বাংলাদেশি পরিচয় ভুলিয়ে নতুন কতগুলো ভাবনা সামনে আনার চেষ্টা হচ্ছে: ফখরুল
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, 'আজকের রাজনীতিতে একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যে, ১৯৭১ সালে যে জন্য আমরা যুদ্ধ করেছিলাম, স্বাধীনতার যুদ্ধ, আমাদের সম্পূর্ণ আলাদা একটা পরিচিতি, বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের সেই আইডেন্টিটিকে ভুলিয়ে দিয়ে নতুন করে কতগুলো চিন্তা-ভাবনা সামনে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'এটা আমাদের বাংলাদেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়।'
আজ সোমবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বাংলাদেশ খ্রিষ্টান ফোরামের নেতাদের সঙ্গে মত বিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, 'আমরা সবাই বিশ্বাস করি যে, আমরা বাংলাদেশে একটা অসাম্প্রদায়িক জাতি হিসেবে দেশকে গড়ে তুলতে চাই।'
'আপনারা জানেন যে, আমাদের কর্মসূচি বা আমাদের সংস্কার এবং পার্টির যে সমস্ত কথা আমরা বলেছি, তাতে এই শব্দটা সেখানে উচ্চারণ করা হয়েছে "রেইনবো নেশন"। একটা রামধনু যেমন অনেকগুলো রঙ নিয়ে একসঙ্গে একটা কমপ্লিট অবয়ব আমাদের সামনে আসে, ঠিক সে রকম একটা নেশন আমরা গড়ে তুলতে চাই,' বলেন তিনি।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, '১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট দুঃশাসন গণঅভ্যুত্থানে উৎখাতের পরে একটা নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে সত্যিকার অর্থেই যে বাংলাদেশের জন্য আমরা যুদ্ধ করেছিলাম, প্রাণ দিয়েছিলাম, লাখ লাখ মানুষ সেদিনের যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিল, লাখ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে গিয়েছিল, বাড়ি-ঘর পুড়ে গিয়েছিল, মানুষের হত্যা হয়েছিল—সেই কথাগুলো আমরা যখনই সামনে আনি, আমাদের সামনে একটা চেতনা, একটা ধারণা তৈরি হয়। সেই চেতনা, ধারণাকে আমরা ধারণ করতে চাই।'
তিনি বলেন, 'আমরা এ কথাটা খুব পরিষ্কার করে বলতে চাই, অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠে বলতে চাই, উচ্চকণ্ঠে উচ্চারণ করতে চাই যে, আমরা বাংলাদেশি এবং ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করে আমাদের স্বাধীনতা নিয়ে এসেছি। এটা আমাদের বলতে হবে, প্রতি মুহূর্তে মনে রাখতে হবে।'
'আজকে দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই বাংলাদেশে, আমরা যে বাংলাদেশকে অসাম্প্রদায়িক জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম, সেখানে বিভিন্ন রকমের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে, এটাকে একটা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার জন্য। আমরা সব সময় এটার প্রতিবাদ জানিয়েছি,' যোগ করেন তিনি।
বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, 'আমরা খুব আশা করে আছি যে, আগামী নির্বাচনে জনগণ আরেকবার রায় দেবে যে বাংলাদেশের মানুষ সত্যিকার অর্থেই অসাম্প্রদায়িক এবং তারা বাংলাদেশি জাতীয়তায় বিশ্বাস করে।'
নিজেদের সংখ্যালঘু না ভেবে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের নিজেদের অধিকার নিয়ে সরব হওয়ার আহ্বান জানান মির্জা ফখরুল।
অনেক রকম রাজনীতি হচ্ছে, অনেক রকম কথা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'আমরা আশা করেছিলাম যে, আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার এগুলোর ঊর্ধ্বে উঠে একটা নির্বাচন—যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাংলাদেশের জন্য, সেই সুষ্ঠু-অবাধ নির্বাচন, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করবেন। তারা চেষ্টা করছেন, নির্বাচন কমিশন চেষ্টা করছে কিন্তু মাঝে মাঝেই আমরা এমন কতগুলো বিষয় দেখতে পাই যে, বিষয়গুলো আমাদেরকে একটু উদ্বিগ্ন করে তোলে।'
'আপনারা জানেন যে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের জন্য সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে অনেকগুলো। সেই সংস্কার কমিশনগুলো আলোচনা শেষ করেছে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে। তাদের আলোচনা প্রায় শেষ হয়েছে। আগামী ১৭ তারিখে আমরা সবাই আশা করছি যে, যেগুলোতে একমত হয়েছে, সেগুলোতে সব রাজনৈতিক দলগুলো স্বাক্ষর করবে এবং যেগুলোতে একমত হতে পারেনি, সেগুলো আসন্ন নির্বাচনে প্রত্যেক রাজনৈতিক দল তাদের ম্যানিফেস্টো হিসেবে নিয়ে আসবে জনগণের সামনে। সেটাকে প্রস্তাব আকারে তারা তুলে ধরবে,' যোগ করেন তিনি।
পিআর (আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতি প্রসঙ্গে ফখরুল বলেন, 'এখন একটা প্রস্তাব এসেছে পিআর। এই বিষয়টা অনেক দেশে আছে কিন্তু এটার সঙ্গে আমাদের দেশের মানুষ খুব বেশি পরিচিত না। এক ব্যক্তি, এক ভোট, এটাকে আমরা বুঝি। ব্রিটিশ পিরিয়ড থেকে এই পদ্ধতিতে এখানে কিন্তু নির্বাচন হয়েছে, পার্লামেন্ট গঠন হয়েছে, সরকার গঠন হয়েছে। আজকে হঠাৎ করে সামনে যখন এই বিষয়টা আসছে এবং তার জন্য আন্দোলন হচ্ছে, তখন কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই যারা অতি দ্রুত একটা নির্বাচন চান দেশে গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য, গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করার জন্য, আমাদের পার্লামেন্ট গঠন করার জন্য—আমরা একটু উদ্বিগ্ন হই।'
'সে জন্য আমরা খুব পরিষ্কার করে বলেছি যে, এই বিষয়টা আগামী পার্লামেন্টের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। আগামী পার্লামেন্টের প্রতিনিধিরা যদি মনে করে যে তারা তারপর থেকে পিআরে যাবেন, যাবেন! জনগণ যদি মনে করে যে পিআরে যাবে, যাবে! আর তা না হলে এখন পিআর দিলে তো জনগণ বুঝবেই না যে কীভাবে তারা এই বিষয়টাতে আসবে। একটা বড় সমস্যা এখানে পিআর পদ্ধতিতে ব্যক্তির যে স্বাধীনতা থাকে তার প্রতিনিধি নির্বাচন করার সেই স্বাধীনতাটা এখানে কিন্তু খর্ব হয়। দলকে নির্বাচন করতে হয় অর্থাৎ ওই দলকেই ভোট দিতে হবে,' বলেন তিনি।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, 'এই বিষয়গুলো আমি অবতারণা করলাম এই জন্য যে, এগুলো আমাদের সামনে আসছে।'
তিনি আরও বলেন, 'একটা জিনিস আপনাদের সব সময় মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের সমাজের, রাষ্ট্রের, জাতির আত্মা অসাম্প্রদায়িক একটা বাংলাদেশ করার। এই সোলকে আমরা নষ্ট হতে দিতে চাই না। আজকে যে কোনোভাবেই হোক, একটা প্রচেষ্টা আছে ভিন্নভাবে চিন্তা-ভাবনা করার। সেই ভিন্নভাবে চিন্তা-ভাবনা করার কোনো অবকাশ এখানে আছে বলে আমরা মনে করি না। আমরা মনে করি, এখানে বাংলাদেশের মানুষ একটা জাতি সামগ্রিকভাবে এবং এখানে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।'
আগামী নির্বাচনে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের সহযোগিতা কামনা করেন বিএনপি মহাসচিব।