গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট

সচিবালয়ের সামনে ১১ দলের প্রতিবাদ, লং মার্চ-রেলযাত্রার কর্মসূচি, নভেম্বরে মহাসমাবেশ

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রতিবাদ এবং ১০ দফা দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে ১১ দলীয় ঐক্য।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর পল্টন জিরো পয়েন্ট এলাকায় এ অবস্থান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে ১০ দফা দাবি নিয়ে নেতাকর্মীরা সচিবালয়ের সামনে অবস্থান নেন।

এই কর্মসূচির কারণে আশেপাশের তীব্র ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। যানজটে মানুষ দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকে।

১১ দলীয় ঐক্য
ছবি: মেহেদি হাসান/স্টার

অবস্থান কর্মসূচি থেকে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির শফিকুর রহমান সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

তিনি জানান, ১১ দলীয় ঐক্য আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের পথে লং মার্চ; ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর লং মার্চ ও পথসভা; ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা ও খুলনা থেকে যশোর-কুষ্টিয়া হয়ে আবার ঢাকায় লং মার্চ; ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেটে রেলপথ যাত্রা এবং ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ হবে।

জামায়াত আমির বলেন, ‘এ দেশে যারা খুন করেছে, অপরাধ করেছে, লুণ্ঠনকারীরা মানুষের সম্পদ লুন্ঠন করেছে, তাদের বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে আমাদের এই আন্দোলন।’

জামায়াত আমির
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

তিনি আরও বলেন, ‘যারা এ দেশের নিরীহ মানুষের বুকে গুলি চালিয়ে বিভিন্নভাবে গুম-খুনের আশ্রয় নিয়ে জনগণের ওপর জুলুম করেছে। মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে বলছি, আমরা জীবিত থাকা অবস্থায় বাংলাদেশে এরা আর আস্ফালন করার সুযোগ পাবে না।’

দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ১১ দলীয় ঐক্যের আন্দোলন চলবে বলেও জানান তিনি।

সরকারের উদ্দেশে শফিকুর বলেন, ‘আমরা পরিষ্কার বলে দিচ্ছি, এই লং মার্চ জনগণের দাবি আদায়ের জন্য। অতীতের কায়দায়, ফ্যাসিবাদী কায়দায় আমাদের লং মার্চে যেন কোনো বাধা দেওয়া না হয়। যদি বাধা দেওয়া হয়, লং মার্চ দ্বিগুণ শক্তিতে তার গন্তব্যে পৌঁছে যাবে।’

লং মার্চের পাশাপাশি একাধিক পথসভা অনুষ্ঠিত হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জনগণের মনের কথা শুনব, আমাদের কথাগুলো জনগণকে বলব। এইভাবে বাংলাদেশের জনগণকে পরবর্তী বড় আন্দোলনের জন্য আমরা তৈরি করতে চাই।’

সিলেটের রাস্তা মানুষের চলাচলের উপযোগী নেই উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘শত শত গাড়ি যখন সিলেটের পথে রওনা করবে, জনগণের চরম ভোগান্তি হবে। এই বিবেচনায় নিয়েই আমরা রেলপথ বেছে নিয়েছি।’

‘আগামী ১৪ নভেম্বর বাংলাদেশের প্রত্যেকটি গ্রাম-পাড়া-মহল্লা থেকে আমাদের ভাই-বোনেরা ঢাকার দিকে রওনা করবে। ঢাকায় মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।’

১১ দলীয় ঐক্য
ছবি: মেহেদি হাসান/স্টার

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দাবি খুবই অল্প। আমার চুলায় গ্যাস চাই। আমার মাকে আর কাঁদাবেন না। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ চাই। সংসদের ভেতরে আর মিথ্যা বিবৃতি দেবেন না। খাবার জন্য পানি চাই। আমাদের যানবাহনের জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস চাই।’

সরকার নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে অভিযোগ তুলে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি সংকট তৈরি করার পরবর্তী পদক্ষেপ হচ্ছে দাম বাড়ানো। আমরা তা হতে দেবো না।’

মুক্তাঙ্গনে সমাবেশ শেষে দুপুর ১টার দিকে এলপিজি গ্যাসের মূল্যহ্রাস, পাইপলাইন গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত ও ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগের দাবিতে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সভাপতি নাহিদ ইসলাম, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমেদসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা পদযাত্রা নিয়ে সচিবালয়ের উদ্দেশে রওনা হন।

সচিবালয়ের ১ নম্বর গেটের কাছে পুলিশ তাদের আটকে দেয়। সেখানে শফিকুর রহমান ও নাহিদ ইসলাম বক্তব্য রাখেন। শফিকুর রহমান ১০ মিনিটের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিনিধিকে পাঠানোর আহ্বান জানান। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমরা তাকে অসম্মান করব না।’

১১ দলীয় ঐক্য
ছবি: মেহেদি হাসান/স্টার

এ সময় নেতাকর্মীরা স্লোগান দেন, ‘গ্যাস দে, বিদ্যুৎ দেন, নইলে গদি ছাইড়া দে’। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরা জড়ো হওয়ার পর সচিবালয়ের প্রতিটি গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় কোনো দর্শনার্থীর গাড়ি ঢুকতে বা বের হতে পারেনি।

নির্ধারিত ১০ মিনিট পার হওয়ার পর দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে শফিকুর রহমান আবারও মাইক্রোফোন হাতে নেন। তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষ আমাদের আহ্বানে সাড়া দেয়নি। এর প্রতি ধিক্কার জানিয়ে আমরা আরও পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করব। এরপর আজকের মতো বিদায় নেব।

দুপুর ২টার দিকে জামায়াত নেতাকর্মীরা সচিবালয়ের সামনে থেকে ফিরে যান।

১১ দলীয় ঐক্যের ১০ দফা দাবি হলো গত তিন মাসে আদায় করা ‘ভূতুড়ে’ বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে গণশুনানির আয়োজন, দায়ীদের শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা; এছাড়া প্রিপেইড ও পোস্টপেইড মিটারে ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া ও অন্যান্য অযৌক্তিক চার্জ বাতিল; অতিরিক্ত আদায় করা অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রাহকদের ফেরত দেওয়া এবং বিদ্যুৎ বিলিং ব্যবস্থায় শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ।

জোটের পক্ষ থেকে আরও দাবি জানানো হয়, গ্যাস সরবরাহ না থাকলে বিল আদায় বন্ধ করতে হবে। একইসঙ্গে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভরতা কমাতে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জ্বালানি নীতি প্রণয়ন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও নতুন কূপ খননের উদ্যোগ গ্রহণ।

তারা মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালের ব্যর্থতার তদন্ত, ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রকাশ, পুনরায় চালুর সময়সূচি ঘোষণা ও বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান।

১০ দফা দাবিতে আরও বলা হয়, গ্যাসের সিস্টেম লস, চুরি ও অপচয় বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে; স্মার্ট মিটারিং চালু, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও পুরোনো পাইপলাইন সংস্কারের মাধ্যমে বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্র থেকেই অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে; পাশাপাশি শিল্প, ব্যবসা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান রক্ষার পাশাপাশি এলপিজি ও সিএনজির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়; জ্বালানি খাতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও জানায় জোট।