুলো ওই সময়েই প্রণয়ন করা হয়েছে। অর্থাৎ যখন রাজনীতি প্রায় অনুপস্থিত, তখন কর্মচারীরাদের ক্ষমতায়িত করে ফ্যাসিজমের জন্ম দিয়েছে। ১৯৯১ সালের পর সেই ধারা পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে তা করা হয়নি।

স্থানীয় সরকার বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্য ইলিরা দেওয়ান সরকারি চাকরিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রার্থীদের বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, 'বর্তমান ব্যবস্থার আগে আমাদের জন্য বরাদ্দ ছিল পাঁচ শতাংশ কোটা। তখন সরকারি চাকরিতে প্রতিনিধিত্ব ছিল এক শতাংশেরও কম। আর বর্তমান ব্যবস্থায় আমাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র এক শতাংশ, সেটাও প্রতিবন্ধীসহ। আমরা হিসাব করে দেখেছি, গত তিনটি বিসিএসে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাত্র চারজন সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. ফেরদৌস আরফিনা ওসমান বলেন, বাংলাদেশে ডেমোক্রেসির সঙ্গে ব্যুরোক্রেসির সংযোগ ঘটানো হয়নি। প্রশাসনকে সেবাযন্ত্র হিসেবে না দেখে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকেই রাজনীতিকরা প্রশাসনকে পদাবনত রাখতে চেয়েছেন।

এই জায়গায় ভারত ব্যতিক্রম। তারা তাদের প্রশাসনকে একটি জায়গায় দাঁড় করাতে পেরেছে। বাংলাদেশের বর্তমান জায়গা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে  আইন-বিধির সঙ্গে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে, মত দেন তিনি।

'ছাত্র আন্দোলনে কখনো আদিবাসী কোটা নিয়ে আপত্তি জানানো হয়নি' উল্লেখ করে জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতা মোহাম্মদ আজহার উদ্দিন অনিক তার বক্তব্যে বলেন, 'অন্যতম সমস্যা হচ্ছে সরকারি চাকরি একবার হলে আর যাবে না—এই ধরনের মানসিকতার কারণে এই চাকরির প্রতি ঝোঁক বেশি। সেইসঙ্গে বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত কাজের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে না, যা হচ্ছে, সেখানে প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে না, ফলে তরুণরা আকৃষ্ট হচ্ছে না।'

একটি তথ্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের চিফ অব বিজনেস ডেভেলপমেন্ট হিসেবে কাজ করছেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কামরুল ইসলাম খান হৃদয়। তিনি বলেন, 'সরকারি চাকরিতে প্রবেশে আগে প্রতিবন্ধীদের বয়সসীমা ছিল ৩২, আর সাধারণ প্রার্থীদের ছিল ৩০ বছর। এখন সাধারণ প্রার্থী ও প্রতিবন্ধী উভয়ের বয়সসীমা ৩২ বছর, এটা আমাদের জন্য ক্ষতিকর। এই জায়গায় পরিবর্তন আনা উচিত।'

তিনি বলেন, 'একজন প্রতিবন্ধী শিশুর শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে দেরি হয়। স্বাভাবিক একজন মানুষ যত সহজে তাদের অ্যাকাডেমিক ডিগ্রি নিতে পারেন, প্রতিবন্ধীরা সেভাবে পারেন না।'

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মিজানূর রহমান বলেছেন, 'প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য সবার প্রথমে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরপরেই সেটা করতে পেরেছিল। আমাদের এখানে সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম দিন থেকে দেশ দখলের চিন্তা থাকে। প্রশাসনে অনেক ভালো ভালো অফিসার আছেন। তাদের সঠিক উপায়ে কাজে লাগালে জনপ্রত্যাশা পূরণ হবে।'

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন ভারত তাদের স্বাধীনতার ২৪ বছর পার করেছে। কয়েকটি জাতীয় নির্বাচন হয়েছে, তাদের কাছ থেকেও কোনো শিক্ষা আমরা নিতে পারিনি।

বিসিএস প্রশাসন অ্যাকাডেমির রেক্টর ড. ওমর ফারুক বলেন, রাজনীতি ঠিক না হলে আমলাদের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা কঠিন। সরকারি কর্মচারীরা হলো ঘোড়ার মতো, রাজনীতিকরা হলেন ঘোড়সওয়ার। রাজনীতিকরা যেদিকে যাবে, ঘোড়াও সেদিকে যেতে বাধ্য।

ডেইলি স্টারের তানজিম ফেরদৌসের সঞ্চালনায় বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন, আইসিটি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবু সাঈদ মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র অ্যাকাডেমিক কোঅর্ডিনেটর মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালক আবু জাফর রিপন, ইউএনডিপির সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি আনোয়ারুল হক, সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার সোহেল ইবনে আলী, ইউএনডিপির প্রোজেক্ট ম্যানেজার মাহমুদুল হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাইশা ফারাহসহ অনেকে।